ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ তিনি, নাম ফেরাতে লড়ছেন কামতা প্রসাদ
নাম কামতা প্রসাদ। বয়স ৫৩ বছর। থাকেন ভারতের দিল্লিতে। দরজির কাজ করেন। দিল্লির সরকারি দপ্তরে এসেছেন। কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। উদ্দেশ্য একটাই—তিনি যে বেঁচে আছেন, সেটার প্রমাণ দেওয়া।
অবাক হলেও ঘটনাটি সত্য। কামতাকে এখন নিজের ‘বেঁচে থাকার’ প্রমাণ দিতে হচ্ছে। ভারতের ভোটার তালিকা থেকে যে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদেরই একজন কামতা।
মূলত ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন করতে গিয়ে এ কাণ্ড ঘটিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। বাদ পড়েছে কামতাসহ এত এত মানুষের নাম। তালিকায় কামতাকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ দিব্যি বেঁচে–বর্তে আছেন তিনি।
মূলত ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) করতে গিয়ে এ কাণ্ড ঘটিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। বাদ পড়েছে কামতাসহ এত এত মানুষের নাম। তালিকায় কামতাকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ দিব্যি বেঁচে–বর্তে আছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের এমন কাণ্ডে ক্ষোভ ছড়িয়েছে ভারতজুড়ে। প্রতিবাদ–বিক্ষোভে শামিল হয়েছে বিরোধী দলগুলো। রাজপথে নেমে এসেছেন তরুণেরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলছে তুমুল আন্দোলন। এ আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।
খবরটি (ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া) শুনে বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। এর পর থেকে আমি যে বেঁচে আছি, সেটা প্রমাণ করতে সব জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছি।
এসআইআর নিয়ে তুমুল বিতর্কের মুখে পড়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এর আওতায় ভোটার তালিকা থেকে নানা কারণে ভোটারদের নাম কাটা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তথ্যে ‘যৌক্তিক অসংগতি’ ও ভোটারকে ‘মৃত’ হিসেবে নথিভুক্ত করার মতো ঘটনাও।
নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত এ উদ্যোগের ফলে কামতা প্রসাদের মতো অনেককেই এখন ভোটার তালিকায় নাম ফেরাতে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ‘বেঁচে থাকার’ প্রমাণ দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কামতার পরিবারে চার সদস্য। তিনি দরজির কাজ করে প্রতিদিন ২৫০ রুপি (২ ডলার ৬৩ সেন্ট) মজুরি পান। সেই অর্থে সংসার চলে। অথচ এখন কাজকর্ম শিঁকেয় তুলে তাঁকে দিল্লির বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ছুটতে হচ্ছে। তা–ও আবার ‘বেঁচে থাকার’ প্রমাণ দিতে।
বিনা দোষে চরম ভোগান্তিতে পড়া কামতা প্রসাদ বলেন, ‘খবরটি শুনে বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। এর পর থেকে আমি যে বেঁচে আছি, সেটা প্রমাণ করতে সব জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছি।’
দিল্লিতে প্রায় ৪২ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে কমিশন। গত ৩১ আগস্ট একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি প্রকাশের পরপরই তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। তখনই কামতা জানতে পারেন, তিনি ‘মৃত’। ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী দল ও তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন প্রায় প্রতিদিনই দিল্লিসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করছে। বিক্ষোভ দমাতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করছে। আটকও করছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকা সংশোধনে কারসাজি করেছেন। এমনটা করা হয়েছে যাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনে সুবিধা পায়। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—উভয় পক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রসঙ্গে কমল লাল বলেন, এত দিন ধরে এ দেশে ভোট দিয়ে আসছি। অথচ এখন জমির কাগজপত্র কিংবা পানির বিলের কাগজ নেই বলে
নাম কাটা, এরপর করণীয়
