কিছু মহলে আশাবাদ থাকলেও ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ হচ্ছে কিংবা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় এ সংকটের দ্রুত সমাধান হবে, এমনটা দাবি করার সময় এখনো আসেনি। পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতার পরীক্ষা চলছে। তবে সংঘাতের এই প্রাথমিক পর্যায়েই কিছু গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে নিজের আধিপত্য পুনরুদ্ধারের এই সর্বশেষ চেষ্টার পর বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আসলে কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনই হারিয়ে যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পতনের মতো পরিস্থিতি আপাতত কল্পনাপ্রসূত বলেই মনে হয়। রাশিয়া, চীন, ভারত ও অন্যান্য বড় শক্তির কাছে আসল প্রশ্ন এটা নয় যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে থাকবে কি না; বরং প্রশ্নটা হলো, পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় দেশটি নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেবে।
বিশেষ করে রাশিয়ার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্ক একই সঙ্গে নিবিড় ও সংঘাতময়। ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাসের কারণেই রাশিয়ার কৌশলগত হিসাব-নিকাশে পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা সব সময়ই গুরুত্ব পাবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতের ক্ষমতার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে রাশিয়াকে এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অনন্য অবস্থান অর্জন করেছিল, তা কেবল তাদের একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্বের ফল ছিল না; বরং তা ছিল বিশেষ কিছু ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফসল। সে সময় পশ্চিম ইউরোপ যুদ্ধে বিধ্বস্ত ছিল। চীনে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চলছিল এবং সোভিয়েত রাশিয়া সাম্যবাদী ব্যবস্থার কারণে বিশ্ব থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্বের আসনে বসার সুযোগ করে দিয়েছিল।
ইরানে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ ঘটনা এমন এক বিশ্বে মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে, যেখানে কোনো দেশই আর যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা নেতৃত্ব মেনে নিতে রাজি নয়। ইরান আর কত দিন এই সামরিক চাপ সইতে পারবে, মিত্রদের কাছ থেকে কেমন সহায়তা পাবে এবং ওয়াশিংটন নিজেই–বা কত দিন এ অভিযান চালিয়ে যাবে, তা এখনো অস্পষ্ট। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে, এ অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রত্যাশার সীমাকেও অতিক্রম করেছে।
ইরান-ইসরায়েল চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে একটি পরস্পরবিরোধী চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইসরায়েলি নেতৃত্ব তাদের লক্ষ্য অর্জনে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। বিপরীতে ইরানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধক্ষমতা দেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিস্ময় লক্ষ করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র এ সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে।
বর্তমান ইরান সংকট মূলত পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিস্ময় বাড়ছে ইরানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধক্ষমতা দেখে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র এ সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে দৃশ্যত উদ্বিগ্ন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে।
মূলত এই অর্থনৈতিক চাপের কারণে এমন গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করতে ওয়াশিংটন হয়তো গোপনে কোনো দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর খোঁজ করছে।
বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাশিয়া ইরানি জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। মস্কো মনে করে, ইরান বিনা উসকানিতে হামলার শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়াকে তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে রাশিয়া মূলত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সার্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং এ ব্যবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অবস্থান নিয়ে চিন্তিত।
যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থান বুঝতে একটি চিকিৎসাশাস্ত্রীয় উপমা ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বরাজনীতির দেহে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা ‘নিওপ্লাজম’ বা টিউমারের মতো। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এই ‘টিউমার’ পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয় না। বরং এটি রাজনৈতিক দেহের বিবর্তনের সঙ্গে মিলেমিশে যায় এবং একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অনন্য অবস্থান অর্জন করেছিল, তা কেবল তাদের একচেটিয়া শ্রেষ্ঠত্বের ফল ছিল না; বরং তা ছিল বিশেষ কিছু ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফসল। সে সময় পশ্চিম ইউরোপ যুদ্ধে বিধ্বস্ত ছিল। চীনে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চলছিল এবং সোভিয়েত রাশিয়া সাম্যবাদী ব্যবস্থার কারণে বিশ্ব থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্বের আসনে বসার সুযোগ করে দিয়েছিল।
