ফিরে দেখা
অতিরিক্ত পানি পানই কি ব্রুস লির মৃত্যুর কারণ, রহস্যের জট খোলেনি আজও
ব্রুস লির মৃত্যুর পরপরই মুক্তি পায় ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’। সিনেমাটি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে। বিশ্বজুড়ে কুংফু নিয়ে শুরু হয় অভূতপূর্ব এক উন্মাদনা। পশ্চিমা দর্শকের কাছে মার্শাল আর্ট প্রথমবারের মতো মূলধারার বিনোদনে পরিণত হয়, আর ব্রুস লি হয়ে ওঠেন এমন এক কিংবদন্তি, যিনি মৃত্যুর পরও তারকাখ্যাতির শিখরে উঠতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৭৩ সালে আজকের দিনে তাঁর মৃত্যু হয়।
সালটি ১৯৭৩, জুলাই মাস। একাধিক নতুন সিনেমা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত সময় যাচ্ছিল ব্রুস লির। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘গেম অব ডেথ’। সদ্য ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ সিনেমার কাজ শেষ করেছেন, সেটি মুক্তির তোড়জোড় চলছিল।
২০ জুলাই, ব্রুস লি সেদিন হংকংয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রুটিনমতো শরীর চর্চা করেন, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট কাজে একাধিক জনের সঙ্গে দেখা করেন, আলোচনা করেন। সন্ধ্যায় একজন সহ–অভিনেত্রীর বাড়িতে গিয়েছিলেন সিনেমা নিয়ে কথা বলতে।
সেখানে মাথাব্যথা শুরু হলে একটি ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে চলে যান। হয়তো ভেবেছিলেন, খানিকটা বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি কেটে যাবে, শরীর ঠিক হয়ে যাবে। ব্রুস লির সে ঘুম আর ভাঙেনি।
জন্ম ও শৈশব
১৯৪০ সালের ২৭ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর চায়নাটাউনের এক হাসপাতালে জন্ম নেন এক রোগা-পাতলা শিশু। জন্মের সঙ্গেই জড়িয়ে যায় এক কাকতাল।
শোনা যায়, মা গ্রেস ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘ইউমেন ক্যাম’, কিন্তু হাসপাতালের নার্স নামটি ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পেরে জন্মসনদে নাম লেখেন ‘ব্রুস লি’। মা–বাবা আপত্তি করেননি, কারণ নামটি তাঁদের পছন্দই হয়, তাই আর বদলাননি।
তখন কি তাঁরা ভেবেছিলেন, এই নামই একদিন হয়ে উঠবে বিশ্ব চলচ্চিত্র ও মার্শাল আর্টের ইতিহাসের প্রতীক—পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক দূরত্ব ভাঙার এক নীরব কিন্তু প্রবল শরীরী ভাষা!
জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে হলেও ব্রুস লির পারিবারিক শিকড় ছিল হংকংয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন ক্যান্টনিজ অপেরার জনপ্রিয় শিল্পী লি হুই চোয়েন। ব্রুস লির জন্মের এক বছরের মাথায় পরিবার নিয়ে লি হুই হংকংয়ে ফিরে যান। সেখানেই মঞ্চ, আলো, ক্যামেরা আর অভিনয়ের আবহে বেড়ে ওঠেন শিশু ব্রুস লি।
শিশুশিল্পী থেকে রাস্তায় মারামারি করে বেড়ানো উদ্ধত কিশোর
ফিল্ম স্টুডিওই ছিল ব্রুস লির প্রথম খেলার মাঠ। বাবার হাত ধরে ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরা, আলো, সেট—সবই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে স্বাভাবিক পরিবেশ। মাত্র ছয় বছর বয়সে ‘দ্য বিগিনিং অব আ বয়’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা।
সমালোচকদের মতে, সাত বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিস্ময়কর স্বচ্ছন্দ—চোখের দৃষ্টি স্থির, শরীরী ভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত। ১৮ বছর হওয়ার আগেই তিনি হংকংয়ে ২০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। দর্শকের কাছে তাঁর নাম হয়ে ওঠে ‘লি সিউ লুং’ বা খুদে ড্রাগন।
কিন্তু পর্দার এই শান্ত শিশুটির বাস্তব জীবন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। কৈশোরে পা রাখার আগেই হংকংয়ের রাস্তায় ঝগড়া আর মারামারির জন্য ব্রুস লি পরিচিত হয়ে ওঠেন। সমবয়সীদের নিয়ে তৈরি ছোটখাটো একটি ‘গ্যাং’ ছিল তাঁর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পাশাপাশি আগ্রাসী মানসিকতা তাঁকে বারবার মারামারিতে জড়িয়ে ফেলত।
ব্রুস লি ছিলেন হালকা–পাতলা গড়নের। রাস্তায় মারামারি করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের কাছে বহুবার মার খেতে হয়েছে তাঁকে। এই অপমান, ক্ষত আর ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে ঠেলে দেয় মার্শাল আর্টের দিকে। কুংফু তাঁর জীবনে আত্মরক্ষার জরুরি প্রয়োজন হয়ে আসে। এরপর যুক্ত হয় উইং-চুন-চীনা আত্মরক্ষার এক সূক্ষ্ম, নিয়ন্ত্রণনির্ভর শৈলীর সঙ্গে। এই শৈলীতে শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সময়জ্ঞান, দূরত্ব আর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর বুদ্ধিমত্তা। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা কঠোর অনুশীলনই ব্রুস লিকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়।
নৃত্য আর মার্শাল আর্ট মিলেমিশে একাকার
সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুলে পড়ার সময় একটি ঘটনা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়—ব্রুস লি সাধারণ কেউ নন। তাঁর দুর্বিনীত আচরণে বিরক্ত হয়ে একদিন এক শিক্ষক স্কুলের বক্সিং রিংয়ে শিক্ষার্থী ব্রুস লিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেন।
সে সময় ব্রুস লির বক্সিংয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। কিন্তু হার মানতে নারাজ এ কিশোর নিজের শেখা উইং-চুন কৌশলের ওপর ভর করেই রিংয়ে নেমে পড়েন। আত্মবিশ্বাস আর দ্রুত পা চালনার দক্ষতার ওপর ভর করে ব্রুস লি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিজ্ঞ শিক্ষককে পরাস্ত করেন।
বিস্মিত–মুগ্ধ শিক্ষক শাস্তির বদলে ব্রুস লিকে স্কুল বক্সিং দলে নিয়ে নেন। সেই বছরই আন্তবিদ্যালয় টুর্নামেন্টে তিন বছর ধরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নকে হারান ব্রুস লি।
এ সময়ে তাঁর মার্শাল আর্টে যুক্ত হয় আরেক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা—নৃত্য। খুব কম মানুষই জানেন, ব্রুস লি ছিলেন দক্ষ চা-চা নৃত্যশিল্পী। কিশোর বয়সে হংকংয়ে চা-চা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।
