ইসরায়েলের সঙ্গে ইইউর চুক্তি স্থগিতের তাগিদ স্পেনসহ তিন দেশের
ইসরায়েলের সঙ্গে ‘অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি’ স্থগিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরুর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) তাগিদ দিয়েছে সদস্যদেশ স্পেন, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। ফিলিস্তিনের গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং লেবাননে চলমান পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দেশগুলো। তাদের ভাষ্য, এ অবস্থায় ইইউ আর ‘নিষ্ক্রিয় দর্শক’ হয়ে থাকতে পারে না।
গত মঙ্গলবার লুক্সেমবার্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস বলেন, এই তিনটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি আলোচনার তালিকায় রাখার অনুরোধ করেছে।
আলবারেস বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের মধ্যে করা অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি আলোচনা ও বিতর্কের জন্য যৌথভাবে অনুরোধ জানিয়েছে স্পেন, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড।
আলবারেস আরও বলেন, ‘আমি আশা করি, প্রতিটি ইউরোপীয় দেশ মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) ও জাতিসংঘের অবস্থানকে সমর্থন করবে। এর ব্যতিক্রম কিছু হলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বড় পরাজয় হবে।’
গত সপ্তাহে ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসকে একটি যৌথ চিঠি দিয়েছে এই তিনটি দেশ। চিঠিতে তারা বলেছে, ইসরায়েল এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যা ‘মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী’। এটি ১৯৯৫ সালের চুক্তিরও লঙ্ঘন, যেখানে ইইউ ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের রূপরেখা দেওয়া আছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ইসরায়েলকে বারবার এ পথ থেকে সরে আসার অনুরোধ জানানো হলেও তারা তা তোয়াক্কা করেনি। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড চালুর প্রস্তাবিত ইসরায়েলি আইনের সমালোচনা করেন এই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তাঁদের মতে, এটি মানবাধিকারের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘পরিকল্পিত নিপীড়ন, নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্যের’ আরেকটি বহিঃপ্রকাশ।
দেশগুলো গাজার মানবিক সংকটকে ‘অসহনীয়’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, সেখানে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না।
চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয় যে দখলকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা তীব্রতর হচ্ছে। সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীরা ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তি’ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছেন। এতে বেসামরিক ব্যক্তিরা প্রাণ হারাচ্ছেন।
তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা লেখেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর পাশ কাটিয়ে থাকতে পারে না’। তাঁরা ‘সাহসী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের’ আহ্বান জানিয়ে সব বিকল্প বিবেচনায় রাখার কথা বলেন।
এসব দেশ যুক্তি দেখিয়েছে যে ইইউ-ইসরায়েল চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। সেখানে মানবাধিকার সুরক্ষার শর্ত রয়েছে। তারা জানায়,আগের এক পর্যালোচনায় ইসরায়েলের শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
এদিকে ব্রাসেলসে দাতা সংস্থাগুলোর এক সম্মেলনে কাজা কালাস জানান, গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় বর্তমানে ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ড ও স্পেন এই চুক্তি পর্যালোচনার প্রথম উদ্যোগ নিলেও ইসরায়েলপন্থী দেশগুলোর বিরোধিতায় তা ভেস্তে যায়। পরবর্তী সময়ে নেদারল্যান্ডের নেতৃত্বে এ ধরনের একটি আলোচনার উদ্যোগ সফল হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েল সম্ভবত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করার মতো পদক্ষেপগুলো আর কার্যকর করা হয়নি।
আয়ারল্যান্ড তাদের ‘অকুপায়েড টেরিটোরি বিল’ আবার সক্রিয় করতে চাইছে। এই বিল পাস হলে পশ্চিম তীরসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা নিষিদ্ধ করা হবে।
এদিকে জনগণের প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে স্পেন ও স্লোভেনিয়াও অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছরের আগস্টে স্লোভেনিয়া প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে দখল করা এলাকার পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে।
স্পেনও একই পথ অনুসরণ করেছে এবং ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসে এই তিনটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই সমন্বিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি কী?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জোটের বাইরের কোনো দেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় আইনি কাঠামোকে বলা হয় ‘অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি’। এটি মূলত ইউরোপের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি।
এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, ইইউর সদস্য না হয়েও কোনো দেশ যাতে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য, রাজনৈতিক সহযোগিতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বজায় রাখতে পারে, সে সুযোগ নিশ্চিত করা।
ইসরায়েলের সঙ্গে ইইউর এই ঐতিহাসিক চুক্তি ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ২০০০ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর রয়েছে। এ চুক্তির অন্যতম বিশেষত্ব হলো, এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা পায়। তবে এর বিনিময়ে তাদের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার শর্ত মেনে চলতে হয়।