নৌ অবরোধ কী এবং হরমুজ প্রণালিতে এটি কীভাবে কাজ করবে

হরমুজ প্রণালির কাছে ট্যাংকার চলাচলের দৃশ্য। ওমানের মুসান্দাম সীমান্তের কাছাকাছি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্তর রাস আল-খাইমাহ থেকে ছবিটি তোলা, ১১ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানি বন্দরগুলোয় সব ধরনের সামুদ্রিক যাতায়াতের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। আজ সোমবার থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

তবে অন্য দেশ থেকে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে বলেও জানিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান কার্যত জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছে।

মার্কিন সেনাবাহিনী এমন এক সময় ইরানি বন্দরে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিল, যার এক দিন আগেই (গত শনিবার) দুপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন চালানোর মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়, যা পরবর্তী সময়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, ইরান ‘তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাদ দিতে অনিচ্ছুক’।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই এ ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবিদাওয়া ও বেআইনি শর্ত’কে দায়ী করেন।

ট্রাম্প নৌ-অবরোধ নিয়ে কী বলেছেন

গতকাল রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করা সব জাহাজকে অবরোধ দিতে শুরু করবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানকে কোনো না কোনোভাবে অর্থ পরিশোধ করা জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় চিহ্নিত করে আটকাতে আমি আমাদের নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। অবৈধ টোল পরিশোধ করা কেউই সমুদ্রে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে যেসব মাইন স্থাপন করেছে, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোও ধ্বংস করা শুরু করবে।

ওই পোস্টে ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘আমাদের ওপর বা শান্তিপূর্ণ জাহাজগুলোর ওপর কোনো ইরানি গুলি চালালে তাদের নরকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

ট্রাম্প বলেন, একসময় (হরমুজে) অবাধ চলাচল নিয়ে একটি চুক্তি হবে। তবে ইরান এটি হতে দেয়নি। কারণ, তারা শুধু বলেছে, কোথাও না কোথাও মাইন থাকতে পারে। কিন্তু তারা ছাড়া আর কেউই জানে না, কোথায় মাইন আছে।

পরের এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। কিন্তু তারা তা ইচ্ছাকৃতভাবে করেনি। তিনি আরও দাবি করেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তাদের আন্তর্জাতিক জলপথটি দ্রুত খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।

বাস্তবে এ অবরোধ কীভাবে কাজ করবে

মার্কিন নৌবাহিনীর ২০২২ সালের ‘কমান্ডারস হ্যান্ডবুক অন নেভাল অপারেশনস ল’ অনুযায়ী, অবরোধ হলো এমন এক সামরিক অভিযান, যার মাধ্যমে শত্রুরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন নির্দিষ্ট বন্দর, বিমানঘাঁটি বা উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশ করা বা বের হওয়া সব দেশের (শত্রু ও নিরপেক্ষ) জাহাজ বা বিমানকে বাধা দেওয়া হয়।

ট্রাম্প শুরুতে বলেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ হরমুজ প্রণালি অবরোধের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে পরে ফক্স নিউজকে তিনি বলেছিলেন, এটি করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে খুব দ্রুত কার্যকর হবে। তিনি এটিকে ‘হয় এসপার, নয় ওসপার’ ধরনের নীতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছে, আজ সকাল ১০টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে অবরোধ কার্যকর করা হবে। এটি ইরানের সব বন্দরে প্রবেশ করা ও সেখান থেকে বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে। এর মধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের ইরানি বন্দরও অন্তর্ভুক্ত।

তবে সেন্টকম আরও জানায়, ইরান-বহির্ভূত বন্দরের দিকে যাওয়া বা সেখান থেকে আসা জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়া হবে না। অবরোধ শুরুর আগে বাণিজ্যিক নাবিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হবে।

ট্রাম্প বলেন, অবরোধে অন্য দেশও যুক্ত থাকবে। তবে কোন কোন দেশ, তা তিনি বলেননি। বিবিসির জানামতে, যুক্তরাজ্য এতে অংশ নেবে না।

