তুষারে ঢাকা আমোরিম–অধ্যায়, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে বাঁচাবেন কে

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিদায়ী কোচ রুবেন আমোরিমএক্স

রুবেন আমোরিমের ছাঁটাইয়ের খবর তখন ‘ব্রেকিং নিউজ’ ইংল্যান্ডের খেলাধুলাভিত্তিক পোর্টালগুলোয়। একটু আগেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তরফ থেকে তাঁকে ছাঁটাই করে দেওয়ার খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, হালকা তুষারাচ্ছন্ন পথ দিয়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছেন আমোরিম। ক্যাপশনে লেখা, ‘আমোরিম আফটার–স্যাক ওয়াক।’

সেই হেঁটে যাওয়ায় সাংবাদিকদের প্রতি আমোরিমের হাসিটা ছিল কেমন জমাটবাঁধা। হতে পারে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে কিংবা ছাঁটাইয়ের বেদনায়। কারণ যা–ই হোক, শেষ কথা হচ্ছে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ‘আমোরিক–প্রজেক্ট’ও ব্যর্থতার চাদরে মুড়ে গেছে। তবে গত ১৩ বছরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ইউনাইটেড সমর্থকদের জন্য এটি বেদনাদায়ক গল্পের ধারাবাহিকতা মাত্র। স্যার আলেক্স ফার্গুসনের বিদায়ের মধ্য দিয়ে যে গল্পটা শুরু হয়ে এখন যেন চিরন্তন হওয়ার পথে।

ইউনাইটেডে আমোরিম–অধ্যায় স্থায়ী হলো মাত্র ১৪ মাস। অথচ শুরুটা হয়েছিল অনেক সম্ভাবনা ও আশায়। বিশেষ করে স্পোর্টিং লিসবনে আমোরিমের সাফল্যে নড়েচড়ে বসেছিলেন ইউনাইটেড সমর্থকেরা। শুরুতে অবশ্য ইয়ুর্গেন ক্লপের জায়গায় তাঁর লিভারপুলে যাওয়ার গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু অ্যানফিল্ডের পরিবর্তে আমোরিম বেছে নেন ওল্ড ট্রাফোর্ডকে। হয়তো খুব খারাপ অবস্থায় থাকা পরাশক্তিদের শিরোপা জেতানোর চ্যালেঞ্জটা নিতে চেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

কিন্তু ট্রফি জেতা দূরে থাক, ম্যাচ জেতাই পুরো সময়টায় কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে তাঁর সামনে। এমনকি গ্রিমসবি টাউনের বিপক্ষে লিগ কাপের ম্যাচেও ইউনাইটেড যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছে, তা আরও অনেক দিন দলটিকে তাড়া করে বেড়াবে। চতুর্থ স্তরের গ্রিমসবির বিপক্ষে সেদিন পেনাল্টিতে ইউনাইটেড হেরে যায় ১২–১১ গোলে! ক্লাবের ইতিহাসে এই প্রথম এত নিচের সারির কোনো দলের কাছে হার, যা সমর্থকদের জন্য ছিল বিশাল এক ধাক্কা।

এরপরও অবশ্য জায়গা ধরে রেখেছিলেন আমোরিম। চলতি মৌসুমে বাজে শুরুর পরও মাঝে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর। দলকে পয়েন্ট তালিকার ছয়েও তুলে এনেছিলেন। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। মাঠের পারফরম্যান্সে ভঙ্গুর দশা তো ছিলই, সঙ্গে যোগ হয়েছিল দলের ভেতরকার ফাটলও। এর মধ্যে লিডসের সঙ্গে ১–১ গোলের ড্রয়ের পর আমোরিমের কিছু মন্তব্যও পরিস্থিতিকে বেশ উত্তপ্ত করে তোলে।

সমর্থকদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন আমোরিম
রয়টার্স

সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে তাঁকে তাঁর কাজ করতে দিতে। আমোরিমের দাবিটা ছিল অনেকটা এমন, হয় তাঁকে পুরোপুরি সমর্থন দিতে হবে, নয়তো বরখাস্ত করতে হবে। যেখানে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছে ক্লাবটি। ফার্গুসন অবসর নেওয়ার পর গত ১৩ বছরের মধ্যে ১০ম কোচ হিসেবে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে দাঁড়াতে হলো আমোরিমকে।

