সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস (ওএনএস) একটি পরিসংখ্যানের কথা প্রকাশ করে। পরিসংখ্যান বলছে, সপ্তাহে সপ্তাহে করোনার সংক্রমণ ৪৩ শতাংশের মতো বাড়ছে।

সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, গ্রিস, ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনার সংক্রমণ এখন ঊর্ধ্বমুখী। এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পর্তুগালে। প্রতি গ্রীষ্মেই অবকাশযাপনে অনেকের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্যস্থলগুলোর একটি হয়ে ওঠে দেশটি।

এ তথ্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বাথের গণিত বিভাগের সিনিয়র লেকচারার কিট ইয়েটস ইনডিপেনডেন্ট এসএজিই (ব্রিটিশ সরকারকে পরামর্শদানকারী বিজ্ঞানীদের একটি দল)–এর বৈঠকে বলেছেন, ওএনএসের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এটি স্পষ্ট, যুক্তরাজ্য করোনার পরবর্তী ঢেউয়ে প্রবেশ করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বয়স্ক লোকজন ও ৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে, যাঁদের এখনো নতুন করে টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়ার কথা বলা হয়নি।

করোনার নতুন ঢেউয়ের পেছনে কী

করোনার নতুন সংক্রমণ এবং হাসপাতালে রোগীর ভর্তি সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে করোনার অমিক্রন ধরনের নতুন দুই উপধরন বিএ.৪ এবং বিএ.৫ মূলত দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পর্তুগালে এখন বিএ.৫ উপধরনের দাপট বেশি দেখা যাচ্ছে। জার্মানি, যেখানে সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, সেখানেও এই উপধরন কাজ করছে।

মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রেও বর্তমানে করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে খুব সম্ভব বিএ.৪ ও বিএ.৫ উপধরনের প্রভাবই বেশি। নতুন সংক্রমণের ঘটনার ৫২ শতাংশের পেছনে রয়েছে এ দুই উপধরন। সামনের সপ্তাহগুলোতে এই সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। দুটি উপধরনই প্রথম শনাক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। বিএ.৪ শনাক্ত হয় গত জানুয়ারিতে এবং বিএ.৫ গত ফেব্রুয়ারিতে। এ পর্যন্ত দেশটিতে করোনার প্রভাবশালী ধরন হিসেবে কাজ করছে এই দুই উপধরন।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা সার্স কোভ-২ ভাইরাসের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স (জীবনরহস্য বা জিন নকশা উন্মোচন) নিয়ে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি কাজ করছে। এতে উপধরন দুটির উৎপত্তি দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়া অন্য কোনো দেশে হওয়াটাও সম্ভব। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো অমিক্রনের উপধরন দুটি শনাক্ত করেন। এ দুই উপধরনেরও ব্যাপক মিউটেশন (রূপান্তর) ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ভাইরাস যত ছড়ায়, তত বেশি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। এর মানে, ভাইরাসের আরও বেশি মিউটেশন ঘটবে। মিউটেশন তখনই মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে, যখন ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট রোগের তীব্রতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে মিউটেশন যখন টিকা নেওয়া বা এর আগে সংক্রমিত হওয়ার কারণে তৈরি হওয়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করে কিংবা পরীক্ষার মাধ্যমে করোনা শনাক্ত করার বিষয়টিকে কম কার্যকর করে তোলে। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিএ.৪ ও বিএ.৫ উপধরন অমিক্রনের অন্য উপধরনগুলোর তুলনায় দ্রুত বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এতে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায়, উপধরন দুটির এমনভাবে মিউটেশন ঘটছে, যাতে এগুলো বেশি সংক্রামক হয়ে উঠতে পারে অথবা টিকার মাধ্যমে বা এর আগে সংক্রমিত হওয়ার কারণে তৈরি হওয়া সুরক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলার সময় আসেনি।

করোনা মহামারি শুরুর পর থেকেই করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন ও উপধরন নিয়ে কাজ করছে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি)। করোনার বিএ.৪ ও বিএ.৫ উপধরনকে তারা ‘উদ্বেগজনক ধরন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

প্রভাব বিস্তারকারী এ দুই উপধরন নিয়ে প্রায়ই একসঙ্গে আলোচনা করা হয়। কারণ, এদের স্পাইক প্রোটিনের জিনগত মিউটেশন সুনির্দিষ্ট। যদিও মিউটেশনের ধরন একেক জায়গায় একেক রকমের। স্পাইক প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, এর মাধ্যমে ভাইরাস মানুষকে আক্রান্ত করে শরীরের কোষগুলোতে প্রবেশ করে। সেখানে ভাইরাসটি পরিবর্তিত হয়। এই প্রক্রিয়া সহজে ও দ্রুততার সঙ্গে ভাইরাসকে সংক্রমণযোগ্য করে তোলে। এখন পর্যন্ত করোনার যত টিকা আবিষ্কার হয়েছে, সব কটিতেই স্পাইক প্রোটিন টার্গেট করা হয়েছে।

default-image

করোনা মহামারি শুরুর পর থেকেই করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন ও উপধরন নিয়ে কাজ করছে ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিসি)। করোনার বিএ.৪ ও বিএ.৫ উপধরনকে তারা ‘উদ্বেগজনক ধরন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা আভাস দিয়েছে, ভাইরাসের সংক্রমণ সক্ষমতা, রোগের তীব্রতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর এ দুই উপধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ইউরোপে বর্তমান করোনা মহামারির ওপরও সম্ভবত প্রভাব রয়েছে এই দুই উপধরনেরই।

বিএ.৪ ও বিএ.৫ উভয় উপধরন এল৪৫২আর মিউটেশন বহন করছে। করোনার ডেলটা ধরনেও একই ধরনের মিউটেশন পাওয়া গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এ দুই উপধরন ভাইরাসকে আরও বেশি সংক্রামক করে তুলবে। উপধরন দুটির এফ৪৮৬ভি মিউটেশন নামে জেনেটিক পরিবর্তন ঘটছে। এগুলো আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আংশিক হলেও নষ্ট করে দিতে পারে। উপধরন দুটির জেনেটিক সিকোয়েন্সের মধ্যেও একটি পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, যা এস-জেন ড্রপআউট নামে পরিচিত। এর মানে হলো, কিছু পিসিআর টেস্টে ভাইরাসটি ধরা পড়বে না, যেসব পরীক্ষায় পজিটিভ রেজাল্ট আসত।

তবে আশার কথা, এ পর্যন্ত এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে বিএ.৪ বা বিএ.৫ উপধরন করোনার নতুন উপসর্গ কিংবা সংক্রমণের ক্ষেত্রে আরও জটিলতা সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

অমিক্রনের নতুন দুই উপধরন টিকার সুরক্ষা নষ্ট করে দিতে পারে কি না, সেটি নিশ্চিত হতে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকেরা। তবে ছোট একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অমিক্রনের বিএ-২ উপধরনের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টিবডি কার্যকর ছিল, সেটি বিএ-৪ ও বিএ-৫ উপধরনের বিরুদ্ধে ততটা কার্যকর নয়। এ গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কেউ করোনা থেকে সেরে ওঠার পর যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তার চেয়ে করোনার টিকা নিলে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি নতুন উপধরনের বিরুদ্ধে বেশি কার্যকর।

করণীয় কী

নতুন উপধরনের প্রভাব, সুরক্ষা হ্রাস পাওয়া ও সুরক্ষার পদক্ষেপ কমে যাওয়ায় করোনা সংক্রমণ বাড়ছে—এ বিষয়ে একমত অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। নতুন দুই উপধরনের সংক্রমণের ফলে গুরুতর উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে এখনই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। বয়স্ক ও ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষায় এবং করোনার তীব্র উপসর্গ থেকে বাঁচাতে অনেক দেশেই দ্বিতীয় দফা বুস্টার ডোজ কিংবা চতুর্থ ডোজ টিকা দিতে যাচ্ছে। অপর দিকে ওষুধ কোম্পানিগুলো অমিক্রনের জন্য বিশেষ টিকা তৈরি নিয়ে কাজ করছে।

এ ছাড়া এটাও মনে রাখতে হবে যে করোনার এই উপধরন বাতাসে ছড়াতে সক্ষম। এ জন্য ঘরে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। বায়ু চলাচল স্বাভাবিক রাখা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর ভালো একটি সুযোগ।

আল–জাজিরা অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন মো. আবু হুরাইরাহ্‌ ও মেহেদি হাসান

বিশ্ব থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন