ইউরোপে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ, জার্মানিতে রেকর্ড তাপমাত্রা

গরমে গত শুক্রবার খাঁ খাঁ করছে কোলোন শহরের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কোলোন ক্যাথেড্রাল
ছবি: সরাফ আহমেদ

প্রচণ্ড গরমে খাঁ খাঁ করছে রাস্তাঘাট, শপিং মল ও শহরের কেন্দ্রগুলো। অনেক জায়গা দেখে মনে হবে পরিত্যক্ত এলাকা। গত এক সপ্তাহের মধ্য ইউরোপজুড়ে চলেছে স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ।

গত শুক্রবার দুপুর থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জার্মানির ছোট-বড় শহরগুলো যেন ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছিল। জরুরি প্রয়োজন বা কর্মস্থলে যাওয়া ছাড়া অধিকাংশ মানুষই ঘরের বাইরে পা রাখেননি।

গতকাল জার্মানিতে নতুন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, এদিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে দেশটির স্যাক্সনি-আনহাল্ট অঙ্গরাজ্যের ইয়েরিখোয়ার লান্ড জেলার ড্রেভিৎস এলাকায় ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

মাঠে ফসল পাকার আগেই প্রচণ্ড গরমে শুকিয়ে যাচ্ছে
ছবি: সরাফ আহমেদ

আবহাওয়াবিদেরা এক গবেষণায় বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহ তীব্র হয়ে উঠছে।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা নেটওয়ার্ক ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন শুক্রবার প্রকাশিত এক গবেষণায় জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহের জন্য মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই নিঃসন্দেহে দায়ী। গবেষকেরা বলছেন, ৫০ বছর আগেও এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা বিরল ছিল।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়লেও ইউরোপে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। সেখানে বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হারে তাপমাত্রা বাড়ছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা স্বাস্থ্য, কৃষি ও শ্রম খাতে এ তাপপ্রবাহের বড় ধরনের প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ক্রমেই এ ধরনের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।’

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা স্বাস্থ্য, কৃষি ও শ্রম খাতে এ তাপপ্রবাহের বড় ধরনের প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

চলতি বছরের তীব্র তাপপ্রবাহে ইউরোপে এ পর্যন্ত আনুমানিক প্রায় ৪০০ জনেরও বেশি হিটস্ট্রোক, অতিরিক্ত তাপজনিত শারীরিক চাপ, তাপপ্রবাহ বা ডুবে যাওয়া ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

শুক্রবার থেকে মধ্য ইউরোপের দেশ জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে জুন মাসে তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বিশেষ করে গত দুই দিনে জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে চরম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসেই রেকর্ড তাপমাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফ্রান্সের সরকারও বহু প্রশাসনিক অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। দেশটিতে অনেকে গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ব্রাসেলস থেকে জার্মানির কোলোন হয়ে প্যারিসগামী একটি ইউরোস্টার ট্রেন বিকল হয়ে পড়ে। ট্রেনটিতে প্রায় ৪০০ যাত্রী ছিলেন। অতিরিক্ত গরমের কারণে তিন যাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কায় সপ্তাহান্তে প্যারিসের দুটি বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের কারণে হাসপাতালগুলো রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে।

লোকশূন্য, গাড়িবিহীন ফাঁকা হ্যানোভার শহরের একটি রাস্তা
ছবি: সরাফ আহমেদ

এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে নেদারল্যান্ডসের জনপ্রিয় সংগীত উৎসব ‘ডেফকন’-এ যোগ দিতে হাজারো মানুষ জড়ো হলেও প্রচণ্ড গরমের কারণে কর্তৃপক্ষ নজিরবিহীন ‘কোড রেড’ সতর্কতা জারি করে। আয়োজকেরা শেষ মুহূর্তে উৎসবটি বাতিল করতে বাধ্য হন। এ সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

জার্মানিতেও গতকাল হামবুর্গ হাফ ম্যারাথনসহ বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বার্লিনসহ বিভিন্ন শহরের উন্মুক্ত সুইমিংপুলে নতুন টিকিট বিক্রি সীমিত করা হয়েছে।

বার্লিন পুলিশ জানিয়েছে, শনি ও রোববার শহরের কেন্দ্র এবং শার্লোটেনবুর্গ এলাকায় মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে জলকামান ব্যবহার করা হবে। বিশেষ যান থেকে পানির ফোয়ারা ছিটিয়ে মানুষকে গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আজও একই ধরনের গরম অব্যাহত থাকতে পারে।

আরও পড়ুন