ওলিসের অবিশ্বাস্য গোলে জিদান টের পেলেন ফুটবল খেলাটা সংক্রামক
অসাধারণ খেলোয়াড়দের এই এক গুণ। মাঠে তাঁদের কারিকুরি ‘আসর’ করে দর্শকের ওপরও। ব্রাসেলসে গতকাল রাতেও মাইকেল ওলিসের প্রতিভায় স্থান–কাল–পাত্র ভুলে গিয়েছিলেন এক দর্শক। নাম তাঁর জিনেদিন জিদান!
ওলিসে ছিলেন মাঠে। ফ্রান্স কোচ জিদান ডাগআউটে। কোচদের তো মাঠে নিজের খেলোয়াড়দের পরিচালনার পাশাপাশি ম্যাচও ভালোভাবে দেখতে হয়। সে হিসেবে গ্যালারির দর্শকের সঙ্গে জিদানের আসলে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। ৮৮ মিনিটে ওলিসের অবিশ্বাস্য সেই গোলের সৌন্দর্যে গ্যালারির সাধারণ দর্শক যেমন আন্দোলিত হয়েছেন, তেমনি জিদানও। বলতে পারেন, জিদান যেভাবে ওলিসের গোলটি উদ্যাপন করেছেন, সেটা আর কেউ পারেননি। কারণ?
ওই যে ‘আসর’ করেছিল কিছু একটা!
যেকোনো খেলাতেই এমন হয়। মাঠে কোনো খেলোয়াড় যখন অবিশ্বাস্য কিছু করার মধ্যে থাকেন, সেটা দেখে দর্শকও নিজেদের ধরে রাখতে পারেন না। উত্তেজনায় কিছু একটা করে বসেন। জিদান নিজেও তো একসময় ফুটবলার ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মধ্যে ব্যাপারটা আরও বেশি কাজ করার কথা। ঘটলও ঠিক তা–ই। বদলি নামা ওলিসের দৌড়ের সঙ্গে জিদানও দৌড়াতে দৌড়াতে দেখলেন সামনে একটা বল। কিক নেন আনন্দের আতিশয্যে।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ব্যবধানে পয়েন্ট ভাগের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ফ্রান্স। ঠিক তখনই ওলিসে–ম্যাজিক। নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে দৌড়ে বেলজিয়ামের বিপৎসীমায় ঢুকে পড়ার সময় প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারকে রীতিমতো নাচিয়ে ছাড়েন! জিদান এই মুভটা দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। খেলোয়াড়ি জীবনের ফুটবলার–সত্তা যেন ফিরে এসেছিল তাঁর মাঝে।
ওলিসে মাঝমাঠ চিরে যখন দৌড়াচ্ছিলেন, ডাগআউটে টাচলাইন ধরে দৌড় শুরু করেন জিদানও। ওলিসে গোল করার পরও জিদানের সেই দৌড় থামেনি। উল্টো উত্তেজনার তোড়ে সামনে রাখা বলে কিক নিয়ে বসেন ফরাসি কিংবদন্তি। ফুটবল যে একটি সংক্রামক খেলা, সেটাও বোঝা গেল তখনই!
ওলিসের সেই গোলেই ফ্রান্স জিতেছে ১–০ ব্যবধানে। ম্যাচ শেষে জিদানও জানতেন তাঁকে ওই দৌড়ের ব্যাখ্যা দিতে সাংবাদিকদের সামনে। ফ্রান্সের এই কোচ কোনো কার্পণ্য করেননি। ওই মুহূর্তের ব্যাখ্যায় ’৯৮ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি যা বলেছেন, সেটা শুনে মনে হবে জিদান তখন মনে মনে আসলে ওলিসের সঙ্গে মাঠেই ছিলেন!
শুনুন তাঁর মুখেই, ‘খেলার ছন্দে যেন ভেসে গিয়েছিলাম, ওই মুহূর্তের অংশ হতে চেয়েছি। বুঝতে পেরেছিলাম ও ড্রিবলিংয়ে নামছে, আর দুর্দান্ত এক মুভ তৈরি করেছে। তাই আমিও (মনে মনে) ওর পেছন পেছন গেলাম। হঠাৎ দেখি সামনে বল, ভাবলাম ওটায় লাথি মারা যাক। একটু হাস্যকর শোনাতে পারে, তবে তাতে কিছু যায়-আসে না।’
শুধু জিদান নন, ব্যক্তিগত জীবনে অনেকেই হয়তো এমনকিছুর সাক্ষী। লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের দুর্দান্ত খেলা ভর করে অনেকের মাঝেই। তখন হয়তো আবেগের আতিশয্যে অনেকে জিদানের মতো এমন কিছু করে ফেলেন। আর ওলিসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা নতুন নয়। সর্বশেষ বিশ্বকাপই তো তাঁর সাক্ষী। বিশ্বকাপে এক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোল বানানোর রেকর্ড গড়া ওলিসের খেলা দেখে কেউ কেউ যে জিদানের মতো অমন কিছু করে বসেননি, তা জোর দিয়ে বলা যায় না।
তবে জিদান জোর দিয়েই বললেন একটি কথা। ওলিসে একটা প্রতিভা!
