আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে জড়ানোর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কূটকৌশল কতটা সফল হবে
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি কৌশলগত চিত্রনাট্য যেন নিজ থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ওয়াশিংটন ও পশ্চিম জেরুজালেমের কাছে এ অভিযান ছিল তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রদর্শনের এক মোক্ষম সুযোগ, যার স্থায়িত্ব হবে কম, লক্ষ্য হবে নিখুঁত আর মনস্তাত্ত্বিকভাবে যা হবে চূড়ান্ত।
হামলা শুরুর দিকের ধরন দেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, এর উদ্দেশ্য কেবল কিছু স্থাপনার ক্ষতি করা নয়; বরং ইরান রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্র অচল করে দেওয়া। অর্থাৎ দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে, এমন কমান্ড সেন্টার ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোতে আঘাত হানা।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমগুলোর বিস্তারিত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ আগ্রাসনের একেবারে শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। যদিও এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে। তবে দৃশ্যত, এটি যে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে পুরোপুরি নির্মূল করার একটি নীলনকশা ছিল, তা স্পষ্ট।
তবে মনে রাখতে হবে, কোনো অতর্কিত হামলার সার্থকতা তার শুরু দিয়ে নয়; বরং আক্রমণকারী তা কত দ্রুত শেষ করতে পারল, তা দিয়ে বিচার করা হয়। আর এখানেই সাজানো চিত্রনাট্যটি এলোমেলো হয়ে গেছে। ইরান কৌশলগতভাবে থমকে যাওয়া বা স্রেফ আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর পথে হাঁটেনি। উল্টো তারা দীর্ঘমেয়াদি ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে এই সংঘাত কেবল একটি নির্দিষ্ট রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, নৌ নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সংহতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্পেনই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। দেশটি এই আপত্তি এমন সহজ ভাষায় তুলে ধরেছে, যাতে তাদের দেশের সাধারণ মানুষ সহজেই সব বুঝতে পারে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরানের ওপর হামলায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে সরাসরি মানা করে দিয়েছেন।
যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন মাঝপথে ধ্বংস করে দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও ঘন ঘন সাইরেনের আওয়াজ, যাতায়াতব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়া এবং বারবার ধেয়ে আসা নিত্যনতুন হুমকির এক ভয়াবহ প্রভাব রয়েছে। এ পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের সরকারকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাদের এখন ভাবতে হচ্ছে, নিজেদের বাজারব্যবস্থা অচল হওয়ার আগে, নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আগে কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জোটগুলো ভেঙে পড়ার আগে তারা আর কত দিন এই অসহনীয় অবস্থা সহ্য করতে পারবে?
যুদ্ধ যখন কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে রূপ নেয়, তখন তা আর শুধু রণকৌশল বা গোলাবারুদের ওপর নির্ভর করে না। তখন আসল পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়—কার হাতে কত রসদ জমা আছে, কার বাজেট কত শক্তিশালী, পণ্য আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা কতটা সচল এবং অংশীদার দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা সমর্থন দিয়ে যেতে পারবে।
ঠিক এ কারণেই সম্মুখযুদ্ধের মতোই এখন কূটনৈতিক লড়াই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিল, এটি একটি স্বল্পমেয়াদি অভিযান হবে এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব খুব একটা হবে না। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল এখন এমন এক সংকটে পড়েছে, যেখান থেকে সম্মানজনক প্রস্থান বা পরাজয় এড়ানোর পথ খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এমন অবস্থায় যুদ্ধের পরিধি বাড়িয়ে অন্য দেশগুলোকে সঙ্গে টানাটা অনেকটা স্বাভাবিক। কারণ, যুদ্ধের সঙ্গী বাড়লে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করা যায়, রসদ পাঠানোর পথ পাওয়া যায় আর গোয়েন্দা তথ্য বা কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা, যুদ্ধের ভালো-মন্দের দায়ভার তখন একা বইতে হয় না। কিন্তু এই সঙ্গী জোটানোর চেষ্টা এখন বড় এক বাধার মুখে পড়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বা নিরপেক্ষ দেশগুলোই নয়, খোদ পশ্চিমা মিত্রদের ভেতর থেকেও এই যুদ্ধে জড়াতে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে পরিস্থিতি আরও বেশি নাজুক। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্ররা তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তার ওপর ভর করে। এমনকি তাদের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কৌশলও গড়ে উঠেছে নিরাপদ অবকাঠামো আর নির্ভরযোগ্য রপ্তানির ব্র্যান্ডিংকে পুঁজি করে। একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এই দুটি জায়গাতেই বড় ধরনের আঘাত হানবে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্পেনই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। দেশটি এই আপত্তি এমন সহজ ভাষায় তুলে ধরেছে, যাতে তাদের দেশের সাধারণ মানুষ সহজেই সব বুঝতে পারে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরানের ওপর হামলায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে সরাসরি মানা করে দিয়েছেন।
সানচেজ স্পেনের এ অবস্থানকে সংঘাত বাড়ানোর মিছিলে শামিল না হওয়ার একটি ঘোষণা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই অনড় অবস্থানের পর দক্ষিণ স্পেন থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সরবরাহের সরঞ্জামগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, মাদ্রিদের এ সিদ্ধান্ত কেবল মুখের কথা ছিল না; বরং এর বড় ধরনের সামরিক প্রভাবও ছিল।
স্পেনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া আসতেও দেরি হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুতই চাপের রাজনীতি শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন, কথা না শোনার শাস্তিস্বরূপ স্পেনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ট্রাম্পের এমন হুমকি তাঁর নিজের দেশের কট্টর সমর্থকদের কাছে হাততালি পেলেও ইউরোপের মিত্রদের মনে সন্দেহ আরও উসকে দিয়েছে। তারা ভাবছে, মিত্রদেশগুলোর সংহতিকে হয়তো স্রেফ একতরফা বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সানচেজ দমে যাননি; বরং নিজের অবস্থানে আরও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন শাস্তির ভয়ে স্পেন যুদ্ধে নামবে না।
ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর আরেকটি মানে হলো খরচের বোঝা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধাক্কা সামলানোর সামর্থ্য রাখলেও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ভঙ্গুর অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান একটু বেশিই জটিল। ব্রিটিশ সরকার জোর দিয়ে বলছে, ইরানের ওপর প্রাথমিক হামলায় তারা কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। তবে তারা এটাও স্বীকার করেছে, যেসব দেশ শুরুতে হামলায় অংশ নেয়নি, সেখানে ইরান হামলা চালানোয় বাধ্য হয়েই যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষামূলক তৎপরতা বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উত্তপ্ত খবর ছড়িয়ে পড়েছে। নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারে শুরুতেই অনুমতি না দেওয়ায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে রীতিমতো তুলাধোনা করেছেন ট্রাম্প। যুক্তরাজ্য সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, নিজের মন্ত্রিসভার ভেতর থেকেই প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিলেন স্টারমার, যার ফলে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অবস্থান যখন কেবল নিজেদের রক্ষা আর সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হলো, তখনই পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে।
সরাসরি হামলায় না জড়িয়ে কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকার এই কৌশল স্রেফ কোনো আইনি মারপ্যাঁচের কারণে নেওয়া হয়নি। মূলত মিত্রদেশগুলোর সরকারের জন্য এটি হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রেখে যুদ্ধের দায় এড়ানোর একটি আধুনিক উপায়।
মিত্রদেশগুলো এমন কোনো যুদ্ধের দায় নিতে চাইছে না, যাকে তাদের দেশের মানুষ ‘গায়ে পড়ে ঝগড়া’ বলে মনে করে। এসব দেশ নিজেদের যত বেশি গুটিয়ে নেবে, এই লড়াইকে ‘পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ যুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করা ততই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে পরিস্থিতি আরও বেশি নাজুক। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্ররা তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তার ওপর ভর করে। এমনকি তাদের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কৌশলও গড়ে উঠেছে নিরাপদ অবকাঠামো আর নির্ভরযোগ্য রপ্তানির ব্র্যান্ডিংকে পুঁজি করে। একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এই দুটি জায়গাতেই বড় ধরনের আঘাত হানবে।
