গোলটেবিল বৈঠক

একটি বাড়ি একটি খামারকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে

দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নে ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ত্রুটি-বিচ্যুতি সারিয়ে একে স্থায়ী রূপ দিতে হবে। একটি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রকল্পের অর্জনকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। গতকাল শনিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প: সাফল্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অর্থনীতিবিদ, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন। তাঁরা প্রকল্পটিকে টেকসই করতে একে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত হয়ে পরিচালনার ওপর জোর দেন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়ে তাঁরা বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটি যাতে বন্ধ না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পকে শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কাজ করলে হবে না, জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কাজ করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর প্রকল্পের মাধ্যমে যদি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো না যায়, তাহলে তা টেকসই হবে না।

খলীকুজ্জমান বলেন, এর আগে দেশে অনেক সুন্দর সুন্দর প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু তা বিদেশিদের ধ্যান-ধারণা থেকে তৈরি হওয়ায় টেকেনি। তবে একটি বাড়ি একটি খামার সম্পূর্ণ দেশি চিন্তা ও প্রয়োজনে তৈরি। এর মেয়াদ ২০১৫ সালের জুনে শেষ হয়ে যাবে। এর অর্জনগুলোকে ধরে রাখতে হলে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ প্রকল্পের কিছু সীমাবদ্ধতার দিকে আলোকপাত করে বলেন, এই প্রকল্পের মধ্যেও কিছু ভুলত্রুটি রয়েছে। তবে এটি কি সামাজিক নিরাপত্তা, না উন্নয়ন প্রকল্প, তা আগে ঠিক করতে হবে। প্রকল্পটিকে স্থায়ী করতে সমবায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে একে গড়ে তুলতে হবে এবং এদের সহায়তার জন্য সমবায় ব্যাংক স্থাপন করতে হবে।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মিহির কান্তি মজুমদার একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি প্রতি সপ্তাহে শোধ করতে হয়। এতে ওই ঋণ মুদি দোকানসহ অন্যান্য কাজে বেশি যায়। কৃষিতে তা বিনিয়োগ হয় না। তাই একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে মাসিক কিস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে তা কৃষি খাতে বিনিয়োগ হতে পারে। এই প্রকল্পের আওতায় গ্রামের মানুষ ঋণ পায় এবং নিজেরাও সঞ্চয় করে। এতে গত দেড় বছরে তাঁদের পুঁজির পরিমাণ ৯০০ কোটি টাকা হয়েছে।

রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহমেদ আল কবীর বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের ৫০ শতাংশ সরকারি ব্যাংকের শাখাকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে সরকার চাইলে এখন তারা একটি বাড়ি একটি খামার ধরনের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের পরিচালক প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, এক হাজার ৪৯২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মূল দর্শন জীবিকায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন। দেশের প্রতিটি গ্রাম থেকে ৬০টি দরিদ্র পরিবার বাছাই করে গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন করা হয়েছে। এই দরিদ্র পরিবারগুলোকে সঞ্চয়মুখী করতে তাদের নিজস্ব সঞ্চয়ের বিপরীতে মাসে ২০০ টাকা করে সরকারি অনুদান পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া ৯০০ কোটি টাকার মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা সমিতির সদস্যরা ঋণ নিয়ে মৎস্য চাষ, মুরগির খামার, পশুপালনসহ নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রকল্পের মূল ছয়টি উদ্দেশ্যের সব কটি প্রায় শতভাগ সফল হয়েছে।

সাবেক সচিব সমর চন্দ্র পাল প্রকল্পের সাফল্যকে আরও বেশি প্রচারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন বলেন, এই প্রকল্পের সমিতিগুলোর মাসিক বৈঠকে মাদকবিরোধীসহ নানা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির কাজও হয়। সিরডাপের বিশেষ কর্মকর্তা মুজিবর রহমান বলেন, প্রকল্পের আওতায় যে পরিবারগুলো রয়েছে, তাদের মধ্য থেকে হতদরিদ্র তরুণদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।

মানিকগঞ্জ উপজেলা সদরের শাকরাইল গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্য পারুল বেগম ও কেরানীগঞ্জ বেহারা গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সদস্য জোসনা বেগম জানান, তাঁরা সমিতির সদস্য হয়ে লাভবান হচ্ছেন। তাঁদের দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে।

নওগাঁর সাবেক জেলা প্রশাসক নাজমুনারা খানুম বলেন, প্রকল্পের যে সমস্যাগুলো ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। 

কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মোহাম্মদ ফকরুল বলেন, সারা দেশে যে বাজারগুলো রয়েছে, তাতে একটি বাড়ি একটি খাবার প্রকল্পের সমিতির সদস্যদের জন্য একটি দোকান থাকা উচিত। এতে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারজাত করা যাবে। পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলার চেয়ারম্যান বাকী বিল্লাহ বলেন, যেসব জনপ্রতিনিধি ও সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন, তাঁদের জন্য প্রণোদনা থাকা জরুরি। তাহলে অন্যরা এ ধরনের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত হবেন।

ব্যাংক এশিয়ার ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী মরতুজা আলী বলেন, এই প্রকল্পে তাঁরা মোবাইল ব্যাংকিং-সুবিধা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের ব্যাংক হিসাব এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারে। এ জন্য তাদের কোনো মাশুল গুনতে হয় না।  

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এই প্রকল্পের সফলতা ধরে রেখে একে টেকসই করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে নিজ গতিতে চলতে দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত হয়ে পরিচালিত হলে তা দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।