রবি বলেন, এই গ্রুপের আলোচনার কারণে অনেকে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভালো উপায় খুঁজে পেয়েছেন।

গত কয়েক মাসে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, বিশেষত প্রযুক্তি খাতে ভারতীয় কর্মীরা চাপে রয়েছেন। শিক্ষাপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বাইজু’স ও আনএকাডেমি শতাধিক ছাঁটাই করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জায়ান্ট টুইটার অর্ধেকের বেশি ভারতীয় কর্মী ছাঁটাই করেছে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা ৮৭ হাজার কর্মশক্তির ১৩ শতাংশ ছাঁটাই করেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ভারতীয়রা রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলামেলা কথা

এ রকম ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশের জন্য এই মাধ্যমকে বেছে নিয়েছেন।

ছাঁটাই হওয়া ভারতীয়রা টুইটে ক্ষোভ জানাচ্ছেন। তাঁরা লিংকডইনে চাকরি চাইছেন, বার্তা আদান–প্রদানের মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ও স্ল্যাকে গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য দিচ্ছেন। অধিকার আদায়ে সহকর্মীদের সঙ্গে সমাবেশ করার পরিকল্পনা করছেন।

ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন খাতের পেশাজীবী পৃথা দত্ত বলেছেন, ব্যবসাক্ষেত্রে এখন ছাঁটাই এত বেড়েছে যে এ নিয়ে সংকোচ কাটিয়ে সবাই মুখ খুলছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ হতে সহায়তা করেছে। কারণ, শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও এখন আর অত শক্তিশালী নেই।

কয়েক লাখ ভারতীয় কর্মী এখনো শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো কয়েক বছর ধরেই তেমন সক্রিয় নয়। বেসরকারি খাতে চাকরি, শ্রম সংস্কার ও চুক্তিভিত্তিক কাজের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইন্ডিয়ান স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক চন্দ্রশেখর শ্রীপাডা বলেন, নিয়োগকারীদের সঙ্গে এখন যোগাযোগ সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কর্মীদের দুঃখ–দুর্দশা জানানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কারণে শ্রমিক ইউনিয়নের আর আলাদাভাবে মধ্যস্থতা করার প্রয়োজনীয়তা নেই।

গত অক্টোবর মাসে লাভ বজায় রাখতে ২ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাই করা হবে বলে ঘোষণা দেয় বাইজু’স। এরপর প্রতিষ্ঠানটির অনেক কর্মীই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করে অনেকেই প্রতিষ্ঠানটির সংস্কৃতি ও কাজের চাপ নিয়ে মুখ খুলেছেন।

টুইটারে চাকরি হারানো কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের হতাশা প্রকাশ করেছেন। টুইটারের সাবেক এক কর্মী মাস্কের টুইটকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘সব সময় খেয়ালি, কখনোই টুইট নয়।’ আরেক কর্মী টুইটে বলেন, কোনো ধরনের ই–মেইল ছাড়া তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ছাঁটাই বাড়ছে এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো চাকরির বাজার বাড়ছে। ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন খাতের পেশাজীবী পৃথা দত্ত বলেছেন, নিজেদের দক্ষতার বিষয়ে চাকরিজীবীরা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তাঁরা তাঁদের অধিকারের দাবি নিয়ে কথা বলতে পিছপা হন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এত খোলামেলা আলোচনার সুফলও রয়েছে। চাকরিদাতারা অসংবেদনশীলভাবে কর্মীদের বরখাস্ত করার জন্য বা কর্মক্ষেত্রে খারাপ সংস্কৃতির জন্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে এ নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন পৃথা দত্ত। তিনি বলছেন, এখনো অনেকে মুখ খুলতে ভয় পান। তাঁরা মনে করেন, এতে ভবিষ্যতে চাকরি পেতে অসুবিধা হবে।

শ্রমিক ইউনিয়ন কি সক্রিয় হচ্ছে

তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, চাকরিচ্যুত ব্যক্তিরা অন্যভাবেও প্রতিবাদী হচ্ছেন। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের থিরুভানানথাপুরাম শহরে বাইজু’সের চাকরিচ্যুত ১৪০ কর্মী বিক্ষোভ করেন। তাঁরা বলেছেন, পদত্যাগপত্র দিতে তাঁরা বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা কেরালার রাজ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেন। তিনি এ ঘটনার তদন্তের ঘোষণা দেন। কেরালা বাম দলের জোট সরকার দ্বারা পরিচালিত।

এ বিক্ষোভের পরদিন বাইজু’স বলেছে, তারা থিরুভানানথাপুরামে কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।

একটি শিক্ষাপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সাবেক তিন কর্মী বিবিসিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাঁরা চাকরি হারানো ও প্রতিষ্ঠানের দেওয়া নোটিশের বিষয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

নিবন্ধিত শ্রমিক ইউনিয়ন বেঙ্গালুরুর অল ইন্ডিয়া আইটি অ্যান্ড আইটিজ এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট সুমন দাসমহাপাত্র বলেছেন, তাঁদের সংগঠনের সদস্য দ্রুত বাড়ছে। ২০১৮ সাল থেকে এই শ্রমিক ইউনিয়ন কয়েক শ প্রযুক্তিকর্মীকে সহায়তা দিয়েছে।

দাসমহাপাত্র আরও বলছেন, প্রযুক্তি খাতে যতজন চাকরি হারিয়েছেন, তার তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম। প্রযুক্তি খাতে চাকরিজীবীরা এখনো শ্রমিক ইউনিয়নে যুক্ত হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাঁরা ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন।

দাসমহাপাত্র বলছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে ভারতে শ্রমিক ইউনিয়ন জোরালো হবে। বৈশ্বিক মন্দার কারণে চাকরির বাজারে অস্থিরতা থেকেই এমনটা ঘটবে বলে তাঁর ধারণা।

গত কয়েক বছরে অ্যামাজন, স্টারবাকস ও অ্যাপলের মতো মার্কিন জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের ইউনিয়ন গঠন করতে দেখেছে। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আরও শক্তিশালী হবে।

তবে দাসমহাপাত্রের সঙ্গে একমত নন শ্রীপাডা। তিনি বলছেন, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এভাবে জোরদার হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, কর্মক্ষেত্রে প্রগতিশীল, জনকেন্দ্রিক নীতি চালুর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়েছে।

শ্রীপাডা অবশ্য এমনও বলছেন, যদি প্রতিষ্ঠানগুলো অসংবেদনশীল ও উদাসীনতার সঙ্গে ছাঁটাই চালিয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি অন্য রকমও হতে পারে।