গণমাধ্যমের তথ্য ও জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বাণিজ্যিক সময়সূচির চেয়ে হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকি এখন বড় মাথাব্যাথার কারণ। ফলে বিপুলসংখ্যক জাহাজ হয় নোঙর করে আছে, নয়তো গতিপথ বদলে ফেলেছে। অথচ এই প্রণালিই হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির মূল স্পন্দন। হরমুজ যদি মাঝেমধ্যেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তবে বিনিয়োগ হোঁচট খাবে, বিমার খরচ আকাশ ছোঁবে, সরবরাহ চুক্তিগুলো বিঘ্নিত হবে এবং বিশ্ববাণিজ্যের নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি একটি রূপকথার গল্পে পরিণত হবে।
এর নেতিবাচক প্রভাব কেবল স্থানীয় অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বড় দেশগুলোর ওপরও পড়বে; এর মধ্যে চীন অন্যতম। সেই অর্থে, এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ পটভূমিতে জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। কারণ, এ হামলাগুলোই ঠিক করে দিচ্ছে—কারা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত কাদের এই যুদ্ধে নামতে বাধ্য করা হতে পারে।
সৌদি আরবের রাস তানুরা স্থাপনা এবং কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে হামলা ও বিশৃঙ্খলার খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত কাতার এনার্জির বিবৃতি অনুযায়ী, সামরিক হামলার মুখে কাতার এলএনজি উৎপাদন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এখন আসল প্রশ্ন শুধু এটা নয়, এসব জায়গায় হামলা চালানোর ক্ষমতা কার আছে। বরং প্রশ্ন হলো ‘ইরান এসব জায়গায় হামলা চালাতে চায়’—এ কথা রটিয়ে কার লাভ হচ্ছে? ইরান যদি সত্যিই চায় উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধে না জড়াক, তবে তাদের অর্থনীতির ওপর আঘাত করা হবে চরম বোকামি। এটা হবে অনেকটা সাময়িক বাহবা পাওয়ার জন্য যুদ্ধের মূল লক্ষ্যকেই হারিয়ে ফেলার মতো ঘটনা।
ঠিক এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে এখন অন্য একটি আলোচনা ডালপালা মেলছে। অনেকের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে আসলে পরিকল্পিত উসকানি বা নাশকতা হতে পারে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের ওপর দোষ চাপানো। এতে করে উপসাগরীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ অবস্থান ছেড়ে যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে।
ইরানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো রাস তানুরার ঘটনাকে সাজানো নাটক বলে সরাসরি ইসরায়েলকে দায়ী করছে। অন্যদিকে অনেক গণমাধ্যম এ হামলায় ইরানের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির ওপর জোর দিচ্ছে।
আসলে এসবের কোনো শক্ত প্রমাণ এখনো নেই। একজন সচেতন বিশ্লেষক হিসেবে এসব দাবি খুব সাবধানে যাচাই করা উচিত। তবে এ পরিস্থিতি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—কোন হামলার ‘দায়’ কার ওপর গিয়ে পড়বে, সেটিও এখন এক বড় যুদ্ধাস্ত্র। কখনো কখনো এই দায় চাপানোর লড়াই খোদ হামলার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই ধোঁয়াশাকে আরও ঘনীভূত করছে সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু খবর। শোনা যাচ্ছে, সৌদি আরব ও কাতারের নিরাপত্তা বাহিনী এমন কিছু লোককে ধরেছে, যাদের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের যোগাযোগ আছে। বলা হচ্ছে, তারা নাশকতার ছক কষছিল। তবে এসব খবরের কোনো পাকাপোক্ত প্রমাণ নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো সরকারি তথ্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত মতামত বা আলোচনার ওপর ভিত্তি করে ছড়াচ্ছে। এমনকি একটি বড় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কাতার সরকার উল্টো এ দাবি অস্বীকার করেছে।
একই সময়ে কাতার আবার এমন কিছু মানুষকে ধরার ঘোষণা দিয়েছে, যাদের নিজেদের ইরানি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) লোক বলে দাবি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে কাতারের গুরুত্বপূর্ণ ও সামরিক জায়গায় নজরদারি এবং নাশকতার ছক কষার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব পাল্টাপাল্টি গ্রেপ্তারের খবর পুরো এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আসল কথা হলো, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবি বা ঘটনার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ভীষণ আতঙ্কে আছে। তারা ভয় পাচ্ছে, তারা হয়তো অন্য কারও সাজানো খেলার পুতুল হতে যাচ্ছে। এই খেলার পরিচালক তেহরান হতে পারে, হতে পারে ইসরায়েল কিংবা অন্য কোনো শক্তি, যারা সামনে না এসে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়তেই বেশি পছন্দ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তরের পরিস্থিতি সংঘাতকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ন্যাটোর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটি ধ্বংস করে দিয়েছে বলে তুর্কি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা অস্বীকার করেছে। তুরস্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের শ্রদ্ধার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আবার আজারবাইজানের নাখচিভান এলাকায় একটি স্কুল ও বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলা বা ড্রোন পড়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বাকু এই হামলার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করলেও তেহরান তা অস্বীকার করে বলেছে, প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তু নয়।