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘জান সারোকার’–এর স্বেচ্ছাসেবক রাজেন্দ্র কুমার বলেন, কামতা প্রসাদ দিল্লির যে এলাকায় থাকেন, সেখানে মোট ভোটার প্রায় ৯ হাজার। তাঁদের মধ্যে হাজার দুয়েকের নাম সংশোধিত তালিকায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
এলাকায় থাকেন না, অন্যত্র চলে গেছেন, মারা গেছেন, অন্য জায়গায় ভোটার হয়েছেন—এমন নানা কারণ দেখিয়ে এসব ভোটারের নাম সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ওই এলাকায় কামতা প্রসাদ একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর নাম ‘মৃত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় এমন আরও ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো খবর প্রকাশ করেছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভুল করে তালিকা থেকে কারও নাম বাদ পড়লে, তিনি দাবি জানাতে পারবেন। প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারবেন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে আপিল করারও সুযোগ রয়েছে।
কামতা প্রসাদের মতো দরিদ্র মানুষের কাছে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া মানে হলো দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়া। এখন পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁদের জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে হতে পারে। ঠিকানার সত্যতা নিশ্চিত করা এবং তথ্যের অসঙ্গতি সংশোধন করার পাশাপাশি নতুন করে নথিপত্র জমা দিতে হতে পারে।
কাজটা মোটেও সহজ নয়। সংশোধনের জন্য বারবার নির্বাচন কার্যালয়ে যেতে হয়। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সামনে শুনানিতে হাজিরা দিতে হয়। একাধিকবার আপিল করতে হয়। নাম ফেরত পেতে কারও কারও কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস লেগে যায়।
কামতা প্রসাদ বলেন, ‘গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। ৩৫ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি। এ কথাটা তাঁদের (নির্বাচনী কর্মকর্তা) বলেছি। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনছেন না।’
বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কমিশন কোনো জবাব দেয়নি।
একই ভোগান্তি কমলের
কয়েক সপ্তাহের টানা বিক্ষোভের পর কয়েকটি রাজ্যে সংশোধিত ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে দিল্লিও আছে। কামতা বলেন, তাঁর নাম আবারও তালিকায় তোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
দিল্লিতে একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ান কমল লাল। ৩৮ বছরের কমলের নামও এখন আর ভোটার তালিকায় নেই। বাদ পড়ার কারণ, কমল এলাকা ছেড়ে ‘অন্যত্র চলে গেছেন’। কিন্তু এ শিক্ষক এখনো দিল্লিতে একটি উড়াল সড়কের নিচে গড়ে ওঠা বসতিতে থাকেন। সেখানে আরও কয়েক ডজন পরিবার বসবাস করে।
তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রসঙ্গে কমল বলেন, ‘এত দিন ধরে এ দেশে ভোট দিয়ে আসছি। অথচ এখন জমির কাগজপত্র কিংবা পানির বিলের কাগজ নেই বলে—নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টা খুবই হতাশার।’
কথায় কথায় কমল বললেন, ভোটার তালিকায় নাম না থাকার বিষয়টি গত সেপ্টেম্বরে প্রথম জানতে পারেন। এরপর তিনি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শুনানিতে হাজির হন। নাম ফেরানোর জন্য একাধিকবার আবেদনও করেন।
ক্ষোভ জানিয়ে কমল বলেন, সমাধান হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যে বুদ্ধি দিয়েছেন, সেটা অনেককেই খুশি করতে পারেনি। নিবন্ধিত তালিকায় আগেই নাম ফেরানোর বদলে তাঁদের ভোটার হিসেবে নতুন করে নাম নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে।
রেশন নিয়ে চিন্তায় মমতা
একই সমস্যায় পড়েছে ৩৯ বছর বয়সী মমতার পরিবারও। মমতা বলেন, ‘এখন স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা আমাদের নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে বলছেন। কিন্তু আমার স্বামী এতে রাজি নন। তিনি গত কয়েকটা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন।’
উদ্বেগ জড়ানো কণ্ঠে মমতা বলেন, ‘ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে ভর্তুকি মূল্যে রেশন আর সরকারের অন্যান্য জনকল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটা নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি।’