ফরাসি মিডফিল্ডারকে প্রশংসায় ভাসিয়ে সম্প্রচারক চ্যানেল ‘টিএফ১’কে কিংবদন্তি বললেন, ‘সে নিখাদ প্রতিভা। খেলতে ভালোবাসে। তার মধ্যে প্যাশনটা খেয়াল করবেন। ফুটবলকে সে নিজের অনুভূতিতে ধারণ করে। ভালো লাগছে যে ওর পাশেই আছি।’
চোটের কারণে কিলিয়ান এমবাপ্পের অনুপস্থিতিতে জিদান একটু সমস্যায়ই পড়েছিলেন। একাদশে বদল আনেন ৯টি। শেষ পর্যন্ত জিততে হয় ওলিসে–জাদুতে। তাতে ফ্রান্সের কোচ হিসেবে প্রথম দুই ম্যাচে জয় পাওয়া চতুর্থ কোচ হলেন জিদান। তাঁর আগে সর্বশেষ প্রথম দুই ম্যাচজয়ী কোচ ১৯৯৪ সালে আইমে জ্যাক। আর ফরাসি ফুটবলে জিদান–যুগে ওলিসেও রয়েছেন আগের মতোই।
এবার নেশনস লিগেই তুরস্কের বিপক্ষে আগের ম্যাচে ফ্রান্সের ১–০ গোলের জয়ে গোলটির উৎস ছিলেন বায়ার্ন মিউনিখ মিডফিল্ডার। অর্থাৎ জিদানের এই দুই ম্যাচে একটি গোল করার সঙ্গে একটি গোলও বানিয়েছেন ওলিসে। ফ্রান্সের কোনো কোচের অধীনে প্রথম দুই গোলেই এমন সরাসরি অবদান সর্বশেষ দেখা গেছে এরিক ক্যান্টোনার সময়। জেরার্ড হুলিয়ের কোচ হওয়ার পর ১৯৯২ সালে তাঁর অধীনে ফ্রান্সের প্রথম দুই গোলেই (১ গোল, ১ অ্যাসিস্ট) সরাসরি অবদান ছিল ক্যান্টোনার।
ওলিসে আগের মতোই আছেন—এই কথাটা একটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ফ্রান্সের জার্সিতে ওলিসের এমন দুর্দান্ত ফর্ম তো শুরু থেকেই। ২০২৪ সালে অভিষেকের পর এ পর্যন্ত ২৭ ম্যাচ খেললেন জাতীয় দলের হয়ে। এই পথে ৮ গোলের পাশাপাশি গোল বানিয়েছেন ১০টি। ফ্রান্সের হয়ে শুরু থেকে এত ভালো ফর্ম কিন্তু জিদানেরও ছিল না।
ফ্রান্সের হয়ে প্রথম ২৭ ম্যাচে সর্বশেষ এমন কিছু বা এর কাছাকাছি কারও ফর্ম খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৩ সালে অভিষিক্ত হলেও চার বছর পর ফ্রান্সের হয়ে প্রথম ২৭ ম্যাচে সাবেক অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইউরি দিয়োরকায়েফের পরিসংখ্যান ছিল ১৪ গোল, ৮ অ্যাসিস্ট।
দিয়োরকায়েফকে সঙ্গে নিয়েই ফ্রান্সকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জেতান জিদান। তবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ওলিসের মতো এমন সর্বগ্রাসী ছিলেন না দিয়োরকায়েফ। ওলিসের পরিসংখ্যান ও খেলার ধরন দেখে এটা পরিষ্কার যে ফ্রান্স সত্যিই বিরল এক প্রতিভা পেয়েছে। জিদানের কথায় ঝরল সেই সুরও, ‘সে অসাধারণ এক প্রতিভা। এমন খেলোয়াড় আমার পছন্দ। সে খেলার মাধ্যমে দর্শকদের বিনোদন দিতে চায়।’
জিদানের খেলা দেখে থাকলে তাঁর এই শেষ কথায় কেউ কেউ নস্টালজিক হয়ে পড়তে পারেন। মাঠে বুট পায়ে জিদানও দর্শকদের একসময় তুমুল আনন্দ দিয়েছেন দর্শকদের। সেটাও ওলিসের মতো সেই মাঝমাঠেই। রোলস রয়েসের মতো রাজকীয় দৌড়, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং ও খেলার অভিজাত ধরন—জিদানের সেই দিনগুলোতে তাঁকে দেখেও অনেকের শরীরে ভর করত উত্তেজনা। মনে মনে জিদান হয়ে শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতেও সেটা প্রকাশ পেয়ে যেত অনেকের, যেমনটা ওলিসেকে দেখে হলেন জিদান।
ফুটবল খেলাটা সত্যিই সংক্রামক!