মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

একাত্তরে ধর্ষণের দায়ে প্রথম ফাঁসি কায়সারের

সৈয়দ মো. কায়সার
সৈয়দ মো. কায়সার

মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ মো. কায়সারকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় ধর্ষণের দায়ে আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে ধর্ষণের দায়ে তিনটি পৃথক মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং পলাতক বিএনপি নেতা এম এম জাহিদ হোসেনকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর জামায়াতের সাবেক সদস্য (রুকন) পলাতক আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অন্য অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় ধর্ষণের সাজা আলাদা করে দেননি আদালত।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার সৈয়দ মো. কায়সারের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় দেন। আদালত মত দিয়েছেন, সরকারের উচিত মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার নারী ও যুদ্ধশিশুদের যথাযথ সম্মান দেখিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
এ নিয়ে এই ট্রাইব্যুনাল আটটি মামলার রায় দিলেন। আর ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দিয়েছেন ছয়টি মামলার।
কায়সারের বিরুদ্ধে গঠন করা ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ১৪টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের দুটিসহ সাতটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। বাকি সাতটি অভিযোগের মধ্যে চারটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড, একটিতে ১০ বছর, একটিতে সাত বছর ও একটিতে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সর্বোচ্চ সাজা পাওয়ায় কারাদণ্ডের সব সাজা মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে।
রায়ে বলা হয়, একাত্তরে কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা কায়সার হবিগঞ্জের মাধবপুরে তাঁর বিশ্বস্ত অনুসারী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে একটি স্থানীয় আধা সামরিক বাহিনী গঠন করেন। নিজের নামে তিনি এর নাম দেন কায়সার বাহিনী। এ বাহিনীর নিজস্ব পোশাক ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাহিনী হবিগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ত্রাস সৃষ্টি করে। পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি তারা নানা ধরনের নৃশংস অপরাধ করে।

ধর্ষণের শিকার নারী ও যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনে ব্যবস্থা নিন: ট্রাইব্যুনাল

রায় ঘোষণা উপলক্ষে গতকাল সকালে ৭৩ বছরের কায়সারকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বেলা ১১টার দিকে তাঁকে হাজতখানা থেকে এজলাসে আসামির কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। এর পরপরই ৪৮৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। সোয়া এক ঘণ্টার মধ্যে রায় ঘোষণা শেষ হয়।
এরশাদ সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী কায়সার ২০১৩ সালের ২১ মে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিচারের প্রায় পুরো সময় তিনি জামিনে ছিলেন। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযোগ গঠন করা হয়। গত ৯ মার্চ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলে। রাষ্ট্রপক্ষের ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে প্রথমবারের মতো একজন যুদ্ধশিশু ক্যামেরা ট্রায়ালে (সাক্ষীর পরিচয় গোপন করে শুনানি) সাক্ষ্য দেন। ২০ আগস্ট মামলার কার্যক্রম শেষে রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়। গতকাল রায় ঘোষণার পর তাঁকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সাত অভিযোগে ফাঁসি: ৩, ৫, ৬, ৮, ১০, ১২ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় কায়সারকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ৮ ও ১২ নম্বর অভিযোগ ধর্ষণের এবং ১৬ নম্বর অভিযোগ ২২ গ্রামের ১০৮ জনকে হত্যা ও নিপীড়নের।
অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ১১ মে কায়সারসহ একদল পাকিস্তানি সেনা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার চানপুর চা-বাগানে এক সাঁওতাল নারীকে ধর্ষণ করে।
১২ নম্বর অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি কায়সারের নেতৃত্বে তাঁর বাহিনীর সদস্য ও কয়েকজন রাজাকার মাধবপুর থানার জগদীশপুর পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে এক নারী, তাঁর বাবা ও এক চাচাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ওই নারীকে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে হস্তান্তর করা হলে তাঁকে ৮-১০ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়।
১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর কায়সারের নেতৃত্বে তাঁর বাহিনী, শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকাররা এবং পাকিস্তানি সেনারা যৌথভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার দেউড়া, নিশ্চিন্তপুরসহ ২২ গ্রামে হামলা চালিয়ে ১০৮ জন নিরস্ত্র হিন্দুকে হত্যা করে।
৩, ৫, ৬ ও ১০ নম্বর অভিযোগে কায়সারের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এগুলোতেও মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
সাত অভিযোগে কারাদণ্ড: হত্যা, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের চারটি অভিযোগ ১, ৯, ১৩ ও ১৪ নম্বরে কায়সারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দ্বিতীয় অভিযোগে লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের দায়ে কায়সারকে ১০ বছর, সপ্তম অভিযোগে অমানবিক আচরণের দায়ে সাত বছর ও ১১ নম্বর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
দুই অভিযোগ থেকে খালাস: হত্যা ও নির্যাতনের ৪ ও ১৫ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় কায়সারকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রতিক্রিয়া: রায়ে সন্তোষ জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি রানা দাশগুপ্ত বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারী ও যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য ট্রাইব্যুনাল যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, সে অনুসারে সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কায়সারের আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেছেন, ‘আমাদের আপিলের সুযোগ আছে। তাই উচ্চ আদালতে আপিল করব।’