কেন নিজের পা কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন বাতিস্তুতা
গ্যাব্রিয়েল ওমার বাতিস্তুতা।
এ নামে তাঁকে সতীর্থরা খুব কম ডাকতেন। ভক্তরাও। সবার কাছে তিনি ছিলেন ‘বাতিগোল’!
যে নাম শুনলেই নব্বই দশকের ফুটবল রোমান্টিকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দীর্ঘ সোনালি চুলের এক স্ট্রাইকারের ছবি। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে যিনি ছিলেন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো—চলে যাওয়ার পর থাকত শুধু ক্ষতির হিসাব।
১৭ বছরের ক্যারিয়ারে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৩৫০-এর বেশি গোল করেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে ৭৮ ম্যাচে ৫৬ গোল করে দীর্ঘদিন ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা, যে রেকর্ড পরে অন্য সব রেকর্ডের মতোই নিজের করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি।
সম্প্রতি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ইংল্যান্ড কিংবদন্তি রিও ফার্ডিনান্ডের পডকাস্ট ‘রিও ফার্ডিনান্ড প্রেজেন্টস’-এ হাজির হয়েছিলেন ৫৭ বছর বয়সী সাবেক এই আর্জেন্টাইন তারকা। সেই আড্ডায় উঠে এল অভাবের তাড়নায় বাতিগোলের ফুটবল বেছে নেওয়া, ম্যারাডোনার একাকী মৃত্যু আর অসহ্য যন্ত্রণায় নিজের পা কেটে ফেলার আকুতির মতো সব শিহরণজাগানো গল্প।
ফুটবলার নয়, হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক
ছোটবেলায় বাতিস্তুতার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। ফুটবল? সেটা তখন তাঁর জীবনের লক্ষ্যই ছিল না। বরং বাস্কেটবল, টেনিস, হ্যান্ডবল, জিমন্যাস্টিকস, এমনকি ব্যালে নাচও শিখেছিলেন। বাতিস্তুতা হাসতে হাসতে বললেন, ‘এগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। বাস্কেটবল আমাকে লাফাতে শিখিয়েছে, টেনিস শিখিয়েছে দ্রুত নড়াচড়া করতে এবং পায়ের কাজ দ্রুত করতে।’
কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন? সেটা থেমে যায় পরিবারের আর্থিক অনটনে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাড়ি থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে রোজারিওতে চলে গেলেন। সেখানেই প্রথম দেখা হলো মার্সেলো বিয়েলসার সঙ্গে। ‘তিনি ছিলেন চরম পেশাদার, আর আমি পেশাদার ফুটবল সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তিনি আমাদের দৌড়ানো, অনুশীলন করা, খাওয়া সবকিছু শিখিয়েছেন। তিনিই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোচ’—বলেছেন বাতিস্তুতা।
ফ্লোরেন্স যাঁকে প্রথমে চায়নি
রোজারিওর নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ, সেখান থেকে রিভার প্লেট, তারপর বোকা জুনিয়র্স। ১৯৯১ সালে আর্জেন্টিনার পাঠ চুকিয়ে যোগ দিলেন ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনায়।
শুরুটা মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। রিও ফার্ডিনান্ড জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফ্লোরেন্সে যাওয়ার পর কি সঙ্গে সঙ্গেই আপনার ভালো লেগেছিল?’
‘একদমই না’—বাতিস্তুতার সরাসরি উত্তর।
শুরুতে ফ্লোরেন্সও তাঁকে পছন্দ করেনি। দলও সিরি ‘বি’ থেকে সিরি ‘আ’তে ওঠার জন্য সংগ্রাম করছিল। কিন্তু বাতিস্তুতা থাকলেন। কারণ, ওটাই ছিল তাঁর পরিবারের আর্থিক সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ। তাই কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন। গোল আসতে লাগল। ধীরে ধীরে ফ্লোরেন্সের দর্শকেরাও তাঁকে বুকে টেনে নিলেন।
সেই শহরে বাতিস্তুতা ছিলেন ১০ বছর। সিরি ‘বি’ জিতিয়ে দলকে শীর্ষ লিগে তুলেছেন। জিতেছেন ইতালিয়ান কাপ, সুপার কাপও।
সপ্তাহে মাত্র একটা সুযোগ
নব্বইয়ের দশকের সিরি ‘আ’ শুধুই একটা ফুটবল লিগ ছিল না, ছিল ফুটবলে রক্ষণ-কৌশল শেখার এক অলিখিত বিশ্ববিদ্যালয়। পাওলো মালদিনি, ফ্রাঙ্কো বারেসি, ফ্যাবিও ক্যানাভারো এবং আলেসান্দ্রো নেস্তা—এঁদের পাশ কাটিয়ে গোল করা মানে ছিল প্রায় অসাধ্য সাধন। মাউরো তাসোত্তি, আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তা, জিউসেপ্পে বার্গোমি, চিরো ফেরারা, পিয়েত্রো ভিয়েরচউড আরও কত নাম! প্রতি সপ্তাহে নতুন বাধা, নতুন চ্যালেঞ্জ। ফার্ডিনান্ড জানতে চাইলেন, এটা কতটা কঠিন ছিল? বাতিস্তুতার মুখে যেন এখনো পুরোনো যন্ত্রণার ছায়া, ‘ভয়াবহ। সেই সময় প্রতি ম্যাচে হয়তো একটি বা দুটি সুযোগ পাওয়া যেত। সারা সপ্তাহ সেই একটি সুযোগের জন্যই প্রস্তুতি নিতে হতো।’
সকালে ছেলের জন্ম, রাতে গোল
১৯৯৮ বিশ্বকাপ। ফ্রান্সে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা। রিও ফার্ডিনান্ড সেই দিনের কথা মনে করলেন, ‘আমি খুব নার্ভাস ছিলাম, কারণ আমি জানতাম, আপনি এক সুযোগেই গোল করে দেবেন।’
বাতিস্তুতা হাসলেন। তাঁর জন্যও ওই ম্যাচটি ছিল বিশেষ। কারণ, সেদিন সকালেই জন্ম হয়েছিল তাঁর তৃতীয় ছেলের। তবু দলের হয়ে মাঠে নামলেন।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার লড়াই তো শুধু ফুটবল নয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের আবেগ, ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’–এর স্মৃতি—প্রতিটি ম্যাচে ইতিহাস নেমে আসে মাঠে।
সেই ম্যাচে বেকহামের লাল কার্ড, সিমিওনের চতুরতা, মাইকেল ওয়েনের অবিশ্বাস্য গোল—বাতিস্তুতার স্মৃতিতে সব স্পষ্ট। ‘সিমিওনে সব সময়ই জেতার জন্য পাগল থাকত। আর ওয়েন কী যে দ্রুতগতির ছিল!’