চা–চা লাতিন আমেরিকা বিশেষ করে কিউবার জনপ্রিয় নৃত্য। এ নাচে শরীরের ভারসাম্য ধরে রেখে পায়ের সূক্ষ্ম কাজ দেখাতে হয়। ব্রুস লির মার্শাল আর্টের সঙ্গে এই নাচ মিশে লড়াই আর শক্তির প্রদর্শন থাকে না, বরং হয়ে ওঠে গতি ও ছন্দের এক কোরিওগ্রাফি।
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন
একটি মারামারির ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগ চরমে পৌঁছায়। ব্রুস লির মা বুঝে যান, এই পরিবেশে ছেলেকে রাখা আর নিরাপদ নয়। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই ব্রুস লিকে লেখাপড়ার জন্য পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ষাটের দশকের শুরুতে সিয়াটলে শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। এটা ব্রুস লির কাছে অনেকটা নির্বাসনের মতো ছিল।
পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ, বাসাভাড়া, দৈনন্দিন ব্যয়—সব মিলিয়ে অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী। খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। এই সংগ্রামের মধ্যেই ব্রুস লি নতুন করে নিজেকে গড়তে শুরু করেন। সিয়াটলে তিনি কুংফু শেখানো শুরু করেন এবং একটি মার্শাল আর্ট স্কুল গড়ে তোলেন।
এখানেই তাঁর জীবনে আসে লিন্ডা এমেরি। ছাত্রী থেকে ভালোবাসা, ভালোবাসা থেকে বিয়ে, ১৯৬৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। ১৯৬৫ সালে জন্ম নেয় তাঁদের ছেলে ব্র্যান্ডন লি।
জিৎ কুনে দো
যুক্তরাষ্ট্রে সংগ্রামের সেই দিনগুলোতে ব্রুস লির হাত ধরে লড়াইয়ে নতুন এক কৌশলের জন্ম হয়—নাম ‘জিৎ কুনে দো’। কুংফু, বক্সিং, ফেন্সিং আর বাস্তব স্ট্রিট ফাইটের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তিনি নতুন এ ধারা শুরু করেন।
হলিউডে ব্রুস লি তখন পরিচিত নাম, কিন্তু অভিনয়ের জন্য নয়। তিনি ছিলেন তারকাদের প্রশিক্ষক। স্টিভ ম্যাককুইন, জেমস কোবার্ন, করিম আবদুল জব্বার নিয়মিত তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। সে সময় তাঁর কাছে এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণের পারিশ্রমিক ছিল ২৫০ ডলার—অঙ্কটি তখনকার বিচারে অস্বাভাবিক বড়!
কিন্তু এশিয়ান হওয়ার কারণে অভিনয়ের জগতে ব্রুস লি ছিলেন অবহেলিত। কয়েকটি সিরিজে অভিনয় করে দর্শকদের নজর কাড়তে সক্ষম হলেও মূল চরিত্রের স্বীকৃতি পাননি। এই অবহেলা থেকেই হয়তো তিনি শিকড়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
হংকংয়ে ফিরে অপ্রতিরোধ্য
১৯৭০ সালের শেষ দিকে ব্রুস লি হংকংয়ে ফেরেন। তখন তিনি আর কেবল একজন প্রতিভাবান মার্শাল আর্টিস্ট নন, বরং ভেতরে–ভেতরে পোড় খাওয়া এক মানুষ, যিনি নিজের সঙ্গে এক গভীর ক্ষোভ আর দৃঢ়সংকল্প বয়ে এনেছিলেন। সেখানে তাঁর দেখা হয় প্রযোজক রেমন্ড চৌয়ের সঙ্গে, যিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওকে দিয়ে হংকং চলচ্চিত্রে নতুন এক ধারা গড়তে চাইছিলেন। ব্রুস লি ও রেমন্ড চৌয়ের মেলবন্ধন পরবর্তী কয়েক বছরে কুংফুভিত্তিক চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেয়।
১৯৭১ সালে মুক্তি পায় প্রথম ছবি ‘দ্য বিগ বস’ (চীনা নাম: তাং শান দা শিওং)। থাইল্যান্ডের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটি প্রথমে খুব বড় প্রত্যাশা নিয়ে মুক্তি পায়নি, কিন্তু হলঘরে বসে দর্শকেরা যা দেখলেন, তা তাঁদের পূর্বপরিচিত সব কুংফু নায়কের চেনা ছক ভেঙে দিল।
