ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন উইলিয়াম টেইলর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ বন্ধ ও সংকট সমাধানে কাজ করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি। উইলিয়াম টেইলর বলেন, ‘সমঝোতার জন্য ইউক্রেনের অপেক্ষা করার যৌক্তিকতা আছে। যুদ্ধ এখন ইউক্রনীয়দের পক্ষে। তারা খেরসনে এগিয়ে যাচ্ছে (ইতিমধ্যে এখান থেকে নিজেদের সব সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে রাশিয়া)। এ অগ্রগতির ফলে যেকোনো সমঝোতায় বিভিন্ন শর্ত আরোপ করার সুযোগ পাবে ইউক্রেন।’

লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণায় আলোচনায় বসা নিয়ে জেলেনস্কির অবস্থানে মোড় ঘুরে যায়। পুতিনের এ ঘোষণার পর তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসার যেকোনো সম্ভাবনা নাকচ করে একটি ডিক্রিতে সই করেন জেলেনস্কি।

১১ নভেম্বর ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র খেরসন শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার করে রাশিয়া। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর রাশিয়ার অর্জনগুলো মলিন করে দিতে এটি একটি বড় ধাক্কা। এমনকি গত ৯ মাসের যুদ্ধে ইউক্রেনের আঞ্চলিক রাজধানীগুলোর মধ্যে শুধু খেরসন শহরই ছিল রাশিয়ার দখলে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকলিন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক স্টিভেন পিফারের মতে, সমস্যাটা হলো সমঝোতার কোনো প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে না রাশিয়া। আর যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ার পরও সমঝোতার ক্ষেত্রে মস্কোর দাবিদাওয়া বাড়ছে। স্টিভেন পিফারও ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন।

খেরসন শহর এখন ইউক্রেনের দখলে। তারপরও শহরটিকে রাশিয়ার অংশ বলে দাবি করছে ক্রেমলিন। গত সেপ্টেম্বরে খেরসনসহ ইউক্রেনের চার অঞ্চলকে রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। স্টিভেন পিফার বলেন, রাশিয়া যত দিন না আরও বাস্তবমুখী হবে, তত দিন কোনো সমঝোতা হবে না।

জোট ধরে রাখার চেষ্টা

লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণায় আলোচনায় বসা নিয়ে জেলেনস্কির অবস্থানে মোড় ঘুরে যায়। পুতিনের ওই ঘোষণার পর তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসার যেকোনো সম্ভাবনা নাকচ করে একটি ডিক্রিতে সই করেন জেলেনস্কি। ৪ অক্টোবর স্বাক্ষরিত ওই ডিক্রিতে তিনি বলেন, ‘আমরা রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় তৈরি। তবে সেটি হবে অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে।’

এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে গত মার্চে জেলেনস্কি যে নমনীয় অবস্থান নেন, সেখান থেকে পরিষ্কারভাবে সরে আসেন তিনি। পুতিনের ঘোষণার আগে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে শর্ত দেন, ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে অভিযান শুরুর আগের সীমান্তে ফিরতে হবে দেশটিকে। তবে ইউক্রেনের চার অঞ্চলকে রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করার পর জেলেনস্কি তাঁর শর্ত কড়াকড়ি করেছেন। নতুন শর্তে তিনি রাশিয়ার প্রতি আগে দখল করে নেওয়া ক্রিমিয়া ও সম্প্রতি দখল করা পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসসহ পুরো ইউক্রেন থেকে নিজেদের সেনা সরিয়ে নিতে বলেছেন।

জেলেনস্কির ডিক্রি জারির সময় থেকে ইউক্রেনীয় সেনারা যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করে চলেছেন। সেই সঙ্গে রাশিয়ার ব্যাপারে তাঁর কণ্ঠস্বর চড়া হচ্ছে। এরই মধ্যে মস্কোর সেনারা রাজধানী কিয়েভে ঢুকতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু ইউক্রেনের সেনারা দেশের উত্তর–পূর্বে এক বড় অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছেন। উপরন্তু আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে আরেকটি বিষয়। সেটি হলো, রাশিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের বেসামরিক লোকজনের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতার অভিযোগ।

অতিসম্প্রতি জেলেনস্কি আলোচনার টেবিলে বসতে পাঁচটি শর্তের এক তালিকা দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও ইউক্রেনবাসীকে ক্ষতিপূরণ প্রদান। এগুলো জেলেনস্কির তরফে কোনো নতুন অনুরোধ নয়। তবে ইতিপূর্বে পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তাঁর অস্বীকৃতির কারণগুলোর মধ্যে এসবের উল্লেখ ছিল না, যা এখন উল্লেখ করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা চান, ইউক্রেন যেন আলোচনায় বসার ব্যাপারে খোলা মনোভাবের আভাস দেয়। কিন্তু এ আলোচনা তাদেরই শুরু করতে এমনটা জরুরি নয়।

ক্রমবর্ধমান জন–অসন্তোষে ইউক্রেনের সমর্থক পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে দৃশ্যত দুশ্চিন্তা বাড়ছে। দেশগুলোতে জ্বালানি খাতে খরচ ও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। কোনো না কোনো পর্যায়ে এটি চলমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধেরই ফলাফল। এ সবই অস্থিরতা বাড়াচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোতে।

এমন প্রেক্ষাপটে টেইলর বলেন, ‘ইউক্রেনের একটা যৌক্তিক অবস্থান রয়েছে এবং জেলেনস্কি তাঁর এ অবস্থানের যে রূপরেখা দিয়েছেন, সেটি জোট টিকিয়ে রাখতেই—এটি বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু ইউক্রেনীয়দের সমঝোতার দিকে এগোনো উচিত—মার্কিন কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে কোনো চাপ বা তাঁদের ইঙ্গিত দিচ্ছেন না।’

ইতিমধ্যে রাশিয়া বর্তমান সংকট সমাধানে সামরিক কৌশলের চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। দেশটি সম্ভবত তাকিয়ে আছে শীত মৌসুমের দিকে। মস্কো মনে করে, জ্বালানিসংকটের জেরে ওই সময়ে ইউরোপে অস্থিরতা উসকে উঠবে ও ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা দেশের সমর্থন কমবে; যা কিয়েভকে পাল্টা ধাক্কা দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে—বলেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রাফায়েল লস।

রাফায়েল লস বলেন, তাপমাত্রা কমতে থাকলে ইউক্রেন থেকে লোকজন প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালাতে থাকবে। এতে ইউরোপের ওপর চাপ বাড়বে। তবে শীত চলে গেলে পরিস্থিতি পুনমূর্ল্যায়ন করতে হবে।