ভুগছিলেন অনেক দিন থেকেই। সবাই বুঝতে পারছিলেন, ক্রমেই তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন জীবনের শেষ সীমানায়। মৃত্যুর সংবাদটি শোনার জন্য প্রস্তুত হয়েই ছিল মন। কিন্তু ৮ অক্টোবর সকালে যখন শোনা গেল তিনি মারা গেছেন, তখন বোঝা গেল এই সংবাদটি মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। প্রস্তুত মন তাই অপ্রস্তুত হতে সময় নেয় না। ভাষার জন্য তাঁর গতিশীল চলার পথটি বারবার সামনে এসে দাঁড়ায় কেবল। বায়ান্নর সেই অসাধারণ সময়টিতে যাঁরা ভাষার দাবি সামনে এনে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে মহিরুহ হয়ে উঠেছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনই ‘ভাষা’ শব্দটির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছেন—‘ভাষা-মতিন’। হাজার আবদুল মতিনের থেকে সরে গিয়ে ‘ভাষা-মতিন’ হয়েই রইলেন তিনি। মৃত্যুর পরও তিনি ভাষা-মতিন—পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক নীরব অহংকার।
আবদুল জলিল ও আমেনা খাতুনের ছেলে আবদুল মতিন জন্মেছিলেন সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ধুবালীয়া গ্রামে, ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর। দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন তিনি। তবে এই সুদীর্ঘ জীবনে সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়িয়েছেন গত শতাব্দীর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ অবধি, ভাষা আন্দোলনের কারণে যে সময়টি অমর হয়ে রয়েছে।
জীবন-সংগ্রামে পরাজিত হয়ে আবদুল জলিল দার্জিলিংয়ে গিয়েছিলেন বেঁচে থাকার যুদ্ধে অংশ নিতে। শিশু আবদুল মতিন সেখানেই বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন মহারানী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে, ১৯৩২ সালে। ১৯৩৬ সালে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি, ১৯৪৩ সালে দিলেন এন্ট্রান্স, পাস করলেন তৃতীয় বিভাগে। শৈশবে মায়ের মৃত্যু, বাবার দ্বিতীয় বিয়ে ইত্যাদি ঘটনা আবদুল মতিনের জীবনে তোলপাড় এনেছিল। পরিবার ও পড়াশোনা—দুটোর প্রতিই এসেছিল অনীহা। তাই দার্জিলিং থেকে ফিরে এসেছিলেন পাবনায়। মামা চাইলেন তাঁকে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি করাতে কিন্তু মতিন ভর্তি হলেন রাজশাহী সরকারি কলেজে। ১৯৪৫ সালে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেন, এবারও তৃতীয় বিভাগ। এরপর তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। ফোর্ট উইলিয়াম থেকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পেলেন কমিশন। কলকাতা থেকে চলে গেলেন আজকের ব্যাঙ্গালুরুতে। তত দিনে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। তাই একটি সার্টিফিকেট হাতে ফিরে এলেন দেশে। সে বছরই ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব আর্টসে। ১৯৪৭ সালে স্নাতক হলেন। এমএ করলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে।
১৯৪৮ সালটি ছিল ভাষা-মতিনের জন্য এক অনন্য বছর। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসেছিলেন সে বছরের ১৯ মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে তিনি বক্তৃতা করেছিলেন ২১ মার্চ। সেই ভাষণ মতিন শুনেছিলেন রেসকোর্সেই। উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার যে ঘোষণা জিন্নাহ সেদিন দিয়েছিলেন, তাতে প্রবল উচ্ছ্বাস ও আবেগ নিয়ে যে জনতা উপস্থিত হয়েছিলেন ময়দানে, তাঁরা আশাহত হন। সেই আশাহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আবদুল মতিনও। ২৪ মার্চ কার্জন হলে সমাবর্তন বক্তৃতায় জিন্নাহ যখন আবার উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার কথা উল্লেখ করলেন, তখন যে গুটি কয়েক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আবদুল মতিন। ১৯৪৮ সালে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা নানা দিকের ষড়যন্ত্রের কারণে একসময় স্তিমিত হয়ে এসেছিল। তবে ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ (১৯৪৮ সালের এই দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকায় সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়েছিল) পালন উপলক্ষে ছাত্র ফেডারেশন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’ ইত্যাদি ধ্বনি দিতে দিতে পরিষদ ভবনের দিকে এগিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাতে লাঠিচার্জ করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ভাষা বিতর্ক চলতেই থাকে। চলতে থাকে ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এ বছরই একটি ছাত্রমিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তার হন আবদুল মতিন। একটি বন্ডে সই করলে মুক্তি মিলবে, এ কথা জানানো হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। দুই মাস পর অবশ্য স্বাভাবিকভাবে মুক্তি পান তিনি।
১৯৫০ সালের ১১ মার্চ উদ্যাপিত হয় শিক্ষার্থীদের বিরাজমান হতাশার মধ্যেই। এই উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত ছাত্রসভায় আবদুল মতিনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আবদুল মতিনই ছিলেন পরিষদের আহ্বায়ক। এই পরিষদের মাধ্যমেই ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয়। এই পরিষদই পতাকা দিবস পালন করে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে গণপরিষদের করাচি অধিবেশনে স্মারকলিপি পাঠায়।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন কেবল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বললে ৩০ জানুয়ারিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন, মিছিল, সভা করা হয়। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার কাউন্সিলে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ওই সময় আবদুল মতিন সংগঠক ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে যে অবদান রাখেন, তা অবিস্মরণীয়। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে যে ভোট হয়, তাতে ১১ জন ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে এবং তিনজন ভাঙার পক্ষে ভোট দেন। একজন ভোট দেননি। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন আবদুল মতিন। তিনিই পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আমতলার বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের কথা বলে ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে যে গায়েবানা জানাজা হয়, সেটাও ছিল ভাষা-মতিনের ভাবনার প্রতিফলন।
১৯৫২ সালে কারাবরণ করেন ভাষা-মতিন। ১৯৫৩ সালের ১৪ মার্চ মুক্তি পান। কারাগারেই বেশ কিছু বামপন্থী নেতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর করাচিতে
অল পাকিস্তান স্টুডেন্ট কনভেনশনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কামরুজ্জামান ও তিনি প্রতিনিধি হয়ে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টকে জয়ী করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। ১৯৬৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে তিনি চীনপন্থী কমিউনিস্টদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ১৯৭২ সালে রক্ষী বাহিনী আবদুল মতিনকে গ্রেপ্তার করে। ১৯৭৭ সালে তিনি মুক্তি পান।
১৯৯২ সালে আবদুল মতিন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে অংশ নেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই পার্টিতে সক্রিয় ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
আবদুল মতিন এর পরও বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর জীবনের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সময়টি নিঃসন্দেহে ভাষা আন্দোলন এবং তিনি ভাষা আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অন্যতম।
আবদুল মতিন বিয়ে করেছিলেন ১৯৬৬ সালে, গুলবদননেসা মনিকা তাঁর সহধর্মিণী। মাতিয়া বানু শুকু ও মালিহা শুভন তাঁর দুই মেয়ে।
কয়েকটি বই লিখেছিলেন ভাষা মতিন। জীবনের পথের বাঁকে বাঁকে, ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য, বাঙালি জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন—তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বই।