রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অবহেলায় নোবেলের অর্থের হিসাব-খাতা

পতিসর কৃষি ব্যাংকের হিসাব, ছবি: সংগৃহীত
পতিসর কৃষি ব্যাংকের হিসাব, ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত পতিসর কৃষি ব্যাংকের হিসাবের খাতাটির ওপরে যেন ১০৯ বছরের ধুলো। অবহেলা ও অযত্নে তা অনেকটাই ফ্যাকাশে।

বিশ্বকবি ১৯০৫ সালে নওগাঁর পতিসরে যে গ্রামীণ সমবায় কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার হিসাব রয়েছে এই খাতায়। শিলাইদহে কৃষকদের উন্নয়নে তাঁর নেওয়া নানা উদ্যোগের আর্থিক বিবরণীও এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তিনি ১৯১৩ সালে নোবেল বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে যে অর্থ পেয়েছিলেন, তাও কৃষি ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন। সেই তথ্যও রয়েছে এই খাতায়।

পাঁচ বছর ধরে নওগাঁ ট্রেজারিতে পড়ে আছে হিসাব খাতাটি। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এটির এমন জীর্ণ দশা, ছবি: সংগৃহীত



হিসাব খাতাটির ওপরে লেখা পতিসর ব্যাংকের আমানত হিসাব। পেছনে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপক রেবতীকান্ত ভৌমিকের সই। সেখানে রয়েছে বাংলা ১৩২০-১৩৪৫ সনের হিসাব। অনেক যত্ন করে এসব তথ্য লেখা থাকলেও তা নওগাঁ জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ট্রেজারিতে পড়ে আছে ঠিক ততটাই অবহেলায়। এর পুরো পাঠ উদ্ধারও হয়নি, পৌঁছায়নি গবেষকদের হাতে।

২০০৯ সালের ৮ মে নথিটি নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছিলেন রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রাহক মতিউর রহমান মামুন। কিন্তু যথাযথ উপায়ে তা সংরক্ষণ না হওয়ায় প্রচ্ছদ, লেখা ও হিসাবের অঙ্ক অনেকটাই মুছে গেছে। অনেক পাতা ক্ষয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে ধরলেই ১০৯ বছরের পুরোনো খাতাটি ভেঙে যাচ্ছে।

হিসাবের খাতার জলছাপ, ছবি: সংগৃহীত



পুরাতত্ত্ব আইন, ১৯৬৮ অনুযায়ী ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১০০ বছরের পুরোনো নথি পাওয়া গেলে তা জাতীয় পুরাতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। এর পাঠোদ্ধার করতে ও সংরক্ষণের জন্য তা জাতীয় জাদুঘর বা জাতীয় মহাফেজখানায় জমা দিতে হবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের স্মৃতি ও উপমহাদেশের প্রথম কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ওই নথিটি এখন পর্যন্ত জাতীয় জাদুঘর বা জাতীয় মহাফেজখানার কোথাও জমা দেওয়া হয়নি।

এমন মূল্যবান নথি যথাযথ উপায়ে সংরক্ষণ না হওয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মুস্তাফিজুর রহমান।

গত সপ্তাহে মতিউর রহমান মামুন খাতাটি দেখতে যান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই মহামূল্যবান খাতাটি অবহেলার শিকার হয়ে জীর্ণ দশায় পৌঁছেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত পতিসর গ্রামীণ সমবায় কৃষি ব্যাংক বিষয়ে মূল নথিগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা ও পর্যালোচনা হয়নি বলে জানালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনাবিষয়ক গবেষক ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথই উপমহাদেশে প্রথম গ্রামীণ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। নথিটির মধ্যে হয়তো এমন তথ্য রয়েছে, যা ইতিহাসের অমূল্য দলিল। নথিটি দ্রুত কোনো জাদুঘরে সংরক্ষণ করা উচিত।

যেভাবে পাওয়া গেল: নথিটি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজের শিক্ষক আবদুল হামিদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন মতিউর রহমান। আবদুল হামিদ রবীন্দ্রনাথের কৃষি ব্যাংকের কর্মচারী মোহাম্মদ আহমদ আলী শাহের নাতজামাই। তাঁর বাড়ি রানীনগরের বিল কৃষ্ণপুরে। পারিবারিক সূত্রে এটি তাঁর বাড়ির সিন্দুকেই দীর্ঘদিন ছিল।

মতিউর রহমান বলেন, ‘আবদুল হামিদ একবার ওই নথিটি ঘাঁটতে গিয়ে দেখেন, তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম লেখা। তখন তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২০০৯ সালের ২৪ মার্চ আবদুল হামিদের কাছ থেকে নথিটি সংগ্রহ করে পরে তা জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে জমা দিই।’

২০০৯ সালে নওগাঁর জেলা প্রশাসক ছিলেন নাজমুন আরা। বর্তমানে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নথিটির একটি প্রতিলিপি (ফটোকপি) জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিই। আর মূল নথিটি ট্রেজারিতে জমা রাখি।’

 নথিটি উদ্ধারের পাঁচ বছর পরও জাতীয় জাদুঘরে জমা হলো না কেন, জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা প্রশাসক এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি জানতে পেরেছি, এটি জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ট্রেজারিতে আছে। খুব দ্রুত এটি জাদুঘরে জমা দেওয়ার জন্য সরকারকে চিঠি দেওয়া হবে।’