এসব ঘটনা বিপজ্জনক এক ‘যুক্তির ফাঁদ’ তৈরি করছে। বাহ্যিকভাবে মনে হবে, এসব হামলার দায় ইরানেরই। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানই প্রধান সন্দেহভাজন। কিন্তু কৌশলগত স্বার্থের কথা ভাবলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র চাপের মুখে থাকা ইরানের জন্য তুরস্ক বা আজারবাইজানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আঙ্কারা বা বাকু হয়তো হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাবে। কিন্তু নিন্দা জানানো আর সরাসরি যুদ্ধে নামা এক বিষয় নয়। এখন কারও লক্ষ্য যদি হয় সেই নিন্দাকে যুদ্ধে রূপান্তর করা, তবে ইরানের নামে চালানো এই অস্পষ্ট হামলাগুলো রাজনৈতিক উসকানি হিসেবে চমৎকার কাজ করতে পারে।
ঠিক এ কারণেই যুদ্ধের সঙ্গীর সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন আর ইসরায়েলের উদ্দেশ্য যতটা যৌক্তিক মনে হচ্ছে, নতুন করে ইরানের আঞ্চলিক শত্রু বানানোর পরিকল্পনাটা ততটাই অসংলগ্ন মনে হচ্ছে। পশ্চিমা শিবিরে যদি নতুন কোনো অংশীদার যোগ দেয়, তবে ইরানের ওপর চাপ বাড়বে। সামরিক অভিযানের পথগুলো আরও প্রশস্ত হবে। পুরো যুদ্ধের চিত্রই পাল্টে যাবে। তখন একে আর ‘একতরফা আগ্রাসন’ না বলে ‘আঞ্চলিক প্রতিশোধ’ বা ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে।
ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর আরেকটি মানে হলো, খরচের বোঝা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধাক্কা সামলানোর সামর্থ্য রাখলেও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ভঙ্গুর অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত অন্যদের পাশে না পেলে দেশে-বিদেশে তাদের জন্য পরিস্থিতি খুব কঠিন হয়ে পড়বে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি এখন বড় প্রশ্নের মুখে। সেখানকার দেশগুলো এখন ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি শুধু তাদের নিজেদের আর ইসরায়েলের স্বার্থেই কাজে লাগে; অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বর্তমানে পণ্যবাহী জাহাজ জট আর জ্বালানি খাতের নাজুক দশার কারণে এ ধারণা উড়িয়ে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, মানুষ এটিকে তাত্ত্বিকভাবে নয়; বরং বাস্তব জীবনে চরম ভোগান্তি হিসেবেই দেখছে।
আন্তর্জাতিকভাবেও ইউরোপীয় মিত্রদের সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি এবং এর জবাবে ওয়াশিংটনের হুমকি পশ্চিমা ঐক্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অথচ এ ঐক্যকেই তারা যুদ্ধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানাতে চেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রেসিডেন্টের যুদ্ধকালের ক্ষমতা সীমিত করার জন্য নানা তৎপরতা শুরু হয়েছে। সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও গণমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, বিশেষ করে যেভাবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আর গোলাবারুদ শেষ হচ্ছে, তা সামাল দেওয়া এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। সর্বোপরি এ যুদ্ধ ট্রাম্পের ক্ষমতার ভিত দুর্বল করে দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যেও সরকারি বিবৃতিতে এখন যুদ্ধের চেয়ে নিজেদের নাগরিক আর অংশীদারদের রক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি পরিষ্কার করে দেয়, যখনই কোনো সংঘাত অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়তে থাকে, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ সামলানো কতটা কঠিন হয়ে পড়ে।
ওয়াশিংটন আর ইসরায়েল যদি তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তারা যুদ্ধের পরিধি বাড়িয়ে বা নতুন নতুন দেশকে টেনে এনে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাইবে। এ প্রলোভনই পুরো অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। পরিস্থিতি শান্ত করতে হলে ধৈর্যশীল কূটনীতি আর অপ্রিয় কিছু আপস প্রয়োজন। আঞ্চলিক দেশগুলোকে এমন সব উসকানিতে পা দেওয়া বন্ধ করতে হবে, যার পেছনের কারিগর কারা, তা অনিশ্চিত।
পশ্চিমা দেশগুলোকে হুমকি দিয়ে মিত্রদের যুদ্ধে টানার নীতি ছাড়তে হবে। আর তেহরানকে তাদের পাল্টা জবাবের ক্ষেত্রে এতটাই সংযত হতে হবে, যাতে তারা ভুলবশত এমন কোনো জোট তৈরি না করে ফেলে, যা তাদের শত্রুরা মনে মনে চাইছে।
লেখক: মুরাদ সাদিগজাদে, মস্কোর এইচএসই ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং লেকচারার এবং মিডল ইস্ট স্টাডিজ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট।