পৃথিবীটা এখনো মেসির

আরও একবার লিওনেল মেসির জাদু দেখেছে ফুটবলবিশ্বএএফপি

পৃথিবীটা এখনো মেসির। আমরা সেই পৃথিবীতে বাস করছি।
বিশ্বকাপটা এখনো মেসির। আমরা সেই বিশ্বকাপ দেখছি।

৩৮ বছর বয়স,  ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ম্যাচের আগে প্রশ্ন ছিল অনেক। সাম্প্রতিক পেশির চোট থেকে কতটা সেরে উঠেছেন? শুরু থেকেই খেলবেন তো? আর খেললেও, এই বয়সে কি তিনি এখনো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন? নাকি তিনি এখন কেবল স্মৃতির মানুষ—যাকে দেখে দর্শক আবেগে ভাসবে, কিন্তু যার পায়ে আর আগের সেই বজ্রপাত নেই?

৪৫ মিনিটের মধ্যেই মেসি প্রশ্নগুলোকে হাস্যকর বানিয়ে দিলেন।

খেলা শুরুর কয়েক মিনিটেই তাঁকে দেখা গেল নিজের অর্ধে নেমে বল কাড়তে। তারপরই আলজেরিয়ার ডিফেন্ডারদের পিছু ধাওয়া। এই দৃশ্যের মধ্যে ছোট্ট এক বিস্ময় লুকিয়ে ছিল। গত কয়েক বছরে আমরা যে মেসিকে দেখেছি—মেপে হাঁটা, শক্তি বাঁচিয়ে খেলা—এই রাতের মেসি যেন তারই একটু তরুণ সংস্করণ।  আরও ধারালো, আরও ক্ষুধার্ত।

পঞ্চম মিনিটে বল জালে জড়িয়েও অফসাইডে গোল বাতিল হয়েছিল। খুব সামান্য ব্যবধান। যেন ভাগ্য বলছিল, ‘অপেক্ষা করো, আরও সুন্দর কিছু আসছে।’ ১৭ মিনিটে তা এল।

রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে প্রায় ৪০ গজ দূরে বল পেয়েছিলেন মেসি। সামনে হঠাৎ ফাঁকা রাস্তা। তিন টাচ, তারপর বক্সের কিনারা থেকে শট। লুকা জিদান হাত লাগিয়েছিলেন, কিন্তু থামাতে পারেননি। বল জালে ঢুকে পড়ার মুহূর্তে স্টেডিয়ামের গর্জন এমন ছিল, যেন মানুষ কেবল গোল উদ্‌যাপন করছে না, কোনো পুরোনো বিশ্বাসকে নতুন করে আবিষ্কার করছে।

লা বোম্বোনেরার সেই উন্মাদনা, এল মনুমেন্তালের সেই দীর্ঘশ্বাস—কানসাস সিটিতে সব একাকার হয়ে গেল। স্টেডিয়ামটা হঠাৎ আর আমেরিকার মাটিতে থাকল না। সেটা হয়ে গেল একটুকরো আর্জেন্টিনা।

মেসিকে উড়ল আর্জেন্টিনা
এএফপি

দ্বিতীয় গোলটি এল ঘড়ির কাঁটা ৬০ ছুঁলে। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট ঠেকিয়ে ভুল জায়গায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জিদান। সেখানে সবচেয়ে আগে উপস্থিত মেসি। গোলরক্ষকের ভুলের ভেতরও মহাতারকারা সুযোগের গন্ধ খুঁজে পান। তিনি পেলেন, গোল করলেন।

আরও পড়ুন

আর তৃতীয়টি? সেটাই আসল মেসি। ৭৭ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে তিন ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে নিচের কোণে পাঠানো শটটি যেন বার্সেলোনার কোনো পুরোনো সন্ধ্যা থেকে ধার করা দৃশ্য। এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল। তারপর বিস্ফোরণ। হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে তাঁর প্রথম।

এই হ্যাটট্রিক শুধু তিনটি গোল নয়। ১৬ গোল নিয়ে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড স্পর্শ করা—বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশে নাম লেখানো। ৬টি বিশ্বকাপ খেলার নজির গড়া হয়ে গিয়েছিল মাঠে নেমেই, সেটাও ইতিহাসে প্রথম।

আরও একবার আর্জেন্টিনাকে হাসিয়েছে রদ্রিগো দি পল–লিওনেল মেসির জুটি। মেসির প্রথম গোলে অ্যাসিস্ট ছিল দি পলের
এএফপি

আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের মতোই বিশ্বকাপ শুরু করা। নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে এমন এক রাত উপহার দেওয়া, যা স্মৃতিতে গেঁথে যায়।
একটা সময় ছিল, আর্জেন্টিনা মেসির কাঁধে চেপে বাঁচতে চাইত। এখন মনে হয়, মেসিও আর্জেন্টিনার কাঁধে ভর দিয়ে নতুন গল্প লেখেন। স্কালোনির দল রক্ষণে সংগঠিত, মাঝমাঠে সচল, আক্রমণে নমনীয়। ফলে মেসিকে আর পৃথিবী একা বহন করতে হয় না। তাই হয়তো তাঁকে আরও মুক্ত লাগে। আরও বিপজ্জনক।

৩৮ বছরের একজন মানুষ মঙ্গলবার রাতে প্রমাণ করলেন, গ্রেটদের কোনো মেয়াদ থাকে না।

ম্যাচের ৮০ মিনিটে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়লেন যখন, পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে। সত্তর হাজার গলা একসঙ্গে। আলবিসেলেস্তের আকাশি নীল-সাদা রঙে ভেসে যাওয়া কানসাস সিটির রাতে মেসি হাঁটলেন—শান্তভাবে, যেভাবে কেবল তিনিই হাঁটতে পারেন।

যেন জানেন, পৃথিবীটা এখনো তাঁরই।

আরও পড়ুন