৪০ মিনিট যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকবেন আর্টেমিসের নভোচারীরা, তখন কোথায় থাকবেন তাঁরা
আর্টেমিস–২ মিশনের নভোচারীরা এখন পৃথিবীর যেকোনো মানুষের চেয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় অবস্থান করছেন।
এই চার নভোচারী মহাকাশে পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে অবস্থান করছেন যে তাঁদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর আকার ক্রমাগত ছোট হয়ে ধরা দিচ্ছে। এরপরও তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে অবস্থিত নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে একটানা যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
নিয়ন্ত্রণকক্ষে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার কর্মীরা নভোচারীদের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের সংযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন, যা তাঁদের জন্য স্বস্তির। তবে সেই সংযোগও বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে।
আজ সোমবার যুক্তরাজ্যের সময় রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৪৭ মিনিট) নভোচারীদের বহনকারী যানটি যখন চাঁদের পেছন দিকে চলে যাবে, তখন পৃথিবীর সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ থাকবে।
নভোযানে চড়ে চাঁদের পেছন ভাগটা ঘুরে আসতে নভোচারীদের যত সময় লাগবে, ততক্ষণ এমনটা চলবে। কারণ, ওই সময় মহাকাশযান ও পৃথিবীর মাঝখানে চাঁদের অবস্থান থাকবে এবং তা রেডিও ও লেজার সংকেত পৌঁছাতে বাধা দেবে।
মহাকাশযানে করে চাঁদের অপর পাশ ঘুরে আসার সময় প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চারজন নভোচারী সম্পূর্ণ যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকবেন। নিজ নিজ চিন্তা আর অনুভূতির ভেতর ডুবে মহাকাশের অন্ধকারে এগিয়ে চলবেন তাঁরা। এটি হবে নিঃসঙ্গতা আর নীরবতার এক গভীর মুহূর্ত।
আর্টেমিস মিশনে থাকা ওরিয়ন নভোযানের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেন, তিনি আশা করেন, ওই সময়কে বিশ্ববাসী একত্র হওয়ার সুযোগ হিসেবে নেবে।
অভিযানে যাওয়ার আগে গ্লোভার বিবিসি নিউজকে বলেছিলেন, ‘যখন আমরা চাঁদের আড়ালে থাকব, তবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন এটাকে একটা সুযোগ হিসেবে নিন। প্রার্থনা করুন, আশা রাখুন, আমাদের জন্য শুভকামনা রাখুন—যেন আমরা আবারও ক্রুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি।’
৫০ বছরের বেশি আগে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরাও চাঁদের অভিযানের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে একই ধরনের নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত অ্যাপোলো ১১–এর নভোচারী মাইকেল কলিন্স সবচেয়ে একাকিত্ব বোধ করেছেন।
১৯৬৯ সালে নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের মাটিতে প্রথম পদচিহ্ন রেখে ইতিহাস গড়ছিলেন, তখন পাইলট মাইকেল কলিন্স একাই নভোযানে বসে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছিলেন। যখন তাঁর মহাকাশযান চাঁদের অদৃশ্য পাশের আড়ালে চলে যেত, তখন চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা দুই নভোচারী এবং পৃথিবীতে থাকা নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ প্রায় ৪৮ মিনিটের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
পঞ্চাশ বছরের বেশি আগে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরাও চাঁদের অভিযানের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে একই ধরনের নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত অ্যাপোলো ১১–এর নভোচারী মাইকেল কলিন্স সবচেয়ে একাকিত্ব বোধ করেছেন।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা ‘ক্যারিয়িং দ্য ফায়ার’–বইয়ে কলিন্স এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। কলিন্স লিখেছেন, তিনি নিজেকে ‘পুরোপুরি একা’ এবং ‘যেকোনো চেনাজানা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন’ মনে করেছিলেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কোনো ভয় অনুভব করেননি।
পরবর্তী সাক্ষাৎকারগুলোয় কলিন্স বলেছিলেন, যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা তাঁকে একধরনের শান্তি ও প্রশান্তি এনে দিয়েছিল। এটি ছিল নিয়ন্ত্রণকক্ষের অবিরাম নির্দেশনা থেকে এক স্বস্তির বিরতি।
অন্যদিকে পৃথিবী থেকে যাঁরা মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার দায়িত্বে থাকেন, তাঁদের জন্য এই যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার সময়টা হয় ভীষণ উত্তেজনাপূর্ণ ও দুশ্চিন্তার।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্নওয়ালে অবস্থিত গুনহিলি আর্থ স্টেশনে একটি বিশাল অ্যানটেনা ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে আসা সংকেত সংগ্রহ করছে। এটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মহাকাশযানের অবস্থান নির্ণয় করে সেই তথ্য নাসার সদর দপ্তরে পাঠাচ্ছে।
গুনহিলির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ম্যাট কসবি বিবিসিকে বলেন, ‘মনুষ্যবাহী কোনো মহাকাশযানকে আমরা এই প্রথম ট্র্যাক করছি। যখন এটি চাঁদের আড়ালে যাবে, তখন আমরা একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ব। আর যখন আবার এটিকে দেখতে পাব, তখন আমরা ভীষণ আনন্দিত হব। কারণ, তখন বুঝব, তাঁরা সবাই নিরাপদে আছেন।’
আশা করা হচ্ছে, এ ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সমস্যাটিরও দ্রুতই সমাধান হবে। কসবির মতে, যখন নাসা এবং বিশ্বের অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা মুন বেজ স্থাপন করতে শুরু করবে এবং আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানের লক্ষ্য নিয়ে এগোবে, তখন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি সুরাহা করা জরুরি হয়ে পড়বে।
কসবি বলেন, ‘চাঁদে টেকসই উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য প্রতিদিন, ২৪ ঘণ্টা সম্পূর্ণ যোগাযোগ অপরিহার্য। এমনকি চাঁদের অদৃশ্যমান পাশে অবস্থান করার সময়ও যোগাযোগ থাকতে হবে। কারণ, সেই পাশও অনুসন্ধানের যোগ্য।’
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির মুনলাইট কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলোর আওতায় ভবিষ্যতে চাঁদের চারপাশে একটি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক স্থাপন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ নেটওয়ার্ক ধারাবাহিক এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ সংযোগ নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আর্টেমিস–২ মিশনের নভোচারীদের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার এই সময়টি তাঁদের চাঁদের দিকে পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করার সুযোগ দেবে।
নভোচারীরা এ সময় চাঁদকে পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত থাকবেন। চাঁদের অপর পাশ দিয়ে ঘুরে আসার সময় তাঁরা ছবি তুলবেন, চাঁদের ভূতত্ত্ব অধ্যয়ন করবেন এবং এর অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করবেন।
যখন নভোচারীরা চাঁদের আড়াল থেকে বের হবেন এবং সংকেত পুনঃস্থাপিত হবে, তখন পুরো বিশ্ব স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। তখন নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরে সে অসাধারণ দৃশ্যগুলো সবাইকে ঘরে বসে উপভোগ করার সুযোগ তৈরি করে দিতে পারবেন।
আর্টেমিস–২ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না। তাঁরা চাঁদের চারপাশে ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরবেন। ১৯৭২ সালের পর এবারই প্রথম কোনো মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে ভ্রমণ করছেন।