দাম বাড়ছে, ক্ষোভ বাড়ছে: ইরানের নতুন অর্থনৈতিক অস্থিরতার ভেতরের চিত্র

অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে ইরানের রাজধানী তেহরানে দোকানি ও ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ। ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ছবি: এএফপি

ইরানজুড়ে দোকানের তাকে থাকা পণ্যের দাম এখন আর এক সপ্তাহ, এমনকি একদিনও স্থির থাকছে না। অনেক ইরানির জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের হঠাৎ লাফিয়ে বৃদ্ধি এক দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এ কারণেই কেউ কেউ আবারও রাস্তায় নামছেন।

আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে যাওয়া মুদ্রার বিনিময় হারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট হিসেবে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল; তা–ই এখন ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের এক বিস্তৃত বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছে।

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এ বিক্ষোভ মাশহাদ থেকে ইসফাহান পর্যন্ত কয়েক ডজন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিক্ষোভ ২০২২-২৩ সালের ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ (নারী, জীবন, স্বাধীনতা) আন্দোলনের পর ইরানে সবচেয়ে গুরুতর অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিক্ষোভকারীরা এমন এক অর্থনীতির বর্ণনা দিয়েছেন; যা সাধারণ পরিবারের জন্য আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।

মাশহাদের ২৭ বছর বয়সী বাসিন্দা মানি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন তিনি। বলেন, ‘মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটা এত ভয়াবহ কী করে হতে পারে? দাম এত বাড়তে পারে কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘এ দেশে যদি দায়িত্বশীল শাসক থাকত, তবে পরিস্থিতি এমন হতো না।’

এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এ বিক্ষোভ মাশহাদ থেকে ইসফাহান পর্যন্ত কয়েক ডজন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিক্ষোভ ২০২২-২৩ সালের ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ (নারী, জীবন, স্বাধীনতা) আন্দোলনের পর ইরানে সবচেয়ে গুরুতর অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে।

রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়ন এক সপ্তাহ থেকে পরের সপ্তাহে রুটিন কেনাকাটাকেও পরিণত করেছে এক অনিশ্চিত খরচে। তেহরানের ৫৫ বছর বয়সী মরিয়ম জানিয়েছেন যে তিনি সম্প্রতি সূর্যমুখী তেল কেনা স্থগিত করেছিলেন এর দামের কারণে।

মরিয়ম বলেন, ‘তিন দিন পর, দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে গিয়েছিল। আমার আয় কি তিন দিনে দ্বিগুণ হয়েছে যে রান্নার তেলের জন্য আমাকে এত টাকা দিতে হবে?’

‘আমাদের জীবন ও তারুণ্য নষ্ট হয়ে গেছে’

ইরানের কর্মকর্তারা জনগণের অসন্তোষের কথা স্বীকার করেছেন। তবে একে ‘বিদেশি শত্রুদের উসকানিতে সৃষ্ট অস্থিরতা’ হিসেবে বর্ণনা করে সতর্ক করেছেন তাঁরা। নিরাপত্তা বাহিনী কিছু এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটা এত ভয়াবহ কী করে হতে পারে? দাম এত বাড়তে পারে কীভাবে?
মানি, মাশহাদের বাসিন্দা ও বিক্ষোভকারী

ইরানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত শিশুসহ ডজন ডজন মানুষ নিহত হয়েছে। প্রাণহানির সংখ্যা ২৫ থেকে ৩৮ জনের মতো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে (সিবিএস নিউজ জানায়, একটি পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠীর হিসাবে এ সংখ্যা ৪৫)। এ ছাড়া বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

ইরানের কর্তৃপক্ষ নিহত বিক্ষোভকারীদের কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে বলেছে যে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত দুই সদস্য নিহত এবং এক ডজনের বেশি আহত হয়েছেন।

মধ্য ইরানের ইসফাহানে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)’ ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা
ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন যে সমালোচনা করার অনুমতি থাকলেও ‘দাঙ্গাকারীদের অবশ্যই যথাযথ জায়গায় ফিরিয়ে দিতে হবে (দমন করতে হবে)।’

কয়েক দিন পর ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মহসেনি এজেহি দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে অর্থনৈতিক দুর্দশা কাজে লাগানোর জন্য বিদেশি শক্তিকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, যে বিক্ষোভকারীরা ‘শত্রুকে সাহায্য করছেন’ তাঁদের প্রতি কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না।

সরকারি বক্তব্য ও সতর্কতাগুলো কিছু বিক্ষোভকারীকে দমানোর পরিবর্তে আরও ক্ষুব্ধ করছে। ইসফাহানের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী মেহেদি বলেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মন্তব্য শোনার পর তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্লান্ত। আমাদের জীবন ও তারুণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তাঁরা আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। আসলে আমাদের হারানোর আর কী বাকি আছে?’

