মধুমতী নদীর কালনা ফেরিঘাট। পশ্চিমপাড়ে নড়াইলের লোহাগড়া, পূর্বপাড়ে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ফেরিঘাট। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ফেরি, সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি ও কয়েক গুণ বেশি টোল আদায়সহ নানা কারণে এ ঘাটে জনভোগান্তির শেষ নেই।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নড়াইলে নির্বাচনী জনসভায় কালনা পয়েন্টে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী দুবার এ ফেরিঘাট পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশ্বাসও দিয়েছেন। পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এখানে সেতু হলে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামজিক অবস্থা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কালনা ফেরিঘাট থেকে মধুমতী নদীর পশ্চিমপাড়ে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা সদর পাঁচ কিলোমিটার ও নড়াইল জেলা সদর ১৯ কিলোমিটার। নড়াইল ও লোহাগড়া সদর থেকে আঞ্চলিক মহাসড়কের মাধ্যমে খুলনা ও যশোর হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। কালনায় মধুমতীর পূর্বপাড় থেকে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলার ভাটিয়াপাড়ার দূরত্ব তিন কিলোমিটার। এ ভাটিয়াপাড়া মোড়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-গোপালগঞ্জ-খুলনা বিশ্বরোডে যুক্ত হয়েছে।
আবার কালনা ফেরিঘাট থেকে ঢাকার দূরত্ব ১০৮ এবং বেনাপোলের দূরত্ব ৯২ কিলোমিটার। অর্থাৎ কালনাঘাট দিয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকার দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার। সেখানে মাগুরা হয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকা ৩১১ কিলোমিটার। নড়াইল-মাগুরা-ঢাকা ৩০৮ কিলোমিটার। সেখানে নড়াইল-কালনা-ঢাকা ১২৭ কিলোমিটার। যশোর-মাগুরা-ঢাকা যেখানে ২৭৩ কিলোমিটার, সেখানে যশোর-কালনা-ঢাকা ১৬০ কিলোমিটার। একইভাবে ঢাকার সঙ্গে কালনা হয়ে শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া, মংলা বন্দর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্য জেলার দূরত্ব অনেক কম।
গোপালগঞ্জ জেলা সওজ সূত্র জানায়, কালনা ফেরিঘাটে টোলের হার ট্রাক ও বাস পারপারে ৫০ টাকা, মিনিবাস ও মিনিট্রাক ৩০ টাকা, পিকআপ ও মাইক্রোবাস ২০ টাকা, জিপ, কার ও বেবিট্যাক্সি ১০ টাকা এবং ভ্যান ও মোটারসাইকেল পাঁচ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এখানে নির্ধারিত টোলের হার মানা হয় না। এসব পরিবহন পারাপারে নির্ধারিত টোলের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া রয়েছে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি। এ অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ২০১২ সালের ৩০ মার্চ মাহমুদ হাসান (১৭) নামের এক বরযাত্রীকে পিটিয়ে নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়।
গত কয়েক দিনে সরেজমিনে এ ধরনের বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণও মিলেছে। টোলের হার ফেরির গায়ে লেখাসহ ঘাটে টানানোর কথা। দুই ফেরির কোনোটিতেই তা পাওয়া যায়নি। সওজের টোল বোর্ডটি খুঁজে পেতেও অনেক কষ্ট হয়।
মিনিট্রাকে মাছের পোনা নিয়ে যশোর থেকে শিবচর যাচ্ছিলেন ট্রাকচালক আলিমুল শেখ। সিরিয়ালের নামে তাঁর কাছে ৫০ টাকা দাবি করা হয়। ৪০ টাকা দিয়ে রক্ষা পান। এরপর ফেরি পার হতে ৩০ টাকার জায়গায় ২৩০ টাকা দিতে হয় তাঁকে। আলিমুল বলেন, ‘এসবের প্রতিবাদ করে কয়েকবার লাঞ্ছিত হয়েছি।’ সিরিয়ালের টাকা আদায় করছিলেন শফিকুল। তিনি বলেন, ‘সিরিয়ালের জন্য প্রতি গাড়ি থেকে ২০ টাকা নিই। কিন্তু কাঁচামালের গাড়ির থেকে বেশি আদায় করি।’
ইজারাদার মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘ফেরির ইঞ্জিন ভালো না, তাই ডিজেল বেশি খরচ হয়। আবার ইজারার ভাগিদার আছেন ২০-২৫ জন। এ জন্য কিছু ক্ষেত্রে টোল নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি টাকা আদায় করা হয়।’
গোপালগঞ্জ সওজের এ ফেরিঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির বলেন, বেশি টোল আদায়ের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, এখানে সেতু নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে টেন্ডার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।