যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনায় বড় অগ্রগতির খোঁজে পাকিস্তান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গত ১১–১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে বসলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভি; যদিও ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মূল বিরোধগুলো এখনো কাটেনি।

ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাত্র দুই দিন পর আজ শুক্রবার তেহরানে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ ও আইএসএনএ জানিয়েছে। আইএসএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের অবসান ও দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যেই পাকিস্তান এই আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় কিছু ‘ভালো লক্ষণ’ দেখা গেছে। তবে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল আরোপের চেষ্টা করলে কোনো সমাধান সম্ভব নয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। রুবিও সতর্ক করে বলেন, ‘আমি এখনই বেশি আশাবাদী হতে চাই না। আগামী কয়েক দিনে কী ঘটে, দেখা যাক।’

ইরানের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যকার বড় মতবিরোধগুলো কিছুটা কমে এসেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো প্রধান অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। তেলের দাম বাড়ায় বিশ্বজুড়ে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো।

শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আজ শুক্রবার মার্কিন ডলারের দাম গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, অন্যদিকে তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী।

আর্থিক সেবাদাতা যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আইজির বাজার বিশ্লেষক টনি সিকামোর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে বলেন, ‘যুদ্ধের দ্বাদশ সপ্তাহ অতিক্রম করতে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতিরও ছয় সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমার এখনো মনে হচ্ছে না যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত উদ্ধার করবে।

আরও পড়ুন

ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান এই ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়। যদিও তেহরানের দাবি, এটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এগুলো উদ্ধার করব। তবে এগুলোর আমাদের প্রয়োজন নেই। পাওয়ার পর আমরা সম্ভবত তা ধ্বংস করে দেব। কিন্তু ওদের কাছে এগুলো রাখতে দেওয়া হবে না।’

তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের আগেই ইরানের দুটি ঊর্ধ্বতন সূত্র রয়টার্সকে জানায়, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি এক নির্দেশনায় জানিয়েছেন যে এই ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে যাবে না।

হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলো থেকে টোল আদায়ের ইরানি পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জলপথটি উন্মুক্ত দেখতে চাই। আমরা কোনো টোল চাই না। এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ।’

ইরান সফরে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভি
ছবি: তাসনিম নিউজের সৌজন্যে

আগামী নভেম্বরের অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে আছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মার্কিন নাগরিকেরা ক্ষুব্ধ। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে ঠেকেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তেহরানের বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রস্তাবে মূলত আগের শর্তগুলোরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, যা ট্রাম্প আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।

আরও পড়ুন

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, এই সংঘাতের ফলে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি গতকাল সতর্ক করেছে, আগামী জুলাই ও আগস্ট মাসে গ্রীষ্মকালীন জ্বালানির সর্বোচ্চ চাহিদা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহের ঘাটতির কারণে বাজার চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যেতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

ইরান জানিয়েছে, তাদের শর্ত মেনে চলা বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর জন্য তারা এই প্রণালি খুলে দিতে চায়। এ ক্ষেত্রে হয়তো কিছু ফি দেওয়া লাগতে পারে।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ধরনের ফি আদায় সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বিশ্বের জন্য একটি হুমকি বলে আখ্যা দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তাঁদের যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা, পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং ইরানি শাসকদের পতন ঘটানো। কিন্তু মারাত্মক বিমান হামলার পরও ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রাখতে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রক্সি মিলিশিয়া দিয়ে হামলার সক্ষমতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

আরও পড়ুন