তিন ভাইয়ের লাশ ফিরল ঘরে

তিন ভাই ২০ টাকা (১৭ রুপি) দিয়ে টিকিট কেটেছিল। মনের আনন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছিল ৭৫৫ ফুট লম্বা সেতুতে।

সেতু ছিঁড়ে পড়ার মুহূর্তটি দেখেছেন নীতিন কাভিয়া নামের এক ব্যক্তি। দেখেছেন, সেতু থেকে অসংখ্য মানুষকে পড়ে যেতে। তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল প্রায়। ওই পড়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে হয়তো ছিল ওই তিন ভাইও।

মা কান্তাবেন তখন সংসারের কাজে ব্যস্ত। সে সময়ই হঠাৎ ছেলেদের এক বন্ধুর মুখে শোনেন, সেতু ছিঁড়ে পড়ার দুঃসংবাদ। অস্থির হয়ে ওঠেন মা। তাঁর তিন ছেলে তো সেই সেতুতে বেড়াতে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেদের ডাকাডাকি শুরু করেছিলাম। অনেক খুঁজেও পাইনি।’

বাবা রাজেশও ঘটনাস্থলে দৌড়ে যান। সেখানেও ছেলেদের খোঁজ না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে থাকেন। রাত ১১টায় তিনি ধার্মিক ও চিরাগকে মরবির একটি হাসপাতালে খুঁজে পান।

পুলিশ, স্থানীয় কর্মকর্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল ও সামরিক কর্মকর্তারা উদ্ধার অভিযান চালাতে থাকেন। রাত তিনটার দিকে পাওয়া যায় চেতনের লাশ।

মা কান্তাবেন বলেন, ‘আমরা আমাদের সবকিছু, আমাদের তিন ছেলেকে হারিয়েছি। এখন আমাদের কী আছে? আমি ও আমার স্বামী এখন একা।’

বাবা রাজেশ বললেন, হারিয়ে যাওয়া ছেলেরা কে কেমন ছিল। ২০ বছরের ছেলে চিরাগ একটি চশমার দোকানে কাজ করতেন। বাবা রাজেশ ছিলেন গাড়িচালক। দুজনের আয়েই চলত সংসার।

রাজেশ বলেন, ‘চিরাগ খুবই ভালো ছেলে ছিল। আমি যা বলতাম, সে সব শুনত। সে যা চাইত, আমিও তাকে তা দেওয়ার চেষ্টা করতাম।’

বাবা রাজেশ আরও বলেন, আগামী ১৪ ডিসেম্বর ধার্মিক ১৮ বছরে পা দিত। সে চাকরি খুঁজছিল। সে খুব দুষ্টু ছিল। কত মজার স্মৃতি তার সঙ্গে। এখন তারা সবাই চলে গেছে।
মা বলেন, ধার্মিক তেলে ভাজা পরোটা পছন্দ করত। প্রায়ই বানিয়ে দিতে বলত।

ছোট চেতন স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ত। বাবা রাজেশ বলেন, সে ছিল তুখোড় ছাত্র। মা-বাবার কাছে আছে কয়েক বছর আগে তোলা তিন ভাইয়ের পাসপোর্ট সাইজের ছবি। সেটাই এখন স্মৃতি তাঁদের কাছে।
মা কান্তাবেন ছেলেদের মৃত্যুর জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের শাস্তি চান। বাবাও বলেন একই কথা। বলেন, ‘আমরা উত্তর চাই। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’
রাজেশ এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘তা না হলে অনেকে আমার সন্তানদের মতো মারা যাবে।’

রাগে দুঃখে টিকিট ছিঁড়ে ফেলেন নীতিন

সেতুতে যারা ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন নীতিন কাভিয়া। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন তিনি। একজন সাত বছরের আর একজনের বয়স ছিল সাত মাস।

চারজনের পরিবারটি ঝুলন্ত সেতুতে আনন্দে ছবি তুলছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে এই দম্পতি সেতু থেকে নেমে মাচু নদীর পাড়ে বসেন। আর সে কারণেই প্রাণে বেঁচে যান।

নীতিন বলেন, ‘সেতুতে প্রচুর ভিড় ছিল। আমার ধারণা সেতুতে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ উঠেছিল। যাঁরা টিকিট বিক্রি করছিলেন, ভিড় কমানোর জন্য আমি তাঁদের টিকিট দেওয়া বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। তবে তাঁরা কী করেছিলেন, আমি জানি না।’

নদীর পাড়ে বসার পর ছোট মেয়েটিকে পানি খাওয়ানোর জন্য নিচের দিকে ঝুঁকেছিলেন নীতিন। ঠিক সে সময় তিনি তীব্র চিৎকার শোনেন। দেখেন, সেতুটি তীরের আরেক প্রান্তের কাছাকাছি ছিঁড়ে গেছে। সেতুর ধাতব কাঠামোটি দুই পাশে ঝুলছিল।
নীতিন বলেন, ‘আমি দেখছিলাম, সেতু থেকে মানুষ পিছলে পানিতে পড়ে যাচ্ছে। এরপর আর তাদের দেখা যাচ্ছে না। অনেকে সেতুর কিছু অংশ আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল। আমরা যতটা পেরেছি, অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি।’

রাজ্য সরকারের ঘোষণায় গতকাল সোমবার নীতিন জেনেছেন, সেতু ছিঁড়ে ১৪১ জন নিহত হয়েছে।

সেতুটি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান অরেভার নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যবস্থাপকেরা টিকিট বিক্রির অপরাধে নয়জনকে আটক করেছেন। সেতু ছিঁড়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি অরেভা। সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের তদন্ত হবে কি না, এমন প্রশ্ন করেছেন অনেকে।

অনেকেই সে সময় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা কী করছিলেন, তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

নীতিন এখনো সেতু ছিঁড়ে পড়ার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি। তিনি এখনো নদীতে পড়ে যাওয়া মানুষের চিৎকার শুনতে পান। নীতিন বলেন, সেদিন রাগে দুঃখে তিনি টিকিট ছিঁড়ে ফেলেছেন। পুরো শহর বিক্ষুব্ধ।