হুতিদের হামলার জবাব দেওয়ার পথ খুঁজছে সৌদি আরব, কিন্তু কৌশল কী হবে

সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ২০২৬ সালের ২১ মে মক্কায় একটি সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিচ্ছেনছবি: এএফপি

এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে নিজেদের ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার শিকার হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাওয়ায় রিয়াদ কীভাবে এর জবাব দেবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

গত সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিতে সৌদি আরব বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল; যদিও এখন পর্যন্ত হুতি বিদ্রোহীরা তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

বরং হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের কৌশল অনুসরণ করে হুতিরা সৌদি আরবে বড় ধরনের পাল্টা হামলার হুমকি দিচ্ছে। তারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে, এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে।

হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ দীর্ঘদিনের। রিয়াদ এক দশকের বেশি সময় ধরে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, এর জেরে ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।

হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ দীর্ঘদিনের। রিয়াদ এক দশকের বেশি সময় ধরে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, এর জেরে ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।

তবে সম্প্রতি সৌদি আরবে আবার হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে শুধু আগের শত্রুতার জেরে নয়, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সামরিক অভিযানের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে ১১ বছর ধরে সৌদি আরব হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এবার হুতিদের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তাঁর ভাই, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমানের সামনে খুব বেশি বিকল্প পথ খোলা নেই।

সীমান্তের ওপারে হুতিরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের বড় কয়েকটি শহরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে এবং জনবহুল তাইজের মতো আরও কিছু শহর দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।

একবারেই এই হুমকি চিরতরে মোকাবিলা করতে হবে। রণক্ষেত্রে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর কতটা দক্ষতা দেখাতে পারে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আর সৌদি আরব নিজেদের বিমান হামলার সক্ষমতা দিয়ে তাদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে।
আলী শিহাবি, লেখক ও সৌদি রাজনীতির বিশ্লেষক

লেখক ও সৌদি রাজনীতির বিশ্লেষক আলী শিহাবি সিএনএনকে বলেন, ‘একবারেই এই হুমকি চিরতরে মোকাবিলা করতে হবে। রণক্ষেত্রে সৌদি–সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর কতটা দক্ষতা দেখাতে পারে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আর সৌদি আরব নিজেদের বিমান হামলার সক্ষমতা দিয়ে তাদের ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে।’

এখন পর্যন্ত সৌদি আরব মূলত ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর পক্ষে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রেখেছে। দেশটি এখন পর্যন্ত স্থলভাগে নিজেদের বড়সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু শনিবার রিয়াদে হামলার পর সৌদি আরব এই সংযম ধরে রাখবে কি না, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সৌদি আরব এখন যদি ইয়েমেনে সেনা পাঠায়, তবে দেশটি দুর্গম ভূখণ্ডে একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। এতে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব দেশ ও বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবের যে ভাবমূর্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে গড়ে তুলছেন, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সৌদি আরব এখন ইয়েমেনে সেনা পাঠালে দেশটি দুর্গম ভূখণ্ডে একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। এতে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব দেশ ও বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবের যে ভাবমূর্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে গড়ে তুলছেন, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার চিত্র। ১০ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সৌদি তথ্য মন্ত্রণালয়/রয়টার্স

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় শক্তিশালী হুতিরা

মাত্র দুই দশক আগেও হুতিরা মূলত ছোট একটি ধর্মভিত্তিক আন্দোলন ছিল। এরপর ইরানের সহায়তায় তারা একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তেল আবিবের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যেও হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে।

এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে থাকা একটি গোষ্ঠী তাদের ‘ক্লড’ এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের ‘গাইডেন্স সফটওয়্যার’ তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে। উড্ডয়নের সময় এসব ব্যবস্থা অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে কাজ করে।

হুতিদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করা দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘তারা (হুতি) তাদের যুদ্ধের কৌশল উন্নত করেছে। হামলার ক্ষেত্রে তারা আরও দক্ষ হয়ে উঠেছে, দৃঢ়ভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।’

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অভিযোগ, হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে আরও কার্যকর অস্ত্রে রূপান্তর করেছে।

ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি বলেন, নতুন এসব ক্ষেপণাস্ত্র আরও দ্রুতগতিতে উড়ে যায় এবং তাপ অনুসরণকারী একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করে যেকোনো তাপের উৎসকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

তবে গত শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলেও জানান আল–নাজিলি।

আরও উন্নত অস্ত্র তৈরিতে হুতিরা এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের দিকেও এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অংশীদারদের কাছ থেকে সমর্থন চেয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্রদেশগুলোও সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে থাকা একটি গোষ্ঠী তাদের ‘ক্লড’ এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের গাইডেন্স সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে। উড্ডয়নের সময় এসব ব্যবস্থা অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে কাজ করে।

প্রতিবেদনে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে তারা হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনে অবস্থান করায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা

হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব বিশ্বের বিভিন্ন মিত্রদেশের কাছ থেকে সমর্থন চেয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্রদেশগুলোও সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।

খবরে বলা হয়েছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সহায়তার জন্য সিরিয়ার কাছেও গেছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধের পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করতে সফল হওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তবে রিয়াদের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখনো হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালাতে রাজি হয়নি। এর পরিবর্তে দেশটি নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের অধীন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের জন্য ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে।

আরও পড়ুন

গত বছর ওয়াশিংটন ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্য চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মানদেব প্রণালি মার্কিন জাহাজ চলাচলের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়।

সে সময় সূত্রগুলো সিএনএনকে বলেছিল, গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার কথা বলে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর জন্য তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এতে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি।

শিহাবি বলেন, ‘স্পষ্টতই, বিমান হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি (সংঘাতে) যুক্ত হলে তা সহায়ক হবে। কারণ, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আরও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো...এই প্রক্রিয়া থেকে এক ধাপ দূরে রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা সহায়ক হবে।’

আরও পড়ুন
ইয়েমেনের সানায় হুতি নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য। ৭ অক্টোবর, ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ দেশ। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে আধুনিক কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পরও দেশটি হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশাল মরুভূমিজুড়ে মূল্যবান সম্পদ পরিবহনের জন্য গড়ে তোলা দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো হুতিদের তৈরি তুলনামূলক কম খরচের একমুখী ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।

গতকাল রোববার সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও আছেন। এই হামলার ফলে ট্রাম্প আরও গভীরভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

আরও পড়ুন

হামলার পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘সৌদিরা ভালো যোদ্ধা। তবে আমি মনে করি, হামলাটি ভয়াবহ ছিল।’

হুতিদের ওপর হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা যোগ দিতে পারি।’

আরও পড়ুন