সরকারের ৫ বছর: স্থা নী য় স র কা র

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি

পার্থ শঙ্কর সাহা
পার্থ শঙ্কর সাহা

বর্তমান সরকার সকল পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। একটি নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারেনি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে ‘শক্তিশালী করা’র প্রতিশ্রুতি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকলেও সাংসদ ও আমলানির্ভর হয়ে এর শক্তি বরং খর্ব হয়েছে।
বর্তমান সরকারের সময়ে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতা ছিল অন্যান্য সময়ের তুলনায় কম। ভোটার পরিচয়পত্র থাকায় এসব নির্বাচনে জাল ভোটের অভিযোগও তেমন ওঠেনি।
তবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে সাংসদ ও প্রশাসনের। এই দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় সরকারসচিবও। তবে তাঁর মতে, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকারে জনপ্রতিনিধিরা আসাতেই এই দ্বন্দ্ব। তাঁর দাবি, অন্য যেকোনো সরকারের তুলনায় এই সরকারের সময় স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বেড়েছে।
এই সরকার প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ আইন তৈরি করে ২০০৯ সালে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞসহ পরিষদের প্রতিনিধিরাও একে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করেন। তবে আইনটির কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। যেমন—আইনে কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ সরকারের সাতটি বিভাগ ইউনিয়ন পরিষদে হস্তান্তরের কথা থাকলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

এখন ইউনিয়ন পরিষদে এক সচিব ছাড়া কোনো কর্মী নেই। আইনে একজন হিসাবরক্ষক দেওয়ার বিধান ছিল। সেটি হয়নি গত চার বছরে।

বিধান আছে, ইউনিয়ন পরিষদ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করবে। পরিকল্পনা হয়, কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয় না। কেননা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য অর্থের সংস্থান দরকার; এর নিয়ন্ত্রণ পরিষদের হাতে নেই। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সরকারের নানা বিভাগ যেসব উন্নয়নকাজ করে, সেসব কাজে পরিষদের কোনো মতামতই প্রাধান্য পায় না বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরামের (বিইউপিএফ) সভাপতি মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি আইন পেয়েছি। কিন্তু কোনো ক্ষমতা আমাদের নেই।’

আইনটির ৩৪ ধারায় ফৌজদারি মামলায় চেয়ারম্যান বা সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করলেই একজন চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধানটিকে কালো অধ্যায় বলে মনে করেন মাহবুব। এ পর্যন্ত আইনের এই ধারায় শতাধিক চেয়ারম্যানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, এভাবে ক্ষমতায়িত তো করা হয়ইনি, বরং নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত করা হয়েছে।

সরকারের ক্ষমতায় আসার বছরেই ১৯ বছর পর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাফল্যের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের এই স্তরকে অনেকটা ক্ষমতাহীনও করে ফেলে এই সরকারই। এত দিন উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা ছিলেন সাংসদেরা। কিন্তু ২০০৯ সালের এপ্রিলে উপজেলা পরিষদ আইনে সংশোধনী এনে উপজেলা পরিষদে সাংসদদের পরামর্শ গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করা হয়।

এভাবে সাংসদদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। সাংসদ বনাম উপজেলা চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যান বনাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দ্বন্দ্বে জর্জরিত স্থানীয় সরকারের এই স্তর।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান আবদুল হাই ও ইউএনও সুব্রত পালের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের চেয়ার ম্যানরা এই দুজনের পক্ষে দুই ভাগ হয়ে গেছেন। চেয়ারম্যান বলেন, ‘ইউএনও আমাকে পাত্তাই দেন না।’ তিনি জানান, সম্প্রতি একটি সভার চিঠি তিনি পেয়েছেন সভাটি হওয়ার ১৫ মিনিট আগে। আর ইউএনওর অভিযোগ, চেয়ারম্যান নিজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। অফিসে আসেন না। চিঠি পাবেন কীভাবে?

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চেয়ারম্যান সুধীন সরকারের অভিযোগ, তিনি যে প্রকল্পের প্রস্তাব দেন, সাংসদ সেটাতে বিরোধিতা করেন। যদিও সাংসদ নিলুফার জাফর উল্যাহ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

আইন অনুযায়ী সরকারি মোট ১৭টি বিভাগ ন্যস্ত হয়েছে উপজেলা পরিষদের হাতে। কিন্তু বিভাগগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে যে ১১০টি কমিটি আছে, উপজেলায় এর ৮৫টির সভাপতি ইউএনও।

উপজেলার দুস্থদের ত্রাণের জন্য করা ভিজিডি কমিটি, কৃষি পুনর্বাসন কমিটির সভাপতি ইউএনওরা। স্কুলের বিদ্যোৎসাহী নিয়োগের ক্ষমতা সাংসদদের হাতে। দেখা গেছে, ভিজিডি কমিটিতে ইউএনওর মনোনীত দুজন প্রতিনিধি থাকলেও এখানে মূলত সাংসদদের কাছের লোকই নিয়োগ পান। এসব কমিটির প্রধান হওয়ায় ইউএনওরা এসব কাজের উপকারভোগী নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যানদের চেয়ে সাংসদের মতামতকেই প্রাধান্য দেন।

বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন-অর-রশিদ হাওলাদার বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধি হলেও আর্থিক ও প্রশাসনিক কোনো ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। উপজেলায় এখন আমলাতন্ত্র আর সাংসদতন্ত্র চলছে।’

স্থানীয় সরকারসচিব আবু আলম মো. শহীদ খান মনে করেন, উপজেলায় সাংসদদের উপদেশ বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণের বিধান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আর স্থানীয় আমলাদের সঙ্গে বিরোধ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে ইউএনওরা এককভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তাই এখন জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, জেলা পরিষদকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও সব ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সরকার ৬৩টি জেলা পরিষদে প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয় জেলার দলীয় নেতাদের। আজ পর্যন্ত সেখানে নির্বাচন হয়নি।

তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, দলের লোকদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ সেখানে মুখ্য বিষয় নয়।

জেলা পরিষদের প্রশাসকদের মর্যাদা এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি। বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক মকবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে একটা জগাখিচুড়ি হয়ে আছে। আমাদের অবস্থান কী, তা জানি না। ডিসিরা কী কাজ করছেন, তাও বুঝতে পারি না।’