ইরানে ২ যুদ্ধবিমান হারিয়ে আরও চাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের আকাশে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর চলমান যুদ্ধে বড় ধাক্কা খেয়েছে ওয়াশিংটন। হামলায় শুধু এফ-১৫ই নয়, এ-১০ মডেলের আরও একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। যুদ্ধবিমান দুটির একজন পাইলটের খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ নিয়ে আরও চাপের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলার’ যে নীতির ওপর ভর করে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছেন, সে অনুযায়ী বিদেশে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর কথা ছিল না তাঁর। ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহ পেরোলেও কোনো লক্ষ্যও অর্জন করতে পারেননি তিনি। যুদ্ধের জেরে উল্টো যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে।
এ পটভূমিতে গত সপ্তাহে রয়টার্স-ইপসসের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চান। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত ও পাইলট নিখোঁজের ঘটনায় মার্কিন জনরায় যে আরও বেশি যুদ্ধের বিপক্ষে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। রয়টার্স-ইপসসের জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে বলে মনে করেন ৮৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের আকাশে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন, তা-ও যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ভুল প্রমাণিত হলো। এরপরও বিমান বিধ্বস্ত নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। এনবিসি নিউজকে শুধু বলেছেন, এ ঘটনায় আলোচনায় প্রভাব পড়বে না। এরপর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, আলোচনা হবে শুধু দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে।
গতকাল শনিবার ছিল যুদ্ধের ৩৬তম দিন। এদিনও ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতারাও বেঁকে বসতে শুরু করেছেন। যেমন ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা জন কার্টিস গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, কংগ্রেস যদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করে, তাহলে যুদ্ধে আরও তহবিল প্রদানে সমর্থন দেবেন না তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা মার্কিন নাগরিকদের কাছে ব্যাখ্যা করাটা হোয়াইট হাউসের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের গবেষক ফিলিস বেনিস। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে ট্রাম্পের সমর্থকদের ওপর, যাঁরা এত দিন যুদ্ধকে সমর্থন করছিলেন।
এর আগে সর্বশেষ ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় দুটি ও ২০১১ সালে লিবিয়ায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল।
চলছে পাইলটের খোঁজ
যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয় শুক্রবার, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। যুদ্ধবিমানটিতে দুজন পাইলট ছিলেন। ঘটনার পরপরই তাঁদের উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এ উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি হেলিকপ্টার হামলার মুখে পড়ে। সেটি ইরানের আকাশসীমার বাইরে যেতে সক্ষম হয়। তবে উদ্ধারে যাওয়া একটি এ-১০ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে ইরান।
যুদ্ধবিমান দুটি ভূপাতিত বা পাইলটদের উদ্ধারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কিছু জানায়নি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। তবে সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলেছে, এফ-১৫ই-এর একজন ও এ-১০-এর একজন পাইলটকে উদ্ধার করেছে মার্কিন বাহিনী। এফ-১৫ই-এর একজন পাইলট নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন সেনারা।
যুদ্ধবিমানগুলো নিজেদের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। নিখোঁজ পাইলটকে খুঁজছে ইরানের সামরিক বাহিনীও। ইরানের যে প্রদেশে (কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ) এফ-১৫ই ভূপাতিত হয়েছে, সেখানে পাইলটকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পাইলটের কোনো ক্ষতি না করতে সাধারণ মানুষকে নির্দেশ দিয়েছে ইরানি বাহিনী।
ওই পাইলটকে উদ্ধার করা খুবই কঠিন বলে মনে করেন মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হারলান উলম্যান। তিনি বলেন, তাঁকে খুঁজে বের করতে মার্কিন হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজগুলোকে খুব নিচ দিয়ে উড়ে যেতে হবে। ফলে সেগুলো হামলার মুখে পড়তে পারে। আর নিখোঁজ পাইলট কেমন আছেন, তা-ও জানা যায়নি। সময় শেষ হওয়ার আগেই তাঁর কাছে সহায়তা পৌঁছাতে হবে।
‘শত্রুদের’ ১৬০টির বেশি ড্রোন ধ্বংস
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক বিমান ধ্বংস হয়েছে। সিএনএনকে দেওয়া সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা সাত। এর মধ্যে গত মাসে কুয়েতে তিনটি যুদ্ধবিমান ভুলক্রমে নিজেদের গুলিতে ভূপাতিত হয়। এ ছাড়া ইরাকে একটি তেলবাহী উড়োজাহাজ ও সৌদি আরবে একটি রাডার উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়। বাকি দুটি শুক্রবার ভূপাতিত হওয়া যুদ্ধবিমান।