বড় ধরনের কোনো ভয়াবহ সংঘাত ছাড়াই যদি বিশ্ব এ পরিবর্তনের সময়টুকু পার করতে পারে, তবে বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই টিকে থাকবে। তবে এর কারণ এই নয় যে বিশ্বের এখন মার্কিন নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন; বরং অন্য শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেবে বলেই দেশটি প্রাসঙ্গিক থাকবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতৃত্ব রোমান সাম্রাজ্য বা চেঙ্গিস খানের মতো প্রথাগত কোনো সাম্রাজ্য বিজয়ের ফসল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র বড় কোনো সামরিক যুদ্ধের মাধ্যমে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেনি; বরং বিশ্বের অন্য শক্তিগুলো যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত ছিল, তখনই দেশটি সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এ অর্থে যুক্তরাষ্ট্র ছিল অনেকটা মরুভূমির কাফেলার সেই ‘শেষ উট’-এর মতো, যে কিনা অন্যদের পিছিয়ে পড়ার সুযোগে হঠাৎ করেই সবার সামনে চলে আসে এবং কাফেলার নেতৃত্ব দিতে শুরু করে।
তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেই শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে থাকা ঐতিহাসিক কারণগুলো অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন অন্য শক্তিগুলোর পিছিয়ে থাকার আর কোনো বাস্তব কারণ নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বিশ্বরাজনীতির একমাত্র আধিপত্যশীল শক্তি থাকার বদলে একজন সাধারণ বা স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
বর্তমান ইরান সংকট মূলত এ পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। বিশাল সম্পদ আর সমরাস্ত্রের শক্তি থাকলেও পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়ে ইরানের মতো একটি বড় ও লড়াকু দেশকে কাবু করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। আর পরমাণু যুদ্ধের পথটি সব পক্ষের জন্যই আসলে অকল্পনীয়।
বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিস্ময় বাড়ছে ইরানের অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধক্ষমতা দেখে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র এ সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে দৃশ্যত উদ্বিগ্ন। তবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে।
মূলত এই অর্থনৈতিক চাপের কারণেই এমন গুঞ্জন ছড়াচ্ছে যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করতে ওয়াশিংটন হয়তো গোপনে কোনো দক্ষ মধ্যস্থতাকারীর খোঁজ করছে। আর এ কারণেই বর্তমানে যে তিক্ত শিক্ষা অর্জিত হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত মঙ্গলজনক হতে পারে।
একই সঙ্গে এ পরিস্থিতি নিয়ে চরম কোনো বিপর্যয়কর চিন্তা পরিহার করা প্রয়োজন। মার্কিন আধিপত্যের অবসান মানেই বিশ্বে অনিবার্যভাবে বিশৃঙ্খলা নেমে আসবে—এমন ধারণা মূলত বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার একটি কৌশলমাত্র। বরং অনেক দিক থেকেই একটি সুষম আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং এটি কাম্যও বটে।
রাশিয়ার ইতিহাস থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই রাশিয়া অনেক সময় নিজের পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ হাসিলে দেশটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আঠারো ও উনিশ শতকে রাশিয়ার এসব লক্ষ্য মূলত ব্রিটেনের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। পরবর্তীকালে রাশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার ত্রিমুখী সম্পর্ক বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপ ও চীন—উভয় পক্ষের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চাপ অনিচ্ছাকৃতভাবেই এমন একটি সুষম ব্যবস্থা তৈরির পথ প্রশস্ত করছে। সেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। আর এমন একটি পরিণতি রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গেই মূলত সংগতিপূর্ণ।
বর্তমান অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে ভবিষ্যতে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তা আগের তুলনায় নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হবে। এ পরিবর্তনের পথে যুদ্ধ কিংবা নানা সংকট দেখা দিতে পারে; তবে এসব ঘটনা যেন মূল রূপান্তরের বিষয়টি আড়াল না করে।
বড় ধরনের কোনো ভয়াবহ সংঘাত ছাড়াই যদি বিশ্ব এ পরিবর্তনের সময়টুকু পার করতে পারে, তবে বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই টিকে থাকবে। তবে এর কারণ এই নয় যে বিশ্বের এখন মার্কিন নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন; বরং অন্য শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেবে বলেই দেশটি প্রাসঙ্গিক থাকবে।
সহজ কথায়, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব থাকবে ঠিকই, তবে তা আগের মতো একক আধিপত্যের নয়।