এবারের বিপিএল কেমন দেখছেন? বাংলাদেশের জন্য তো এটা টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতির মঞ্চও…
ম্যালান: আমার মনে হয়, বিশ্বকাপে ভিন্ন উইকেটে খেলতে হবে। টার্নও করছে না, আবার লো ও স্লো উইকেট—এটা তাদের সাহায্য করবে না বিশ্বকাপে। যদি বাংলাদেশ ভারতে যায়, তাহলে উইকেট ফ্ল্যাট ও বড় রানের হবে। আপনাকে এখানেও তেমন উইকেটে খেলতে হবে। কিন্তু একই মাঠে ৪০টি ম্যাচ আয়োজন করে সে রকম উইকেট রাখা সম্ভব না আমি জানি, চ্যালেঞ্জটাও বুঝতে পারি। বাংলাদেশ যদি শ্রীলঙ্কায়ও যায়, তাহলেও ভালো উইকেটেই খেলতে হবে। খেলোয়াড়দের জন্য সেটাই চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ভালো খেলোয়াড়েরা পথ তৈরি করে নেয়। এই ছেলেরা অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের হয়ে খেলছে, উপমহাদেশের বিশ্বকাপে তাদের সফল না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
রংপুর রাইডার্সে আপনার সতীর্থ মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে তো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল...
ম্যালান: এটা তো আসলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এটা নিয়ে আমার কিছু বলা কঠিন। যখন কোনো ক্রীড়াবিদকে রাজনীতিতে টানা হয়, তখন তা হতাশাজনক। কিন্তু এটাই জীবন। এ মুহূর্তে আমরা এমন পৃথিবীতেই বেঁচে আছি। মোস্তাফিজের জন্য খারাপ লাগছে। আইপিএলে সে অনেক টাকায় দল পেয়েছিল। আগেও অনেকবার আগে আইপিএল খেলেছে। যত খেলবে সেটা আসলে তাঁকে ও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সাহায্য করত, তাঁর দিক থেকে তাই হতাশাজনকই বলব। আমি নিশ্চিত, সে অন্য কোনো টুর্নামেন্টে খেলবে।
এ নিয়ে কতবার বাংলাদেশে এলেন? আপনার সঙ্গে সম্পর্কটা তো দীর্ঘদিনের...
ম্যালান: হ্যাঁ, জাতীয় দল বাদ দিলেও বিপিএল আর ডিপিএল মিলিয়ে অন্তত ৭–৮ বার এসেছি। এত দিন থেকেছি, এখন হয়তো দ্রুতই একটা বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেতে পারি (হাসি)। আমি এখানে আসাটা এমনিতে উপভোগ করি, ক্রিকেট খেলাটাও। একটা আলাদা চ্যালেঞ্জ আছে, খেলোয়াড় হিসেবে বড় পরীক্ষা দিতে হয়। এ জন্যও এখানে আসতে ভালো লাগে।
সেই চ্যালেঞ্জটা কেমন?
ম্যালান: এখানে যে তিনটা মাঠে খেলা হয়, পুরোপুরি আলাদা। চট্টগ্রামের উইকেট হয়তো ব্যাট করার জন্য দুনিয়ারই সবচেয়ে ভালো জায়গাগুলোর একটা। ঢাকার উইকেট আবার ব্যাটসম্যানদের জন্য কঠিন। সিলেটের উইকেট যখন ভালো, তখন ভালো। কিন্তু কখনো কখনো আবার খারাপ হয়ে যায়, বাউন্স থাকে না, ব্যাট করা কঠিন হয়ে যায়। বাংলাদেশে এলে এটা শেখা যায় যে একই ধরনে খেলে সফল হওয়া যাবে না। হয়তো আজ ২০০ রান করলেন, পরের দিন দেখা গেল এতই কঠিন উইকেট যে ১২০ রানও হচ্ছে না। এ জন্যই এখানে টিকে থাকতে হলে মানিয়ে নেওয়া শিখতেই হবে, এটা আমাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও সাহায্য করেছে পরে। কীভাবে রান তাড়া করতে হয়, খেলাটাকে আরও গভীরে নেওয়া যায়। যখন উইকেটে একটু তাড়াতাড়ি যাই, কোন বোলারকে লক্ষ্য বানাতে হবে; এসব ভালোভাবে শিখেছি বাংলাদেশে এসে।
২০১৩ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলতেই বোধ হয় প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছিলেন, কীভাবে প্রথম এলেন, তা কি মনে করতে পারেন?