স্যার আলেক্স ফার্গুসনের হাত ধরে ইউনাইটেডের সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করার গল্পটা পুরোনো। এরই মধ্যে ফার্গির এনে দেওয়া সাফল্যের ক্যাবিনেটে ধুলোর আস্তরণ জমে গেছে। ফার্গির পর ডেভিড ময়েসকে দিয়ে শুরু। সব মিলিয়ে স্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব মিলিয়ে ১০ জন কোচ ইউনাইটেডের ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ফার্গুসনের সাফল্যের ভারে সমর্থকদের প্রত্যাশার যে চাপ জমেছিল, তাতে চিড়েচ্যাপটা হয়েছেন প্রত্যেকেই। অদ্ভুত এক ‘অভিশাপ’ যেন ঘিরে ধরেছে ক্লাবটিকে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডার্বি ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হারের পর স্পষ্টভাবে তিনি জানিয়ে দেন, বরখাস্ত হলেও কৌশল বদলাবেন না।

এমন নয় যে আমোরিম ক্লাবের কাছ থেকে যথেষ্ট সহায়তা পাননি। দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউনাইটেডে খেলোয়াড় কিনতে তাঁর নেট খরচ ২০ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। তবে ক্লাবের হয়ে নড়বড়ে শুরুর পরও নিজের কৌশল বদলাতে রাজি হননি এই পর্তুগিজ কোচ।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডার্বি ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হারের পর স্পষ্টভাবে তিনি জানিয়ে দেন, বরখাস্ত হলেও কৌশল বদলাবেন না। এরপর নানা সমালোচনার মুখেও নিজের অবস্থান বদলাতে রাজি হননি তিনি। যেমন গত সপ্তাহে উলভসের বিপক্ষে ১–১ গোলে ড্র করার পর ক্লাবের ভেতর বেশ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কারণ, উলভস এ মুহূর্তে পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে।

আরও পড়ুন

ইউনাইটেডের সঙ্গে ড্র করার আগে উলভসের সংগ্রহ ছিল ১৮ ম্যাচে ২ পয়েন্ট। ফলে ম্যাচ শেষে সমর্থকদের দুয়ো শুনে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল খেলোয়াড়দের। ম্যাচের পর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর জেসন উইলকক্স ব্যক্তিগতভাবে আমোরিমের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাঁকে কৌশলগতভাবে আরও নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দেন। তবু লিডসের বিপক্ষে ম্যাচেও ইউনাইটেড খেলতে নামে তিনজন ডিফেন্ডারের ছকেই। এটি ছিল ক্লাবের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে আমোরিমের সম্পর্কে আরেকটি বড় ধাক্কা।

এর মধ্যে আমোরিমের লাগাতার সমালোচনামূলক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আমোরিম চাইছিলেন, উইলকক্সের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁকে নিজের কাজটা করতে দেওয়া হোক। কিন্তু আমোরিম যেটিকে হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন, ইউনাইটেড সেটিকে দেখেছে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ও পরামর্শ হিসেবে। যদিও এসব পরামর্শ বারবার প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন এই কোচ।

ইউনাইটেড কোচ রুবেন আমোরিম ও লিভারপুল কোচ আর্নে স্লট
রয়টার্স

প্রশ্ন হচ্ছে, আমোরিম তো বিদায় নিলেন, কিন্তু এরপর কী? ইউনাইটেড সমর্থকদের অনেকের মধ্যে ক্লাবের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারও কারও মতে, ইউনাইটেডকে ধীরে ধীরে আমোরিম যখন সঠিক পথে আনছিল তখনই তাঁকে ছাঁটাই করা হলো। কিন্তু আমোরিম এখন অতীত। আপাতত ডানকান ফ্লেচার অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়েছেন। সম্ভাব্য পরবর্তী কোচের তালিকায় আছেন এনজো মারেসকা, অলিভার গ্লাসনার এবং আন্দোনি আইরোলা।

মারেসকা সদ্য চেলসির দায়িত্ব ছেড়েছেন, গ্লাসনার আছেন ক্রিস্টাল প্যালেসে এবং আইরোলা বোর্নমাউথ। দ্রুত এই রেসে আরও কেউ কেউ ঢুকে পড়তে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব যিনিই নেন, তিনি কি পারবেন ইউনাইটেডকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে? পুরো দলকে আমূল বদলে দিয়ে একটি নতুন দর্শন ও সাফল্যের রূপরেখায় দাঁড় করাতে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কাজটা মোটেই সহজ নয়। এখন শেষ পর্যন্ত অলৌকিক কোনো দূতের দিকেই হয়তো তাকিয়ে থাকতে হবে ইউনাইটেড সমর্থকদের, যিনি এসে অন্তহীন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবেন ক্লাবটিকে।