‘রুমেও যখন শুয়ে থাকি, আমার বিছানায় একটা বল থাকে’

সব মিলিয়ে ১৪৭ টি–টোয়েন্টির ক্যারিয়ারে আগে কখনো ৫ উইকেট পাননি। পরশু বিপিএলের ম্যাচে ঘুচেছে নাসুম আহমেদের সেই আক্ষেপ। জাতীয় দলের বাঁহাতি এই স্পিনার কাল সিলেটে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন তাঁর নতুন কিছু করার চেষ্টা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদুল হাসান

প্রশ্ন:

টি–টোয়েন্টিতে প্রথম ৫ উইকেট পেয়েছেন। সঙ্গে নতুন কিছু করার আনন্দও তো বোধ হয় আছে…

নাসুম আহমেদ: হ্যাঁ, আসলে অনেক দিন ধরে অনুশীলনে ইনসুইং করানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ম্যাচে কখনো করা হয়নি, আত্মবিশ্বাস পাচ্ছিলাম না। তিন–চার মাস অনুশীলনে ভালো হচ্ছিল দেখে ম্যাচেও করলাম। এখনো যে শতভাগ ঠিকঠাক করতে পারছি, তা না। বলটা একটু ওপরে পড়ে যাচ্ছে। ওই বলটা যদি আরেকটু পেছনে পড়ে, ওটা অনেক ভালো এবং কার্যকর হবে। অনেক দিন ধরে খেলছি, ব্যাটসম্যানরা আমাকে পড়ে ফেলেছে, ওই চিন্তা থেকেই এটা চেষ্টা করছিলাম।

আমি সব সময় চেষ্টা করি নতুন কিছু করতে। এমনকি রুমেও যখন শুয়ে থাকি, আমার বিছানায় একটা বল থাকে। বলটা হাতে রেখে ভাবি এই বলটা কীভাবে ছাড়া যায়, কীভাবে বলটা ধরলে আরেকটু ভালো হয়।
নাসুম আহমেদ, ক্রিকেটার, বাংলাদেশ
বিপিএলে স্পিনারদের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়ার পর নাসুম আহমেদ
বিসিবি
প্রশ্ন:

মুশতাক আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশের স্পিনাররা উইকেট থেকে এত সাহায্য পান যে আর আলাদা করে টার্ন করানোর চেষ্টা করেন না। এটা কি সত্যি?

নাসুম: চেষ্টা যে করি না, তা নয়। বৈচিত্র্য ছাড়া তো টিকতে পারব না। একই রকম বল করে সব সময় পার পাওয়া যাবে না। একই জিনিস যদি বারবারই করি, সবাই আমাকে পড়ে ফেলবে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আলাদা কিছু জিনিস নিয়ে আসতেই হবে। পাঁচ উইকেট পেয়েছি দেখে হয়তো সবাই ইনসুইং বলটা খেয়াল করেছে। আমি সব সময় চেষ্টা করি নতুন কিছু করতে। এমনকি রুমেও যখন শুয়ে থাকি, আমার বিছানায় একটা বল থাকে। বলটা হাতে রেখে ভাবি এই বলটা কীভাবে ছাড়া যায়, কীভাবে বলটা ধরলে আরেকটু ভালো হয়। টিভিতেও সারাক্ষণ বাঁহাতি স্পিনারদের বোলিং দেখি—তাঁরা কী করছে, কীভাবে বল ধরছে বা ছাড়ছে খেয়াল করি। শরীরের কিছু হয়তো বদলাই না, কিন্তু রিস্ট দিয়ে নতুন কী করা যায়, তা ভাবনায় থাকে।

আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

অনুশীলনেও সব সময় কিছু না কিছু করতেই থাকেন…

নাসুম: একটা কথা বলি, ধরুন এক মাসের একটা সফর শেষ করে এলাম। খুব পরিকল্পনা করি যে এক সপ্তাহ কোথাও বের হব না, কোনো কাজ করব না। শুধু খাওয়াদাওয়া, ঘুমানো আর বিশ্রাম। কিন্তু একটা রাত পার হলেই মনে হয়, যাই একটু দৌড়ে আসি। এইটা সহজাতভাবেই হয়ে যায়। অনেকবার সংকল্প করেছি যে এবার বিশ্রাম নেব, কিন্তু পারি না। অশান্তি লাগতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে ভাবি, যখন খেলা ছেড়ে দেব, তখন আমার কী হবে?

ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে এমন উল্লাসেই মাতেন নাসুম
শামসুল হক
প্রশ্ন:

এই তাড়না না থাকলে তো বোধ হয় জাতীয় দলেও আসতে পারতেন না। কী বলেন?

নাসুম: তৃতীয় বিভাগ বাছাই দিয়ে ঢাকা লিগে খেলা শুরু করেছি সেই ২০০৭–০৮ সালে, জাতীয় দলে আসি ২০২১ সালে। আমার একটা জিনিস হলো, হাল ছাড়ি না, নিজেকে সব সময় প্রস্তুত রাখার জন্য সর্বোচ্চটা দিই। অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ খেলে যখন এলাম, প্রথম বিভাগ খেলতে নেমেছিলাম ইচ্ছা করেই। কারণ, আমার মনে হয়েছে তখনো আমি লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের জন্য তৈরি নই। তো যেবার প্রথম বিভাগে খেলি, ৩৬টা উইকেট পেয়েছি, ৪০০–এর বেশি রান করেছি। পরে অনেক ভুগেছি, কিন্তু হাল ছাড়িনি। এ জন্যই হয়তো সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে জাতীয় দল পর্যন্ত এসেছি।

আরও পড়ুন
প্রশ্ন:

আপনার নিজের চোখে নিজের সবচেয়ে শক্তির জায়গা কোনটি?

নাসুম: কখনো অন্য কাউকে নিয়ে চিন্তা করি না। কাউকে দেখে যদি মনে করি আমার ওর থেকে আরেকটু ভালো হতে হবে, তাহলে এগোতে পারব না। কারণ, আমি কখনো আপনার মতো হতে পারব না। যখন অন্য কাউকে নিয়ে চিন্তা করব না, সমালোচনা ছেড়ে দেব, অভিযোগ করব না, তখন জীবন এমনিতেই বদলে যাবে। আমি কখনো কাউকে নিয়ে অভিযোগ করি না।

অনুশীলনের অবসরে নাসুম আহমেদ
শামসুল হক
প্রশ্ন:

শুরুর দিকে আপনাকে মনে করা হতো একটু রক্ষণাত্মক বোলার। সেটাও কি বদলানোর চেষ্টা করছেন?

নাসুম: এটা আমি দলের প্রয়োজনেই করি। কোন বোলার চায় না উইকেট নিতে! যদি উইকেট না পাই, আমারই ক্ষতি। কিন্তু আমার ক্ষতি হয়েও যদি দলের লাভ হয়, আমি তাতে খুশি। অনেক দিন হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছি। এখন বুঝি, আমাকে কখন উইকেট বের করতে হবে, কখন রান আটকাতে হবে। রান কম দাও, উইকেট নাও, এই কথা কারও এসে বলা লাগে না। আমি নিজেই বুঝি। বোলিংয়ে আসার আগেই চিন্তা করি, এখানে এই ওভারে রানটা আটকাতে হবে, এই ওভারে আমার একটা উইকেট বের করতে হবে। আগে শুধু বুঝতাম যে রান আটকালেই মনে হয় দলকে সাহায্য করা হয়, এখন বুঝি যে কখনো কখনো একটা উইকেট বের করে দিলেও দলের সাহায্য হয়। দলের ভরসাটাও এ জন্যই বেড়েছে।

আরও পড়ুন