ম্যালান: রবি বোপারা কিংবা ওয়াইস শাহ যেকোনো একজন হবে, আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছিল যে এখানে একটা ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট চলছে, আমি আগ্রহী কি না। সমস্যা ছিল পরের দিনই বিমানে উঠতে হতো, তবু আমি সুযোগটা হাতছাড়া করিনি।
আমি তখন আসলে ইংল্যান্ডের বাইরে খেলার জন্য সুযোগ খুঁজছিলাম। কারণ, ওখানে হয়তো কিছু একটা নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু সেটা দিয়ে অন্য কোথাও কাজ হবে কি না, তা তো আর আমি জানতাম না। এই পরীক্ষার দরকার ছিল।
যদি এখানে না আসতাম, ধারাবাহিকভাবে বা কীভাবে কম ঝুঁকি নিয়ে রান করা যায়; তা শিখতে পারতাম না। আজকে সকালেও ইথান ব্রুকসকে (এবারের বিপিএলে সিলেট টাইটানসের হয়ে খেলা ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার) আমি বলছিলাম ডিপিএলে সুযোগ থাকলে ওর খেলা উচিত—কারণ এই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটার হিসেবে অনেক কিছু শেখাবে। এখানে বিদেশি ক্রিকেটার হিসেবে খেলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রায় কাছাকাছি মানের চাপের। যদি আপনি পারফর্ম না করেন, তাহলে আপনাকে দ্রুতই বাড়ি যাওয়ার বিমান ধরতে হবে। আপনাকে দলের জন্য ম্যাচ জেতাতেই হবে।
তখন তো নিশ্চয়ই ভাবেননি ইংল্যান্ডের হয়ে তিন সংস্করণেই খেলবেন…
ম্যালান: একদমই না। আমি তখন আসলে মোটামুটি মানের খেলোয়াড় ছিলাম, ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার জন্য যথেষ্ট ভালো তো অবশ্যই না। ২০১৩ সালের ওই বছরটাই ক্যারিয়ার বদলে দিয়েছে। ২০১৪ সালেও বাংলাদেশে এসেছিলাম, অনেক রান করতে শুরু করলাম তখন, আরও বেশি ধারাবাহিক হলাম; খেলাটাকে আরও ভালো বুঝলাম, ভিন্ন ভিন্ন দেশে গিয়ে আলাদা কোচদের সঙ্গে কাজ করলাম, গ্যারি কারস্টেনের সঙ্গে কাজ করাটাও তখন অনেক কাজে দিয়েছিল। ভিন্ন দেশে বিদেশি হিসেবে খেলার চাপটা আমাকে রান করতে শিখিয়েছে।
বাজবলের এই বদলটা আসলে দরকার ছিল ক্রিকেটের জন্যই। অতীতে টেস্ট ক্রিকেট ছিল শুধু ডিফেন্ড করা আর টিকে থাকার।ডেভিড ম্যালান
ইংল্যান্ডের হয়ে ক্যারিয়ারটা কি সন্তুষ্টি নিয়ে শেষ করেছেন?
ম্যালান: হ্যাঁ, আবার না। টেস্ট ক্রিকেটে আরও অনেক ভালো করতে পারতাম। ৫০ ওভারে আমি সব সময়ই ভালো, কিন্তু এই সংস্করণে মাত্র ৩০টি ম্যাচ খেলেছি। তখন ইংল্যান্ড সাদা বলে খুব ভালো দল, জেসন রয়–জো রুট আর জনি বেয়ারস্টো টপ অর্ডারে ব্যাট করত, সেখানে জায়গা করে নেওয়া কঠিন। টি–টোয়েন্টিতে তো ভালোই করলাম। কিছু আফসোস আছে, কিন্তু আমি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে গর্বিত।
আপনার টেস্ট ক্যারিয়ারটা তো বাজবল আসার আগেই শেষ হয়ে গেল। এটা নিয়েও কি আফসোস আছে?
ম্যালান: বাজবলের এই বদলটা আসলে দরকার ছিল ক্রিকেটের জন্যই। অতীতে টেস্ট ক্রিকেট ছিল শুধু ডিফেন্ড করা আর টিকে থাকার। এটা আমার সঙ্গে যায় না। কারণ, আমি অফ স্টাম্পের বাইরে অনেক শট খেলি। এখন যদি থাকতাম, সেটি হয়তো টেস্টে আরও বেশি মানাত। কারণ, আমি অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, আউট হওয়া নিয়ে এখন চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু আপনার এক জীবনে একটাই সুযোগ আসে। সেখানে যেভাবে ইচ্ছে খেলতে পারেন, কিন্তু টিকে থাকতে পারবেন শুধু রান করেই, আমি তা করতে পারিনি। ইংল্যান্ড এবারের অ্যাশেজে অনেক ভুগেছে, কিন্তু দলটা বদলে গেছে আমার সময় থেকে এখন পর্যন্ত; তারা খুব ভালো ব্র্যান্ডের ক্রিকেট খেলেছে।
কিন্তু এবারের অ্যাশেজে তো দুই দিনেই দুটি টেস্ট শেষ হয়ে গেল। নতুন এই ব্র্যান্ডের ক্রিকেটের কারণেই এমন হচ্ছে?
ম্যালান: অনেকে অনেক কিছু বলতে পারে, কিন্তু আমার মতে, দুই দিনে শেষ হওয়া টেস্টগুলোতে উইকেট খারাপ ছিল। তবে এটাও সত্যি, ইংল্যান্ড তাদের মতো খেলতে পারেনি। ব্যাটসম্যানরা উইকেট হারানো নিয়ে যে ভাবে না, তা না। আমার মনে হয়, একটা ধারাবাহিকতা থাকা দরকার। যদি প্রতি ম্যাচেই উইকেটের ধরন বদলে যায়—আজকে আক্রমণ করলেন, কালকে ঠেকাতে শুরু করলেন; তাহলে খেলোয়াড়দের মনে তা দ্বিধা সৃষ্টি করে। উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয় আছে।