ম্যারাডোনা: নায়ক, বন্ধু, অপ্রাপ্তি
বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচেই বাতিস্তুতার হ্যাটট্রিক করেছিলেন। একই ম্যাচে গোল করেছিলেন ম্যারাডোনাও। ভেবেছিলেন সাংবাদিকেরা হয়তো তাঁকে নিয়ে মেতে উঠবেন।
‘কিন্তু সবাই ম্যারাডোনাকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল’—বলতে বলতে বাতিস্তুতা হাসলেন।
ম্যারাডোনাকে নিয়ে বলতে গিয়ে বাতিস্তুতার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, ‘তিনি ছোটবেলা থেকেই অনেক খ্যাতি পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে কেউ কখনো “না” বলেনি, এটি একটি বড় ভুল ছিল। তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা গেছেন। আমরা তাঁকে রক্ষা করতে পারিনি। এর জন্য আমি নিজেকেও দোষারোপ করি।’
মেসি না ম্যারাডোনা: বাতিস্তুতার রায়
এই প্রশ্নটা এড়ানোর উপায় নেই। রিও ফার্ডিনান্ডও করলেন। বাতিস্তুতার উত্তর, ‘তারা দুজন আলাদা। মেসি হাজার গোল করেছেন। শান্ত স্বভাবের। অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা ২০ বছর ধরে। কিন্তু ম্যারাডোনা ছিলেন অন্য মাত্রার। রেফারি থেকে প্রতিপক্ষ—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। সেই ক্যারিশমা, সেই জাদু ফুটবলে অন্য কারও নেই।’
এটাও বললেন, ‘মেসিকে ম্যারাডোনার সমকক্ষ হতে বিশ্বকাপ জিততেই হতো এমন নয়, কারণ মেসি যা করেছেন, তা অতুলনীয়।’
গোল করা শেখানো যায় না
বাতিস্তুতার দর্শনটা সহজ কিন্তু গভীর—‘গোল করা কেউ শেখাতে পারে না। এটা টাইমিং আর অনুভবের বিষয়। বল কোথায় আসবে, ডিফেন্ডার কী করবে, এটা আগে থেকেই কল্পনা করতে হয়।’
বাতিস্তুতার দেখা সেরা স্ট্রাইকার? রোনালদো—দ্য ফেনোমেনন। মুগ্ধ হাসিতে বললেন, ‘তার ড্রিবলিং ছিল অবিশ্বাস্য। আমি তার মতো হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি।’ আর বর্তমান সময়ের স্ট্রাইকারদের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হলান্ড তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেন। বিশেষ করে হলান্ড, কারণ—‘সে সব সময় সঠিক জায়গায় থাকে।’ তরুণদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, ‘অনুশীলন এমনভাবে করো যেন সেটি আসল ম্যাচ।’
পা কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন
খেলোয়াড়ি জীবনে ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলেছেন দিনের পর দিন। এর ফলে তাঁর গোড়ালির কার্টিলেজ (তরুণাস্থি) এবং টেন্ডন পুরোপুরি ক্ষয়ে গিয়েছিল। অবসরের পরেও এর খেসারত দিতে হয়েছে তাঁকে। গোড়ালির যন্ত্রণায় ঘুম হতো না রাতে। ২০০৭-০৮ সালের দিকে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এত কষ্ট আর সহ্য হচ্ছিল না। একসময় চিকিৎসককে বলেছিলেন পা কেটে ফেলতে! স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বললেন, ‘ফুটবল আমাকে অনেক দিয়েছে, কিন্তু কেড়েও নিয়েছে অনেক। তবু এর জন্য আমি ফুটবলকে নয়, নিজেকেই দায়ী করি।’
অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে পা কাটতে হয়নি। চিকিৎসকেরা তাঁর গোড়ালিতে আর্থ্রোডেসিস পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। এতে স্ক্রু দিয়ে তাঁর গোড়ালির হাড়গুলোকে এমনভাবে আটকে দেওয়া হয়, যাতে হাড়ের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং ঘর্ষণ কমে। ২০১৯ সালে তাঁর বাঁ পায়ে একটি কৃত্রিম গোড়ালি প্রতিস্থাপন করা হয়। এর পর থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ আছেন। এখন তো গলফও খেলেন নিয়মিত।
স্বপ্নের দল
পডকাস্টের শেষ দিকে রিও ফার্ডিনান্ড বাতিগোলকে বললেন একটা স্বপ্নের ফাইভ-এ-সাইড দল গড়তে। বাতিস্তুতা বেছে নিলেন—ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, ফের্নান্দো রেদন্দো, ফ্রান্সেসকো টট্টি ও কাফু।