এজেহি বলেন, ‘ইসরায়েলের এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর দাঙ্গা ও অস্থিরতার জন্য রাস্তায় নামার আর কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।’

অনেকের মতো মানিও এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের ক্ষোভের মূলে রয়েছে দৈনন্দিন কষ্ট। প্রতিবার যখন আমরা এই পরিস্থিতিতে ক্লান্ত হয়ে রাস্তায় নামি, তখন হঠাৎ আমাদের ইসরায়েলি বা সিআইএ এজেন্ট বলে ডাকা হয়।’

আরও পড়ুন

সরকারি বক্তব্য ও সতর্কতাগুলো কিছু বিক্ষোভকারীকে দমানোর পরিবর্তে আরও ক্ষুব্ধ করছে।

ইসফাহান প্রদেশের ফালাভারজানের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী মেহেদি বলেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মন্তব্য শোনার পর তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্লান্ত। আমাদের জীবন ও তারুণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তাঁরা আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। আসলে আমাদের হারানোর আর কী বাকি আছে?’

যদিও ২০২২ সালে ‘নীতি পুলিশের’ হাতে মাশা আমিনির মৃত্যুর পর যে গণ–আন্দোলন হয়েছিল, সে তুলনায় এখনকার বিক্ষোভ আকারে ছোট। তবুও এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও তীব্রতা (কর্তৃপক্ষের জন্য) শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমের কিছু প্রদেশে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন

‘আমরা শুধু পাহলভিকে চাই’

অনেক ইরানি যাঁরা এ বিক্ষোভে যোগ দেননি, তাঁরা পরবর্তী পরিস্থিতি কী হতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে, এসব বিক্ষোভ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমতের তীব্র বিভেদও সামনে নিয়ে এসেছে।

যে বিক্ষোভকারীরা ‘শত্রুকে সাহায্য করছেন’ তাঁদের প্রতি কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না। ইসরায়েলের এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর দাঙ্গা ও অস্থিরতার জন্য রাস্তায় নামার আর কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।
গোলামহোসেইন মহসেনি এজেহি, ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান

ইরানের শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থকেরা কিছু শহরের বিক্ষোভে বেশ সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁরা তাঁর প্রত্যাবর্তনের দাবিতে স্লোগান দিয়েছেন। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সাল থেকে নির্বাসনে থাকা পাহলভি দেশটির ভেতরে কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেননি। তবে সমর্থকেরা তাঁকে বর্তমান ব্যবস্থার বিপরীতে একটি ঐক্যবদ্ধ বিকল্প হিসেবে দেখেন।

অন্যরা অবশ্য এখনো সতর্ক। তেহরানের ৪২ বছর বয়সী নারী মিনা রাজতন্ত্রে ফেরার বিরোধী। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজাতন্ত্রের অধীন তাঁরা প্রতিদিন তলিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর ভয় হয় যে এতগুলো বছর পর তাঁরা আবার ৫০ বছর পিছিয়ে যেতে পারেন—একটি ‘ধর্মীয় একনায়কতন্ত্রের বদলে রাজকীয় একনায়কতন্ত্র’ বেছে নিয়ে।

আরও পড়ুন

কেরমানের ২৩ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী বেহরুজ বলেন, তিনি সংস্কারপন্থী রাজনীতি ও এমন রাজনীতিকদের ক্ষমতায় ফিরে আসাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু পাহলভিকে চাই। অন্য কোনো বিকল্প নেই। আমরা প্রতারক সংস্কারপন্থীদের আর আমাদের বোকা বানানোর সুযোগ দেব না।’

তেহরানে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৬ জানুয়ারি, ২০২৬
ছবি: এএফপি

এ মতপার্থক্য সত্ত্বেও অনেক বিক্ষোভকারী বলছেন যে নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক পরে করা যাবে। আপাতত তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো, অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা এবং বর্তমান ব্যবস্থার বিরোধিতা করা।

ইরানের নেতৃত্ব গত এক দশকে বারবার অস্থিরতার ঢেউ মোকাবিলা করেছে। এটি মোকাবিলায় তাঁরা সাধারণত সীমিত ছাড় ও দমনের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সতর্ক করে বলেছেন, এবারের অস্থিরতা ভিন্ন হতে পারে। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এ ছোট ছোট বিক্ষোভ এক বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিতে পারে; যা পুরো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা রাখে।

আরও পড়ুন