করোনা এবং যুবসমাজের ভূমিকা

করোনার গ্রাসে সমগ্র বিশ্ব আজ থমকে গেছে। থমকে গেছে বিশ্বায়নের চাকা, থমকে গেছে বিশ্বের অর্থনীতির চাকা, থমকে গেছে মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ। তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক দূরত্ব। পাশাপাশি চলছে সামাজিক দূরত্ব, শুধু টিকে আছে ভার্চ্যুয়াল জগৎ। ভার্চ্যুয়াল জগৎই একমাত্র, যার মাধ্যমে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে।

এই করোনা সংকটকালে নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করাসহ সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন আজ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মাধ্যমেই চলছে কার্যক্রম। বিভিন্ন সভা, উপস্থাপনা, সম্মেলন, পড়াশোনা, কোর্স, আউটসোর্সিং এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যও পরিচালিত হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে এগিয়ে যে জনগোষ্ঠী তারা হলো যুবসমাজ। বর্তমানে বিশ্বতারুণ্যের সদস্য ১ কোটি ২০ লাখ, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬%। এই যুবসমাজ আজকে সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, যারা কিনা সামনের সময়কে নেতৃত্ব দেবে।

বৈশিক অর্থনীতির সমান্তরালে বা তুলনামূলক দ্রুততর গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা, সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পদচারণ এবং অর্থনীতির অগ্রগতি বিশ্বকে যখন নিয়ে যাচ্ছিল আরও নতুন সভ্যতার দিকে, তখন সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাসের আক্রমণে বিশ্ব হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়েছে। করোনাভাইরাস সংকটের কবলে স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনীতি এক বড় হুমকির মুখে।

বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, বিরাট এক অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে লকডাউন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থগিতাবস্থার বিরূপ প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। যার প্রভাব আগের সব রেকর্ড ছাডিয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। আগামী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ও প্রভাবশালী হিসেবে গড়ে উঠতে আমরা বদ্ধপরিকর। আর এই প্রত্যাশা এবং প্রতিজ্ঞার পেছনে মূল শক্তি যুবসমাজ। আর এই করোনাভাইরাস সংকট অবসান হওয়ার পরে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াবে অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সংকট। তারুণ্যনির্ভর দেশে এই সংকট মোকাবিলায় তরুণসমাজকেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজ, যা প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ। বাংলাদেশের এই যুবসমাজের মধ্যে মোট তারুণ্যের ৪৭% শিক্ষায় নেই, চাকরি করছেন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজছেন না এর মধ্যে পুরুষ রয়েছে ৮৭.২% এবং নারী রয়েছেন ১২.৮%। পাশাপাশি মোট তারুণ্যের ৩৮% শিক্ষায় নেই, কিন্তু চাকরিও করছেন না এর মধ্যে নারী রয়েছে ৯২.৬% এবং পুরুষ রয়েছে ৭.৪%। বাকি ১৫% তারুণ্যের মধ্যে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮% এবং অন্যান্য রয়েছে ৭%।
বাংলাদেশের যেসব তরুণ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক খাতে অবদান রাখছেন, তার মধ্যে কৃষিতে ২৪%, শিল্পে ৩০% এবং সার্ভিসে রয়েছে ৪৬%। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ২১.০৯%, হাউসহোল্ডে ১৫.৫৯%, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩.৩৮%, এনজিওতে ০.৭৬, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ৫৮.২৪% এবং অন্যান্য সেক্টরে ০.৯৫% কর্মরত রয়েছেন, যাঁরা অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজ। ৫ কোটি ৩০ কোটির এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই বাংলাদেশ ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারবে। বাংলাদেশ যখন এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনই সামনে এসে দাঁড়াল বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯। করোনাভাইরাস টেনে ধরল আমাদের এগিয়ে যাওয়ার চাকা। কিন্তু আমাদের থেমে যাওয়া চাকাকে আবার সচল করতে প্রয়োজন সব ধরনের প্রস্তুতি, প্রয়োজন সংকল্প, প্রয়োজন নিজেদের গড়ে তোলা এবং প্রস্তুত হতে হবে তরুণদের এই সংকট উত্তরণের। এই করোনাভাইরাসের সংকটকালে সারা দেশ যখন লকডাউন, তখন তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় তরুণেরা যেভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন:

