টিটির ‘উবর্র ভূমি’ এখন রংপুর

চোখে বড় স্বপ্ন, আর মনে দেশের টেবিল টেনিসে নিজেদের নাম লেখানোর অদম্য ইচ্ছা। ঢাকার পল্টনে শহীদ তাজউদ্দীন ইনডোরে রংপুর টেবিল টেনিস সংস্থার উদীয়মান খেলোয়াড়েরাতানভীর আহাম্মেদ

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিকল। ঢাকার পল্টনের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোর স্টেডিয়ামের ভেতরে দমবন্ধ করা গরম। তবু ব্যাট-বলের টুং-টাং শব্দে মুখর জায়গাটা। তার মধ্যে আলাদাভাবে দৃষ্টি কাড়েন রংপুর টেবিল টেনিস সংস্থার খেলোয়াড়েরা।

১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার ৬৭ বছর পর আজ রংপুর শহরের এই সংস্থাই জেলা পর্যায়ে দেশের টিটির হৃৎস্পন্দন। সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মোস্তফা বিল্লাহর ভাষায়, ‘ফলের দিক থেকে হয়তো নয়, তবে টিটি-চর্চায় এখন নড়াইলসহ অন্য সব জেলাকে টপকে দেশের ১ নম্বর উর্বর ভূমি রংপুর।’

বৃহস্পতিবার শুরু উন্মুক্ত প্রাইজমানি র‍্যাঙ্কিং টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে তার স্পষ্ট প্রমাণও মিলছে। প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ৪২ জন অংশগ্রহণকারী এসেছেন বিকেএসপি থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ জন রংপুর টিটি সংস্থার।

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত আকমল তাজ, যিনি সাবেক জাতীয় টিটি খেলোয়াড় ও জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন কামরুন নাহার ডানার চাচাতো ভাই। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংস্থাটি নিয়মিত আখতার মেমোরিয়াল টিটি টুর্নামেন্ট করত, যেখানে পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও দল আসত। এখান থেকে ডানা জাতীয় পর্যায়ে দ্বৈতে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। পুরোনো দিনের কথা মনে করে ডানা বলেন, ‘আমাদের সময় তিনটি টেবিল ছিল রংপুরে। তখন ঢাকায় কয়েকটি ক্লাবে মাত্র একটি করে টেবিল। রংপুর প্রতিবছর টিটি টুর্নামেন্ট করত।’

ঢাকার পল্টনের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোর স্টেডিয়ামে চলছে উন্মুক্ত প্রাইজমানি র‍্যাঙ্কিং টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে
প্রথম আলো

সে ঐতিহ্য ধরে রেখে শীর্ষ র‍্যাঙ্কিংধারী খেলোয়াড় হয়েছেন বর্তমান জাতীয় চ্যাম্পিয়ন এই সংস্থার মোহতাসিন আহমেদ। পদাধিকারবলে সংস্থার সভাপতি স্থানীয় জেলা প্রশাসক। কিন্তু অতীতে সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলেও কয়েক বছর ধরে সেটা আর পাওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকও নেই সেভাবে। গত দুই বছরের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, ভুগছে অন্যান্য সংকটেও। তার মধ্যেই চলছে তাদের টিটি-চর্চা।

রংপুর শহরের নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ায় প্রায় ২৪ শতক জায়গায় সংস্থার একতলা ভবন আছে। সেখানে চারটি টেবিলে সপ্তাহে সাত দিনই ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী অনুশীলন করেন। চলমান উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় সংস্থার খেলোয়াড়েরা ভালোই করেছেন।

আরও পড়ুন

অনূর্ধ্ব-১৫ বালকে দেশের ১ নম্বর র‍্যাঙ্কিংধারীসহ বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বেশ কয়েকজন ভালো খেলোয়াড় আছে রংপুরের। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ইনডোরে দাঁড়িয়ে সংস্থার কোচ শামীম সাব্বির বলেন, ‘আমরা বিনা ফিতে প্রশিক্ষণ দিই। কোচ আছেন পাঁচজনের মতো। তার মধ্যে লেবেল ওয়ান কোচ আমিসহ দুজন। বাংলাদেশ টিটি ফেডারেশনের সহসভাপতি খন্দকার হাসান মুনীর ভাই আমাদের সহযোগিতা করেন। আরও সহযোগিতা পেলে অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড় তৈরি করতে পারব।’

চার দিনব্যাপী টুর্নামেন্টে সারা দেশের ৩৯৩ জন খেলোয়াড় নিবন্ধন করেছেন। ৭-৮ বছর থেকে শুরু করে ৭০ বছর বয়সী প্রতিযোগীরাও ৫১০ টাকা এন্ট্রি ফি দিয়ে একক ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন।

প্রতিযোগিতার অংশ নিয়েছেন খই খই সাই মারমা
প্রথম আলো

১৯৮৬ সালে যশোর ছিল দেশের টিটির ‘রাজধানী’। নব্বইয়ের দশকে সেই মর্যাদা চলে যায় নড়াইলের দখলে। বছরজুড়ে নানা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনেক তারকা তৈরি হয়েছে নড়াইলে। মোস্তফা বিল্লাহ, মাহবুব বিল্লাহ, জাবেদ, গৌতম, সোমা, সালেহা, রুমির মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন এসেছেন এখান থেকেই। নড়াইল জেলার খেলোয়াড়েরা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ২২ বার এককে সেরা হয়েছেন। তবে নড়াইলের সাফল্যের সেই নদীটা শুকিয়ে গেছে। কারণ হিসেবে মোস্তফা বিল্লাহ বলেন, ‘উদ্যোগের অভাব। পাশাপাশি জেলার ছেলেমেয়েরাও আর টিটিতে আগ্রহ পাচ্ছে না।’

আরও পড়ুন

এবারের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় নড়াইল থেকে এসেছেন মাত্র দুজন পুরুষ ও একজন নারী খেলোয়াড়। এর মধ্যে একা হোটেলে থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ায় নারী খেলোয়াড়কে ফেডারেশনের ক্যাম্পে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নড়াইলের খেলোয়াড় দাহির সুলতান বিপ্লব বলেন, ‘আমাদের অনেকে বিকেএসপিতে চলে যাওয়ায় খেলোয়াড়-সংকট দেখা দিয়েছে (বিকেএসপির বর্তমানে ৪২ জন টিটি খেলোয়াড়ের ৮ জন নড়াইলের) জেলায় গোটা বিশেক খেলোয়াড় আছেন। শহরও আমি একাই প্রশিক্ষণ দিই।’

একসময়ের আরেক টিটি-চর্চা কেন্দ্র উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর থেকে প্রতিযোগিতায় মাত্র একজন খেলোয়াড় এসেছেন। কুষ্টিয়া থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক নাফিউল ইসলাম জানান, এসএসসিতে দুজন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে তিনি প্রতিযোগিতায় নিয়ে এসেছেন, তা-ও তারা মূলত ঢাকায় এসেছে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশে। গাইবান্ধা থেকে এসেছে একজন। তবে আশা দেখাচ্ছে কুমিল্লার লালপুর নজরুল ইসলাম উচ্চবিদ্যালয়। ১০ জন খুদে খেলোয়াড় (৫ জন ছেলে ও ৫ জন মেয়ে) এসেছে এই স্কুলের। রংপুরের মতো লালপুরও এখন নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে দেশের টিটির অঙ্গনকে।

আরও পড়ুন