এর বাইরে সপ্তাহ দুয়েক আগে ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে হামলার দাবি করেছিল বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গতকালও যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ বা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কথা বলা হয়েছে ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিমের খবরে। এ ছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ‘শত্রুপক্ষের’ ১৬০টির বেশি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
এসব যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ধ্বংস করা ইরানের জন্য বড় সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এর আগে সর্বশেষ ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় দুটি ও ২০১১ সালে লিবিয়ায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। তবে ইরান যদি নিখোঁজ হওয়া পাইলটকে আটক করতে পারে, তা হবে দেশটির জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘বড় পুরস্কার’—এমনটাই মনে করেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র্যাপ। তিনি বিবিসিকে বলেন, ইরান পাইলটকে আটক করতে পারলে এটি যুদ্ধ শেষ করতে দর-কষাকষির বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক হানান বালখি বলেন, যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
যুদ্ধে নিহত ৩,৩০০ জন
যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর গতকাল ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর মধ্যে বড় হামলা হয়েছে ইরানের বুশেহর পরমাণু স্থাপনায়। দেশটির খুজেস্তান প্রদেশে একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ছাড়া তেহরানে সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে ইসরায়েল। ইরানের উরমিয়া, খোররামবাদ, কারাজ ও কোম অঞ্চলেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে টায়ার এলাকায় একটি বন্দরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পূর্বাঞ্চলে বাকা উপত্যকার ইয়োহমার ও সাহমার শহরেও হামলা হয়েছে। এতে একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটিতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় নিজেদের এক স্থলসেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
গতকাল ইসরায়েলের ভূখণ্ডেও পাল্টা হামলা হয়েছে। তেল আবিবে দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শহরটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর সদর দপ্তরে গুচ্ছ বোমার দুটি অংশ পড়ে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইসরায়েল। ইরানের হামলায় আগুন ধরে যায় রশ হাইন ও পেতাহ তিকভা শহরের দুটি ভবনে। এদিন ইরাক, আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব ও সিরিয়ায়ও হামলা হয়েছে।
এ যুদ্ধের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক হানান বালখি। তিনি বলেন, যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। এ ছাড়া হামলা থেকে প্রাণে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন ৪৩ লাখের বেশি মানুষ। এ সময় স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা হয়েছে ১১৬ বার।
মনে পড়ে একটি চুক্তি করতে বা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে আমি ইরানকে ১০ দিন সময় দিয়েছিলাম? সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর ৪৮ ঘণ্টা। এরপর তাদের (ইরান) ওপর নরক নেমে আসবে।ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ খুলতে ‘বাকি ৪৮ ঘণ্টা’
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি শুক্রবার প্রথম কোনো পশ্চিমা জাহাজ পাড়ি দিয়েছে। সেটি ছিল ফ্রান্সের। এর আগে বন্ধুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশকে জ্বালানি তেল পরিবহনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল তেহরান। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, জাপান, থাইল্যান্ড, গ্রিস, মালয়েশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ইরাক ও ভারত।
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে সম্প্রতি ইরানকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেদিকে ইঙ্গিত করে গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘মনে পড়ে একটি চুক্তি করতে বা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে আমি ইরানকে ১০ দিন সময় দিয়েছিলাম? সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর ৪৮ ঘণ্টা। এরপর তাদের (ইরান) ওপর নরক নেমে আসবে।’
যদিও এ হুমকির আগে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি বাব আল-মান্দেব নিয়ে এক্সে একটি পোস্ট দেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। সেখানে প্রণালিটি বন্ধ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। গালিবাফ প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘বিশ্বের তেল, এলএনজি, গম, চাল ও সারের কত অংশ বাব আল-মান্দেব দিয়ে যায়? কোন কোন দেশ ও কোম্পানি এই প্রণালি ব্যবহার করে?’
বাব আল-মান্দেব ইয়েমেন সীমান্তে অবস্থিত। এটি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১৪ শতাংশ বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়। বিশ্বের মোট তেলের ৫ শতাংশও সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধের মধ্যে সম্প্রতি এই প্রণালিটি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। এখন হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দেওয়া হলে, যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়বে বৈ কমবে না।