ক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অনলাইন কোর্স
এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সবকিছুই এখন সবার হাতের নাগালে। তাই তরুণেরা ঘরে বসেই করতে পারেন নিজের প্রয়োজনমতো দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অনলাইন কোর্স, যা তাঁকে সামনের সময়গুলোতে নিজেকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে। এর মধ্যে ডিজিটাল মার্কেটিং, বিভিন্ন ইংলিশ কোর্স, ডেটাবেস ম্যানেজমেন্ট কোর্স, বিভিন্ন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোর্স, কমিউনিকেশনের দক্ষতা বৃদ্ধির কোর্স, লাইফ স্কিল ট্রেনিং, কম্পিউটার এবং তথ্যভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির কোর্স, ভাষাগত বিভিন্ন কোর্স, ডেটা অ্যানালাইসিস কোর্সসমূহ খুবই প্রয়োজনীয়, যা তরুণদের দক্ষ করে তুলতে সহায়তা করবে।

ক্রিয়েটিভ এবং ডিজাইনিং কোর্স

তথ্যপ্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তরুণদের প্রস্তুত করে তুলতে প্রয়োজন বিশেষায়িত বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক কোর্স, তার মধ্যে রয়েছে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স, গ্রাফিক ডিজাইনিং কোর্স, প্রোগ্রামিং, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট কোর্স, ভিডিও এডিটিং অ্যান্ড অ্যানিমেশন কোর্স, সফটওয়্যার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্সসমূহ।

উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, সেটা হলো উদ্যোক্তা হওয়া। চাইলেই তো আর উদ্যোক্তা হওয়া যায় না। প্রয়োজন প্রস্তুতি, নতুন সৃষ্টিশীল আইডিয়া, যার মাধ্যমে অন্যের হয়ে কাজ না করে নিজে উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা এবং অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। কারণ, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো কর্মসংস্থান তৈরি করা। সেই সংকট মোকাবিলা করতে প্রয়োজন উদ্যোক্তা তৈরি করা, যা নিয়ে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা ইতিমধ্যে গ্রহণ করছে। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন সৃষ্টিশীল আইডিয়া, সেই আইডিয়াটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটা নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা। সব বিষয়ে বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক স্টার্টআপ অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ কোর্স রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে যাঁরা উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন।

অ্যাগ্রো, হস্ত, কুটিরশিল্প বেইজড অনলাইন ট্রেনিং
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো কৃষির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। বাংলাদেশের এখন অনেক তরুণ অ্যাগ্রো, হস্ত, কুটিরশিল্প বেইজড বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করছেন এবং অনেকের পরিকল্পনা রয়েছে। এখন যাঁরা এ পেশায় রয়েছেন, তাঁরা অনেকেই বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বা অনেকেই প্রশিক্ষণ ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এই সময়ে প্রত্যেকেই নিজেদের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, যা সামনের সময়গুলোতে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবে।

স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা
করোনাভাইরাস সংকটকালে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা। তরুণেরাই পারবেন এই সংকটকালে অসহায় ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াতে। এখনকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো। এখন ধান কাটার মৌসুম, তাঁদের ধান কাটতে সহযোগিতা করে খাদ্যসংকট থেকে দেশকে রক্ষা করা আমাদের মহান দায়িত্ব। নিম্ন আয়ের মানুষ যাঁরা দেশকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে এই সংকটে। বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষের টাকায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, তাঁদের অর্থে আমরা পড়াশোনা করছি। এখনই সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর, সময় এখন আমাদের দায়িত্ব পালনের। এ ছাড়া আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের সেবা দান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণ
প্রতিটি কমিউনিটিতে এলাকার যুবসমাজ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবাধর্মী কাজের পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন, যা কিনা প্রত্যেক কমিউনিটির সমস্যাগুলো সমাধান করবে এবং পাশাপাশি সেসব বিষয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যুবসমাজ যৌথভাবে অনলাইনভিত্তিক বা অন্যান্য অর্থনৈতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারে, যা সংকটকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাদের নিজেদের স্বনির্ভর করে তুলবে ও জাতীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।

প্রায় অর্ধেকের মতো যুবসমাজ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়েছেন। তাঁদের যদি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হব। তার জন্য যুবসমাজের প্রয়োজন আগ্রহ, প্রস্তুতি এবং নিজেদের সামনের সময়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। কারণ, সামনের সময়টা আসছে আত্মনির্ভরশীলতা আর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সময়। সংকট–পরবর্তী বিশ্ব যখন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, বাংলাদেশের শক্তি হতে পারে একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত তারুণ্য এবং সেই তারুণ্যশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য উপযুক্ত একটা ব্যবস্থা।

*লেখক: মেম্বার, ট্রাস্টি বোর্ড এবং সাবেক সভাপতি, জাতিসংঘ যুব ও ছাত্র সমিতি বাংলাদেশ