ব্রুস লির শরীরী ভাষা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—অস্বাভাবিক গতি, আকস্মিক বিস্ফোরণ আর চোখেমুখে জমে থাকা আগুন। প্রথম ফ্লাইং কিকের পর থেকেই দর্শকের উচ্ছ্বাস আর থামেনি। বক্স অফিসে ‘দ্য বিগ বস’ হংকংয়ের আগের সব আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয় এবং এক রাতেই ব্রুস লিকে মহাতারকা বানিয়ে ফেলে।
পরের বছর আসে ‘দ্য চায়নিজ কানেকশন’—আন্তর্জাতিকভাবে বেশি পরিচিত ‘ফিস্ট অব ফিউরি’ নামে। জাপানি দখলযুগে সাংহাইয়ের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে ব্রুস লির চরিত্র চেন ঝেন হয়ে ওঠে অপমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক। সিনেমাটি কেবল বক্স অফিসে সফল নয়, সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণও ঘটায়। মুক্তির পর হংকং ও তাইওয়ানে আগের আয়ের রেকর্ড ভেঙে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে এটি।
ধীরে ধীরে ব্রুস লির খ্যাতি হংকং ও এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে পৌঁছে যায়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন এশীয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন সত্যিকারের বৈশ্বিক অ্যাকশন তারকা—যাঁর উপস্থিতি মানেই বক্স অফিসের গ্যারান্টি।
সে সময় ব্রুস লির পারিশ্রমিক আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। সমকালীন এশীয় সিনেমায় যা ছিল কল্পনাতীত, ব্রুস লি সেখানে চলচ্চিত্রপ্রতি নজিরবিহীন অঙ্কের পারিশ্রমিক দাবি ও আদায় করতে সক্ষম হন।
অনেক গবেষকের মতে, তিনিই প্রথম এশীয় অভিনেতা, যাঁর চলচ্চিত্রমূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবার মিলিয়ন ডলার পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করে—যা পরবর্তীকালে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’-এর মাধ্যমে বাস্তবেই নিশ্চিত হওয়ার পথে ছিল।
অকালে চলে যাওয়া
হংকং ও আন্তর্জাতিক সিনেমায় ব্রুস লির অভাবনীয় সাফল্য বিনা পরিশ্রমে আসেনি, দিন–রাত এক করে তিনি পরিশ্রম করে গেছেন। এ জন্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।
একদিকে একের পর এক ছবির শুটিং, অন্যদিকে চিত্রনাট্য লেখা, ফাইট কোরিওগ্রাফির পরিকল্পনা, প্রতিদিনের দীর্ঘ শরীরচর্চা ও নতুন কৌশলের পরীক্ষা—সব মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি দিন ছিল প্রায় নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের চক্রে বাঁধা। অনিদ্রা তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। নিজের শরীর আর মনের সীমাকে তিনি বারবার ঠেলে দিচ্ছিলেন অবিশ্বাস্য উচ্চতায়। সে সময়ে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল হলিউডের মূলধারার চলচ্চিত্রের বাজারে পূর্ণ শক্তিতে প্রবেশ করা।
‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ সিনেমা দিয়ে তিনি নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় কুংফুর ওপর নির্মিত প্রথম বৃহৎ বাজেটের কোনো চলচ্চিত্র, যা ব্রুস লিকে একযোগে এশিয়া ও পশ্চিমের বাজারে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল।
এই চাপের মধ্যেই ১৯৭৩ সালের মে মাসে ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ ছবির ডাবিংয়ের সময় একবার ব্রুস লি হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন।
চিকিৎসকেরা সে সময় তাঁর মস্তিষ্কে সেরিব্রাল এডিমা বা পানি জমে মস্তিষ্কের কোষ ফুলে ওঠার গুরুতর লক্ষণ শনাক্ত করেন। দ্রুত চিকিৎসায় সেবার তিনি প্রাণে রক্ষা পান। কিন্তু সেই ঘটনা ছিল ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কসংকেত।
এর মাত্র দুই মাস পর ২০ জুলাই হংকংয়ের কাউলুন টং এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ব্রুস লির মাথাব্যথা শুরু হয়। একটি ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েন তিনি, আর ওঠেননি। মাত্র ৩২ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন এক কিংবদন্তি।
ব্রুস লির আকস্মিক মৃত্যুর খবরে বিশ্বজুড়ে শোকের ঢেউ ওঠে। হংকংয়ে তাঁর মরদেহ একনজর দেখার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। শোকাহত জনতাকে সামলাতে পুলিশকে ব্যারিকেড দিতে হয়। তাঁকে সিয়াটলে সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুর কারণ আজও রহস্য
মার্কিন লেখক, সাংবাদিক এবং মার্শাল আর্ট গবেষক ম্যাথিউ এ পলি জীবনীগ্রন্থ ‘ব্রুস লি: আ লাইফ’ (২০১৮) এ লেখেন, ২০ জুলাই মাথাব্যথা কমাতে ব্রুস লি ব্যথানাশক ওষুধ ‘একুয়াজেসিক’ খেয়েছিলেন। পরে বিছানায় তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এবং অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সে সময়ে নিউরোসার্জন পিটার উ–র ধারণা ছিল, ব্রুস লির মৃত্যু সেরিব্রাল এডিমা বা মস্তিষ্কে ফোলার কারণে হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তাঁর সেরিব্রাল এডিমা হওয়ার কারণ নিয়ে একাধিক তত্ত্ব সামনে এসেছে। মৃত্যুর সময় সেরিব্রাল এডিমার কারণ হিসেবে একুয়াজেসিক এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়েছিল। তিনি আগেও এই ওষুধটি সেবন করতেন বলে জানা যায়।
কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, ব্রুস লির শরীরে পাওয়া গাঁজার উপস্থিতি তাঁর মৃত্যুতে ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও ফরেনসিক বিজ্ঞানী ডোনাল্ড টিয়ার এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
ম্যাথিউ এ পলি তাঁর গ্রন্থে লেখেন, অতিরিক্ত পরিশ্রম ও হিট স্ট্রোকের কারণে ব্রুস লির সেরিব্রাল এডিমা হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে, ১৯৭২ সালে তাঁর বগলের ঘর্মগ্রন্থি অপসারণ করা হয়েছিল।
তবে ২০২২ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, অতিরিক্ত পানি পান করার কারণে ব্রুস লির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। স্পেনের কিডনি বিশেষজ্ঞদের পরিচালিত এই গবেষণাটি ‘ক্লিনিক্যাল কিডনি জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, অতিরিক্ত পানি শরীর থেকে বের করে দিতে কিডনির অক্ষমতার কারণে ব্রুস লির সেরিব্রাল এডিমা বা মস্তিষ্কে ফোলা রোগ হয়ে থাকতে পারে।
ব্রুস লির মৃত্যুর পরপরই মুক্তি পায় ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’। ছবিটি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে। বিশ্বজুড়ে কুংফু নিয়ে শুরু হয় অভূতপূর্ব এক উন্মাদনা। পশ্চিমা দর্শকের কাছে মার্শাল আর্ট প্রথমবারের মতো মূলধারার বিনোদনে পরিণত হয়, আর ব্রুস লি হয়ে ওঠেন এমন এক কিংবদন্তি, যিনি মৃত্যুর পরও তারকাখ্যাতির শিখরে উঠতে থাকেন।
পরবর্তী সময়ে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
তবে ব্রুস লির প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল সিনেমা বা বক্স অফিস সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রুস লির সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মার্শাল আর্টকে দেখিয়েছেন আত্ম-অন্বেষণের ভাষা হিসেবে, যেখানে শরীর কেবল শক্তির মাধ্যম নয়, বরং চিন্তা, প্রতিবাদ আর মুক্তির প্রকাশ। একজন এশীয় হিসেবে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরকেই তিনি বানিয়েছিলেন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম।
তথ্যসূত্র: ইউনাইটেড স্টেটস ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন, পিপল ডটকম, আইএমডিবি