মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার: আদালতকে বললেন দুই অ্যামিকাস কিউরি

আইনের সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার:
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার:

অপর্যাপ্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রেখে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে আনা সংশোধনী আবদুল কাদের মোল্লার মামলার ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য বলে মত দিয়েছেন দুই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তাঁরা বলেছেন, এই সংশোধনী বৈধ। অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে গতকাল সোমবার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রফিক-উল হক ও এম আমীর-উল ইসলামের আদালতে দাখিল করা লিখিত বক্তব্যে এ মত উঠে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ প্রশ্নে ভিন্নমত দিয়েছেন এই দুই অ্যামিকাস কিউরি।প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানিকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইগত প্রশ্ন ওঠায় ২০ জুন আপিল বিভাগ এ বিষয়ে মতামত দিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ সাত আইনজীবীর নাম ঘোষণা করে ৮ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেন। প্রশ্ন দুটি হলো, দণ্ড ঘোষণার পর আইনে আনা সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না। অপরটি হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে কি না।

গতকাল আদালতে রফিক-উল হকের ২৫ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য আদালতে দাখিল করেন অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড মো. ওয়াহিদুল্লাহ। পরে তিনি তা পড়ে শোনান। এরপর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আমীর-উল ইসলাম লিখিত বক্তব্য দাখিল করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

রফিক-উল হকের বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২১ ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এই সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা বৈধ ও সংবিধানসম্মত। ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে তা কার্যকর বলে গণ্য হবে। সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে আইনটিকে সুরক্ষা দেওয়া আছে। নতুন ধারা অনুসারে, কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে অধিকার হিসেবে সরকার আপিল করতে পারে। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এবং ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ক্ষেত্রে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (কাস্টমারি ইন্টারন্যাশনাল ল) প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই।

শুনানির পর আইনজীবী এম আমীর-উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এই সংশোধনী কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর আগে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি যখন করা হয়, সে সময় বিদ্যমান প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়। পরে আন্তর্জাতিক আইনের অনেক উন্নয়ন (ডেভেলপমেন্ট) হয়েছে। জেনেভা কনভেনশনের পার্টি (পক্ষভুক্ত) ছিল পাকিস্তান, ১৯৫১ সালে। ১৯৭২ সালে আমরা জেনেভা কনভেনশনে পার্টি (পক্ষভুক্ত) হয়েছি। ওই কনভেনশনে আন্তর্জাতিক আইনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেই উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে জেনোসাইড (গণহত্যা) হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ঘোষণার প্রতি অনুগত থাকার কথাও বলা হয়।

পবিত্র কোরআনে যুদ্ধের ব্যাপারে নির্দেশনা, হজরত আবু বকর (রা.)-এর সময়ের নীতি, ঈশা খাঁর যুদ্ধকালীন আচরণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আমীর-উল ইসলাম বলেন, এই সবকিছু মানব সভ্যতার একেকটি বড় মাইলফলক। এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আইন, যাকে ইন্টারন্যাশনাল কাস্টমারি ল (প্রথাগত আইন) বলা হয়। এ আইন আমাদের ওপরও প্রযোজ্য। সংবিধান অনুসারে প্রথাও আইনের অংশ।

আইনের সংশোধনী প্রসঙ্গে আমীর-উল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সংশোধনী বৈধ। এতে দণ্ড বাড়ানোর জন্য কোনো নতুন বিধান করা হয়নি। আপিলের সমানাধিকার নিশ্চিতের জন্য সংশোধন করা হয়েছে। সংবিধান অনুসারে, বিচারে সম-অধিকার থাকতে হবে। ভূতাপেক্ষ হিসেবে এটা সংবিধানবিরোধী নয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ, তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন। অন্য একটি অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। কিন্তু কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আকস্মিকভাবে শাহবাগে তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ শুরু হয়। গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। এরপর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সমান সুযোগ রেখে ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আগে কোনো অভিযোগে আসামির সাজা হলে তার রুিদ্ধে আপিলের সুযোগ ছিল না সরকারপক্ষের।

এরপর ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরদিন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে অব্যাহতি চেয়ে আরজি জানিয়ে আপিল করেন কাদের মোল্লা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আপিলের শুনানি শুরু হয়।