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মাইন অপসারণে ব্যবহৃত বিশেষ জাহাজ (মাইনসুইপার) পাঠাবে এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যও একই কাজ করবে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আগেই বলেছেন, ব্রিটিশ নৌবাহিনীর মাইন অপসারণব্যবস্থা ইতিমধ্যেই ওই অঞ্চলে রয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পক্ষে। কারণ, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, এই প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল আরোপ করা উচিত নয়।

ওই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘আমরা ফ্রান্সসহ অন্য অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি বিস্তৃত জোট গঠনে কাজ করছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন আইনবিশেষজ্ঞ বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের অবরোধ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। তাঁদের একজন বলেন, সামরিকভাবে কার্যকর করা এ অবরোধ চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিও লঙ্ঘন করবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র কেন হরমুজ প্রণালি অবরোধ করছে

হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে পুরো যুদ্ধে বড় কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। তারা এ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে পড়ে।

তেহরান কিছু জাহাজের কাছ থেকে প্রণালি পারাপারের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রণালি বন্ধ করে দিলে ইরান সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে এর ফলে তেল ও গ্যাসের মূল্য আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।

ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমরা ইরানকে এমনভাবে তেল বিক্রি করতে দেব না, যাতে তারা যাকে পছন্দ, তাকে সুবিধা দেয় আর যাকে অপছন্দ করে, তাকে না দেয়।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মূলত ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে দেশটিকে একটি চুক্তিতে রাজি হতে বাধ্য করতে চায়। সে জন্যই এ অবরোধের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক টার্নার সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে ইরানের ওপর চাপ তৈরির একটি উপায় হলো এ অবরোধ।

টার্নার বলেন, প্রেসিডেন্ট বলেছেন কারা এ প্রণালি পার হবে, তা শুধু ইরান ঠিক করে দেবে না। এ কথার মাধ্যমে তিনি মূলত সব মিত্র ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলোচনার টেবিলে ডাকছেন। এটির সমাধান হওয়া দরকার।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সিএনএনকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না, কীভাবে এ অবরোধ ইরানকে প্রণালি খুলতে বাধ্য করবে।’

আরও পড়ুন
ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত একটি জাহাজ। ১২ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

অবরোধের প্রভাব কী হতে পারে

শিপিং বিশেষজ্ঞ লার্স জেনসেন বিবিসিকে বলেন, ইরানের বন্দরগুলোয় ট্রাম্পের নৌ-অবরোধের হুমকির ফলে হরমুজ প্রণালিতে এখনো চলাচল করা খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ স্বল্প মেয়াদে প্রভাবিত হবে।

জেনসেনের ভাষায়, এটি যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তাহলে খুব সামান্যসংখ্যক জাহাজের চলাচল বন্ধ হবে। মোটাদাগে এটি খুব একটা পরিবর্তন আনবে না।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, যেসব জাহাজ ইরানকে অর্থ দিয়ে চলাচল করবে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর ওপর এর প্রভাবও সীমিত হবে। কারণ, এ ধরনের কোম্পানিগুলো আগেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।

জেনসেনের মতে, বেশির ভাগ শিপিং কোম্পানি এখনই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং দেখবে, কোনো অস্থায়ী শান্তিচুক্তি টিকে থাকে কি না। যদি থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে আবার চলাচল বৃদ্ধি পেতে পারে।

আরও পড়ুন

হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি কী

৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়। এতে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে।

তবে এরপরই ওই অঞ্চলের জাহাজগুলো বার্তা পায় যে অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হলে তাদের লক্ষ্যবস্তু করে ধ্বংস করা হতে পারে। ফলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রথম তিন দিনে খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের মেরিন ট্রাফিক ডেটা বিশ্লেষণ অনুযায়ী ১০ এপ্রিল প্রণালি দিয়ে মাত্র ১৯টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর মধ্যে চারটি ছিল তেল, গ্যাস বা রাসায়নিক বহনকারী ট্যাংকার। বাকিগুলো ছিল বিভিন্ন ধরনের বাল্ক ক্যারিয়ার ও কনটেইনার জাহাজ। অন্য কিছু জাহাজ তাদের অবস্থান প্রকাশ না করেই চলাচল করেছে।

অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩৮টি জাহাজ এ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।