হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে মিত্রদেশগুলোর অনীহায় হতাশ ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোকে সুরক্ষা দিতে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে মিত্রদেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে গতকাল সোমবার একাধিক মিত্রদেশ ট্রাম্পের সে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ইতিমধ্যে তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এখন পর্যন্ত এ যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত নৌপথ হরমুজ প্রণালি মূলত বন্ধ অবস্থায় আছে। ইরান ড্রোন ও নৌ-মাইন ব্যবহার করে এই জলপথ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জ্বালানিমূল্য বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে। এ পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ করা হয়।

ইরানে চলমান যুদ্ধ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। জার্মানি, স্পেন, ইতালিসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্রদেশ বলেছে, হরমুজ প্রণালি সচল করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর তাত্ক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

আরও পড়ুন
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস
ফাইল ছবি: রয়টার্স

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বার্লিনে বলেছেন, ‘মৌলিক আইন অনুযায়ী জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর পক্ষ থেকে যে অনুমোদন দরকার, তা আমাদের কাছে নেই।’

ফ্রিডরিখ মের্ৎসের দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল জার্মানির সঙ্গে পরামর্শ করেনি।

হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেছেন, অনেক দেশ তাঁকে জানিয়েছে, তারা সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রতা থাকা কয়েকটি দেশকে নিয়ে তাঁর কণ্ঠে হতাশার সুর শোনা গেছে।

ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, ‘কিছু দেশ এ বিষয়ে খুব উৎসাহী, আর কিছু দেশ উৎসাহী নয়।’মের্ৎস এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু উল্লেখ করেননি।

জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ‘এমন কিছু দেশ আছে, যাদের আমরা বহু বছর ধরে সাহায্য করেছি, তাদের বহিরাগত ভয়ংকর হুমকি থেকে রক্ষা করেছি। তারা অতটা উৎসাহী নয়। উৎসাহের মাত্রাটা আমার কাছে জরুরি।’

আরও পড়ুন
হরমুজ প্রণালি
ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েল সোমবার বলেছে, তারা অন্তত আরও তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চালানোর জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। কারণ, রাতভর তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইরানের ড্রোন হামলায় সাময়িকভাবে দুবাই বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে।

ইসরায়েলের সেনারা দক্ষিণাঞ্চলীয় লেবাননের নতুন নতুন এলাকায় প্রবেশ করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর রকেট ছোড়ার পর লেবাননে এ অভিযান শুরু হয়েছে।

কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বড় আকারে ইসরায়েলি স্থল অভিযান চালানো হলে তা ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এমন অভিযান এড়ানো উচিত বলে বিবৃতিতে মত দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

ইসরায়েল বলেছে, তারা ইরানের হুমকি দেওয়ার সক্ষমতাগুলোকে দুর্বল করতে চায়। এ জন্য তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তাদের এখনো হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা বাকি আছে।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেছেন, ‘আমরা যতটা সম্ভব এই শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করতে চাই। আমরা তাদের সব সক্ষমতা, সব অংশ এবং তাদের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সব শাখাকে দুর্বল করে দিতে চাই।’

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্থাপনার আশপাশে বসবাসকারীদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

এ ছাড়া ইরান ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি আবার সচল না করে, তবে খারগ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলোয় হামলা চালানো হতে পারে। এটি দেশটির প্রধান তেলকেন্দ্র। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী খারগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

আরও পড়ুন
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি
ফাইল ছবি: এএফপি

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবুলফজল শেখারচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশ থেকে খারগ দ্বীপে হামলা চালাবে, সেসব দেশের তেল ও গ্যাস স্থাপনাকে ইরান নিশানা করবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তাঁর দেশ যুদ্ধবিরতির জন্য কোনো অনুরোধ জানায়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বার্তা বিনিময়ও করেনি। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্কের প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি লিখেছেন, কিছু প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলোকে জায়গা দিয়েছে এবং ইরানের ওপর হামলার অনুমতি দিয়েছে। তারা ইরানিদের হত্যাকে উৎসাহ দিচ্ছে।

আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় নিহত শত শত ইরানি বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে ২০০ শিশুও আছে।