ঢাকার ১০টি বড় ও মাঝারি বেসরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক ও নার্স কাজে ইস্তফা দিয়েছেন। কিছু চিকিৎসককে বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে বলেছে কর্তৃপক্ষ। করোনার এই দুর্যোগের সময় এমন ঘটনা কাঙ্ক্ষিত নয় বলে মনে করছেন সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। এই প্রবণতা এখনই বন্ধ করার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন তাঁরা।
দেশে করোনা সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে, মৃত্যুও বাড়ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালকে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার কথা শুরু থেকেই বলে আসছে। ইতিমধ্যে রাজধানীতে তিনটি বেসরকারি হাসপাতালকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করার কাজ চলছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি জটিল ও অনিশ্চিত। এই সময় বাস্তবসম্মত ও মানবিক আচরণ করতে হবে।
রাজধানীর শ্যামলী এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ওই হাসপাতাল থেকে ১১ জন চিকিৎসক ও ৬০ জন নার্স কাজে ইস্তফা দিয়েছেন। ওই হাসপাতালে অন্য রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়া একজন রোগীর পরবর্তী সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছিল। ওই ব্যবস্থাপকের ধারণা, সুরক্ষার বিষয়টি সামনে এনে নার্স ও চিকিৎসকেরা ইস্তফা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সুরক্ষার সব ধরনের ব্যবস্থা হাসপাতালের পক্ষ থেকে করা হয়েছে।
অন্যদিকে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে বেশ কয়েকজন চিকিৎসককে বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই ওই হাসপাতালে রোগী কমতে শুরু করে। সেখানে এখন প্রায় রোগীশূন্য। ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথম আলোকে বলেছে, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য কাউকে চাপ দেওয়া হয়নি।
একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও হাসপাতালের উদ্যোক্তা উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম দুটি মৃত্যু হয়েছিল দুটি বেসরকারি হাসপাতালে। ওই দুজন রোগী ভর্তির আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানত না যে ওই দুই বয়স্ক ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) তাঁদের নমুনা পরীক্ষার পর ঘটনা সবার নজরে আসে। পরবর্তী সময়ে এই হাসপাতাল দুটির বেশ কিছু চিকিৎসক ও নার্সকে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) যেতে হয়েছিল। একটি হাসপাতালে একাধিক চিকিৎসক তখনই চাকরি ছেড়ে দেন।
>বেসরকারি হাসপাতালে কিছু চিকিৎসককে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। কেউ ইস্তফা দিচ্ছেন। কেউ বিনা নোটিশে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন।
চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো বলছে, এ পর্যন্ত সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের প্রায় ১০০ চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। নার্স, টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১০০। এ ছাড়া প্রায় আড়াই শ চিকিৎসক কোয়ারেন্টিনে আছেন। কিছু চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট সকালে সরকারি হাসপাতালে এবং বিকেলে বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। কে কোথা থেকে সংক্রমিত হয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেন না।
ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম শামীম প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সমস্যা নানা ধরনের। করোনার রোগী পরীক্ষা করার মতো প্রযুক্তি ও সুযোগ তাঁদের নেই। যেকোনো রোগী তাঁরা ভর্তি করেন। তাঁরা জানেন না কে সংক্রমিত, কে সংক্রমিত নন। তিনি বলেন, ‘আপনি ভাবুন, আইসিইউতে ভর্তির পরে যদি জানা যায় কোনো রোগী করোনায় আক্রান্ত, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। অন্য রোগী, চিকিৎসক, নার্স সবারই ঝুঁকি থাকে। এর আর্থিক ঝুঁকিও কম না।’
রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত একটি বেসরকারি হাসপাতালকে সরকার কোভিড-১৯ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করবে এমন কথা গণমাধ্যমে আসার পর এই হাসপাতালের কমপক্ষে তিনজন চিকিৎসক ১৮ মার্চ পদত্যাগ করেছেন।
ওই হাসপাতালের পরিচালক বলেছেন, ‘এই হাসপাতালে কোনো কোভিড-১৯ রোগী এখনো ভর্তি হয়নি। এখান থেকে কেউ সংক্রমিত হয়নি। হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বা নার্স সংক্রমিত হননি বা কোয়ারেন্টিনে যাননি। কিন্তু চিকিৎসকেরা কেন কাজ ছাড়ছেন, তা বুঝতে পারছি না।’ তিনি জানিয়েছেন, কিছু চিকিৎসক অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। এঁদের একটি অংশ ছুটি নিয়েছেন। সময় শেষ হলেও কাজে যোগ দিচ্ছেন না। একটি অংশ কোনো নোটিশ না দিয়েই কাজে অনুপস্থিত থাকছেন। সব মিলে এঁদের সংখ্যা ২৫ জন।
কেউ মনে করছেন, এতে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিকিৎসকদের দূরত্ব বাড়ছে। ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম শামীম বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের মধ্যে যাতে ভুল-বোঝাবুঝি না হয়, সেই বিষয়টি সবার মাথায় থাকতে হবে।’
অন্যদিকে চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের ব্যবহার করে ব্যবসা বড় করেছে। মাত্র দুই মাস হাসপাতালে রোগী কম হওয়ায় চিকিৎসকদের ছুটিতে যেতে বাধ্য করেছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
তবে একাধিক কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসক বলেছেন, পরিস্থিতি যা, তার চেয়ে বেশি বলা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে অবিশ্বাস, সন্দেহ বাড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মানুষের মনে ভুল ধারণা হচ্ছে। অন্যদিকে চিকিৎসকদের ওপর আস্থায় চিড় ধরছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে সজাগ আছি। দু-তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের ছাঁটাই বা বিনা বেতনে ছুটিতে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছিল। কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে।’
তবে সরকার বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। ১৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভিডিও কনফারেন্সে ১৪টি সিদ্ধান্ত হয়। একটি সিদ্ধান্তে বলা হয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকেরা যেন করোনা রোগীদের চিকিৎসাকালে চাকরি না ছাড়েন বা চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি না জানান, এমন বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করবে বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)।
বিএমডিসি কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি অধ্যাপক সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি।’
ওই সভার কার্যবিবরণীতে স্বাস্থ্যসচিব (সেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলামের সই আছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিএমডিসিকে বলা হবে।’
এই সময় চিকিৎসকদের ছুটিতে যেতে বাধ্য করা ঠিক হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, একইভাবে অজুহাত তুলে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা চাকরি ছেড়ে দেওয়াও ঠিক হচ্ছে না।
সার্বিক বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এমন হতে পারে যে সুরক্ষার কারণে চিকিৎসকেরা হাসপাতালে কাজ করতে চাইছেন না। পিপিই নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। আর সত্যি যদি অর্থের সমস্যা হয়, তাহলে সরকারকে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, পদত্যাগ করুক অথবা চাকরি যাক—এতে দুর্ভোগ বাড়বে সাধারণ মানুষের।