বিশ্ব ওআরএস দিবস। ২০১২ সালের জুন মাসে দ্য ল্যানসেট খাওয়ার স্যালাইনকে ‘বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসংক্রান্ত আবিষ্কার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ওরস্যালাইনের উদ্ভাবন এবং তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেছে বাংলাদেশ। আইসিডিডিআরবি উদ্ভাবিত খাওয়ার স্যালাইনকে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত শুরু করে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি)। ১৯৮৫ সালে ডায়রিয়া থেকে শিশুদের জীবন বাঁচানোর পথচলা শুরু করা এসএমসির সেই স্যালাইন এখন শুধু জীবন বাঁচাতে নয়, বরং ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে কর্মক্ষম, প্রাণচঞ্চল রাখার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে। বিশ্ব ওআরএস দিবস বাংলাদেশে তাই এসএমসি ওরস্যালাইন দিবস।

ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানায় চরম অসুস্থ শিশু। তার শুশ্রূষায় বিপর্যস্ত মা পাশে। কিন্তু নিরুপায় মা ভেবে পাচ্ছেন না কী করবেন। প্রতিবেশীদের কেউ পরামর্শ দিলেন, খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ান। সেই পরামর্শ শুনে মা তাঁর আদরের সন্তানকে খাওয়ালেন স্যালাইন। শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠল। মুখে হাসি ফুটল মায়ের।
গত শতকের আশির দশকের শেষে বা নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশনে এমন বিজ্ঞাপনচিত্র বেশ দেখা যেত। ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা থেকে সেরে উঠতে খাওয়ার স্যালাইনের বা ওআরএসের খ্যাতি এখন বিশ্বজোড়া। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে—কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো এই স্যালাইন। শুধু পাতলা পায়খানা হলেই নয়, গরমে ঘেমে–নেয়ে গেলে অধিক পরিশ্রমেও অনেকে খাওয়ার স্যালাইন খায়।
একসময় ডায়রিয়ায় হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো বাংলাদেশে। সেই বাংলাদেশে এখন ডায়রিয়া শিশুমৃত্যুর একটি গৌণ কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অর্জনে ওআরএসের ভূমিকা খুব তাৎপর্যপূর্ণ।
শিশু বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত শতকের চিকিৎসাবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো ওআরএস। আর কোনো আবিষ্কার এত জীবন বাঁচায়নি। সেটা ক্যানসার বা হৃদ্রোগ, যা–ই হোক না কেন। বাংলাদেশের শিশুমৃত্যু রোধে এর ভূমিকা অনন্য। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে ওআরএস ধন্বন্তরি।’
বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের জীবনরক্ষাকারী এই ওআরএস নিয়ে গবেষণা, আবিষ্কার, মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল, তাদের ওআরএস বানাতে শেখানো—সব হয়েছে বাংলাদেশে। মূল গবেষণায় ছিলেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।
বর্তমানে খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস নামে পরিচিত ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপির (ওআরটি) প্রথম সফল গবেষণার ফলাফল ১৯৬৮ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়। ২০০৭ সালে গবেষণা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত খাওয়ার স্যালাইন সারা বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে। এ হিসাবে ২০১৯ পর্যন্ত খাওয়ার স্যালাইনের ব্যবহার ৭ কোটির বেশি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছে বলা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্বব্যাংকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি ‘সাকসেস ফ্যাক্টরস ফর উইমেনস অ্যান্ড চিলড্রেনস হেলথ’ শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের শিশুমৃত্যুর হার কমে আসার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে পাঁচ বছরের নিচের শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রতি হাজারে ১৫১। সেটি ২০১১ সালে এসে কমে দাঁড়ায় ৫৩–তে। নিরাময়যোগ্য রোগ রোধে টিকার সম্প্রসারণ এবং ডায়রিয়ার চিকিৎসা এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে বলে এ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৯৯৩ থেকে ২০১৪ সালের হিসাবে দেখা যায়, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা এ সময়ে ৫৬ শতাংশ কমে গেছে। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়ার কারণে ৫ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫ শতাংশের বেশি। চার দশকের মধ্যে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২০’-তে দেশে বিভিন্ন রোগে শিশুমৃত্যুর চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, ৫ বছরের কম বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া। এরপরই পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্থান। এটি প্রায় ৯ শতাংশ। এরপর আছে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, অপুষ্টি, নানা ধরনের জ্বর, জন্ডিস ও জটিল ডায়রিয়া। এই দলিলে শিশুমৃত্যুর ১১টি কারণ উল্লেখ করা হয়। এগুলোর মধ্যে জটিল ডায়রিয়া অষ্টম কারণ। আর এতে মৃত্যু হয় প্রায় ৪ শতাংশ শিশুর।
আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী মোহাম্মদ ইউনুস প্রথম আলোকে বলেন, ডায়রিয়ায় মৃত্যু কমার মূল কারণ ওআরএস। এখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এটি পৌঁছে গেছে। ওআরএসের প্রসারে এসএমসির একটি বড় ভূমিকা আছে। তাদের প্রচারমূলক কাজের জন্যই এটি মানুষের কাছে গেছে সহজে।
‘বাংলাদেশ: আ সাকসেস কেস অব কমব্যাটিং চাইল্ডহুড ডায়রিয়া’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, এই শিশুমৃত্যুর হার কমাতে ওআরএসের ভূমিকা অনবদ্য। আরও এর পেছনে ছিল সরকারি, এনজিও ও ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা। গবেষণাটি ২০১৯ সালে জার্নাল অব ওয়ার্ল্ড হেলথে প্রকাশিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হলে সাধারণত তার দাম হয় বেশি। এটি সহজলভ্য হয় না। কিন্তু ওআরএস এমন এক ওষুধ, যেটি সব সময় মানুষের নাগালের মধ্যে থেকেছে।
মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ওআরএস বাংলাদেশের একটি বিশাল অর্জন। পশ্চিমা বিশ্ব এটি আবিষ্কার করতে পারেনি। বাংলাদেশ পেরেছে।