ইরানের নিচু উচ্চতার ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী
ইরানের আকাশসীমায় ওয়াশিংটন কেন একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না, তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’ আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল প্যানেল আলোচনায় তাঁরা বলেন, নিম্ন উচ্চতার হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের ঘাটতি ছিল। আর ইরান ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে সফলভাবে তাদের প্রতিরক্ষা সাজিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের ‘রিইম্যাজিনিং ইউএস গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘এই যুদ্ধের একটি অদ্ভুত বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই জায়গাগুলোতেই ভালো করছে, যেখানে তাদের ভালো করার কথা ছিল। অর্থাৎ উচ্চ আকাশসীমায় (হায়ার অল্টিটিউড) ইরানের সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথাগত লড়াইয়ে তারা সফল হচ্ছে।’
নিচু আকাশসীমার চ্যালেঞ্জের বিষয়ে কেলি গ্রিকো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে, যেখানে তারা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করেনি এবং বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। সেটি হচ্ছে—আকাশ নিয়ন্ত্রণে নিম্ন উচ্চতার হুমকি। ইরান অত্যন্ত ভ্রাম্যমাণ বা হাইলি মোবাইল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। এর মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ আধিপত্য রুখে দিচ্ছে, যেখানে আধিপত্য বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য খুবই জরুরি ছিল।’
উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু নিচু দিয়ে ওড়া ইরানি ড্রোন শনাক্ত করতে হলে তাদের ভিন্ন ধরনের সেন্সর ও রাডার প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের এই আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পরেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরান তাদের সব সক্ষমতা হারিয়েছে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনারা কি এমন একটি জিনিসের নাম বলতে পারবেন যা ধ্বংস হয়নি? অথবা তারা এখন কী করছে, তা কি বলতে পারবেন?’ এ সময় তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা এখন তেহরানের আকাশে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
ধ্বংসাত্মক বনাম বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যুদ্ধ
কেলি গ্রিকো বলেন, ইরান এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করছে না। কারণ, তেহরান ভালো করেই জানে যে আকাশপথে আধিপত্য (এয়ার সুপিরিওরিটি) অর্জন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘আকাশপথের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ’ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তাকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
‘আপনারা কি এমন একটি জিনিসের নাম বলতে পারবেন যা ধ্বংস হয়নি? অথবা তারা এখন কী করছে, তা কি বলতে পারবেন?’মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
গ্রিকো ব্যাখ্যা করেন, ‘ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যা করছে, সেটাকে আমি ‘ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ’ বলব। তারা মূলত লঞ্চার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত ধ্বংস করার ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান একেবারেই ভিন্ন পথ নিয়েছে। তারা চালাচ্ছে একধরনের ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যুদ্ধ’ বা ওয়ার অব ডিসরাপশন। তারা নিচু আকাশসীমা ব্যবহার করে, বিশেষ করে ড্রোন দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষতি ও ভোগান্তি তৈরি করতে পারছে।’
ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনগুলো নির্মাণে খরচ খুব কম হলেও এগুলো মোকাবিলা করতে লাখ লাখ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। গ্রিকো বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু নিচু দিয়ে ওড়া ইরানি ড্রোন শনাক্ত করতে হলে তাদের ভিন্ন ধরনের সেন্সর ও রাডার প্রয়োজন।
গ্রিকো আরও যোগ করেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো এই শাহেদ ড্রোনগুলো আটকাতে যুদ্ধবিমান ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের (স্যাম) ওপর অনেক বেশি নির্ভর করছে।’
এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ও রাশিয়ার এস-৩০০-এর মতো ব্যবস্থা রয়েছে। যেসব দেশ প্যাট্রিয়ট ব্যবহার করে, তাদের রাশিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের অনুমতি দেয় না যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধের দশম দিনে ট্রাম্প প্রশাসনকে জানানো হয়েছে যে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিধ্বংসী ‘ইন্টারসেপ্টর’ (প্রতিরোধক) এতটাই কমে এসেছে যে এখন তারা বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।
যুদ্ধের দশম দিনে ট্রাম্প প্রশাসনকে জানানো হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিধ্বংসী ‘ইন্টারসেপ্টর’ (প্রতিরোধক) এতটাই কমে এসেছে যে এখন তারা বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। সাধারণত একটি ধেয়ে আসা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে দুটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের প্রতিরক্ষা ও কৌশল প্রোগ্রামের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলন আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অবশ্যই জরুরি। ৩০ বছর আগে এটি পরিষ্কার ছিল না, কিন্তু এখন হয়েছে।’
ও’হ্যানলন আরও বলেন, ‘তবে সবকিছুর বিরুদ্ধে এটি কার্যকর নয়। ইরান একটি অস্ত্রের পেছনে যা খরচ করছে, আমরা তার ১০ গুণ খরচ করতে পারি। কিন্তু ১০০ বা ১০০০ গুণ খরচ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর তাই ড্রোনের বিরুদ্ধে উচ্চমূল্যের বা দামি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা আমাদের পোষাবে না।’
সমাধানের পথ কী হতে পারে
গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও জর্ডানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি কংগ্রেসকে জানিয়েছে। মূলত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ইরানের পাল্টা বিমান হামলার মুখে এই মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি অবস্থা জারি করে এসব অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা শিথিল করেছেন।
‘প্রতিদিন কত বড় হামলা হলো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইরানের আসল শক্তি হলো দিনের পর দিন হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও হুমকি হিসেবে টিকে থেকে খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।’স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যদি প্যাট্রিয়ট, থাড এবং সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এভাবে কমতে থাকে, তবে তা উদ্বেগের বিষয়। আমাদের এসব সরঞ্জামের আরও বড় মজুত থাকা প্রয়োজন এবং শিল্পভিত্তিও আরও শক্তিশালী করা দরকার।’
বিশেষ করে ড্রোন মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানের জন্য লেজার অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন ও’হ্যানলন। ওই অঞ্চলের আবহাওয়া এই প্রযুক্তির জন্য সহায়ক। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘লেজারের মূল সমস্যা হলো এটি মেঘের ভেতর দিয়ে ভালো কাজ করে না। জলীয় বাষ্প বা পানি যেকোনো রশ্মির গতিরোধ করে দেয়।’
ও’হ্যানলন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বর্তমানে যে গতিতে এসব অস্ত্র কারখানায় তৈরি হচ্ছে, ব্যবহারের গতি তার চেয়ে অনেক বেশি। অবশ্য উত্তর কোরিয়া বা চীনের মতো বড় শক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা দেখছেন না ও’হ্যানলন।
কেলি গ্রিকো মনে করেন, ইরান এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশল নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরান বুঝতে পেরেছে এটি দীর্ঘ যুদ্ধ হতে পারে। যদি তারা এই লড়াইকে ব্যয়বহুল ও যন্ত্রণাদায়ক করতে চায়, তবে প্রতিদিন কত বড় হামলা হলো, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের আসল শক্তি হলো—দিনের পর দিন হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও হুমকি হিসেবে টিকে থেকে খরচ বাড়িয়ে দেওয়া।’
তবে মঙ্গলবার বিকেলে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের এক ভিন্ন মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ‘ইরানের একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ছিল। কিন্তু ইতিহাসের আর কোনো আধুনিক সামরিক বাহিনীকে প্রথম দিন থেকেই এমন বিধ্বংসী শক্তির মাধ্যমে এত দ্রুত পরাজিত হতে দেখা যায়নি।’
হেগসেথ আরও দাবি করেন, ‘আমরা ও ইসরায়েল যে সামরিক অভিযান চালিয়েছি, তা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।’