গণহত্যার ছবি

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গিয়েছিলাম। মাঝরাতে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙে গেল। একটু বিরতির পরই শুরু হলো অবিরাম গোলাগুলি আর মর্টারের আওয়াজ।

আমি তখন থাকতাম ফুলার রোডে পুরাতন অ্যাসেম্বলি হলের উল্টো দিকে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের জন্য তৈরি চারতলার ফ্ল্যাটে। আমার জানালা থেকে জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার বিরাট মাঠ সরাসরি চোখে পড়ে। সে রাত ছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, কিন্তু তার মধ্যেও বুঝলাম জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার চারপাশের রাস্তাগুলো মিলিটারি ছেয়ে গেছে।

ভোর হতেই আবার উঁকি মেরে দেখলাম, কোথাও কাউকে চোখে পড়ল না; কেবল রাস্তায় পড়ে আছে অনেক ইটের টুকরা আর মাঠের ওপর বিছানো বড় দুটি সাদা চাদর। এরপরই যে দৃশ্যটির অবতারণা হলো—কোনো দিন কল্পনা করিনি সে দৃশ্য আমাকে জীবনে কখনো দেখতে হবে।

তখন বেশ সকাল হয়ে গেছে। যেদিকে জগন্নাথ হলের প্রধান ছাত্রাবাস, সেদিক থেকে হঠাৎ আবিভূর্ত হলো জনাবিশেক পাকিস্তানি সৈন্য, সঙ্গে দুজন আহত ছাত্র। ছেলে দুটোকে সৈন্যরা বেশ যত্ন করেই কাঁধে ভর দিয়ে এনে চাদর দুটোর পাশে বসাল। একটু পরই চাদর দুটো টেনে সরিয়ে ফেলল—দেখলাম, চাদর দিয়ে ঢাকা ছিল বেশ কয়েকটি মৃতদেহ।

আহত ছেলে দুটো বসে ছিল পূর্ব দিকে মুখ করে, লাশগুলো তাদের পেছনে। দুজন সৈন্য আরেকটু পূর্বে সরে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের দিকে উঁচিয়ে ধরল হাতের রাইফেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখলাম, ছেলে দুটো হাত বাড়িয়ে কাকুতি–মিনতি করছে। তারপরই চলল গুলি।

অল্পক্ষণ পরে কিছু সৈন্য আরও কয়েকজন আহত লোক নিয়ে এল, এবারও পশ্চিম দিকের ছাত্রাবাস থেকে। তারপর শুরু হলো গুলি, অনেকটা এলোপাতাড়ি। কেউ বসে ছিল, কেউ দাঁড়িয়ে, তাদের ওপর সামনে, বেশ কাছাকাছি থেকে গুলি চালাচ্ছে। আর পেছন থেকে উঠছে ধুলা। বুঝলাম, কিছু গুলি দেহ ভেদ করে মাটিতে ঠেকছে। মাঠের ওপর পড়ে থাকা লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকল।

পরপর দুবার এভাবে আহত আর নিরস্ত্র মানুষদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা দেখে বুঝলাম, আরও খুন হবে, আজ একটা সামগ্রিক গণহত্যা হবে। তখন বোকার মতো বলে উঠলাম—আমাদের হাতেও যদি অস্ত্র থাকত। তখন পাশ থেকে আমার চাচাতো ভাই নসীম বলে উঠল—‘ভাইজান, ছবি তোলেন।’

তখন মনে পড়ল আমার বাসায় ভিডিও ক্যামেরাসহ একটা ভিসিআর আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজ ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা তার মধে৵ গলিয়ে দিয়ে জানালার কাচের ওপর রাখলাম। ঠিক যেটুকু ক্যামেরার লেন্স, বাদবাকি পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকল আর জানালা সামান্য ফাঁক করে সরু মাইক্রোফোনটা একটু বের করে রাখলাম। ইতিমধ্যে আরও দুটো ব্যাচকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে। ছবির রেকর্ডিংয়ে ধরা পড়েছে, বাদবাকি তিনটি গণহত্যা। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শেষেরটি।

তখন বন্দী আনা শুরু হয়েছে মাঠের পূর্ব দিক থেকে। যাদের নিয়ে আসা হচ্ছে, তাদের পরনে লুঙ্গি, গেঞ্জি অথবা খালি গা। বুঝলাম, সব ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়েছে। আগের লাশগুলোর কাছে নিয়ে এসে ওদের ওপর গুলি করা হচ্ছে।

এরপর মাঠ হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। ইতিমধ্যে মাঠে বেশ কিছু লাশ জমে উঠেছে। ভাবলাম, এবার বুঝি এই হত্যাযজ্ঞের শেষ। কিন্তু না, একটু পরে দেখলাম, জনা চল্লিশেক অস্ত্রধারী সৈন্য মাঠের উত্তর দিকে লাইন করে দাঁড়াল। এবার জনা দশেক সৈন্য মাঠের পূর্ব দিক থেকে আবির্ভূত হলো, সঙ্গে প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশজন মানুষ। ভাবলাম, বোধ হয় লাশ সরাবার জন্য এনেছে।

কিন্তু মানুষগুলো পড়ে থাকা লাশগুলোর কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওদের সঙ্গী সৈন্যরা আবার একটু পূর্ব দিকে সরে গিয়ে রাইফেল তাক করল। কিছুক্ষণের জন্য চারদিক স্তব্ধ। এর মধ্যে দেখলাম, একজন লোক, মুখে তার দাড়ি, হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে প্রাণভিক্ষা চাইছে। তারপরই শুরু হলো গুলি। গুলির পর গুলি বর্ষণ হচ্ছে আর মানুষগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। তাদের দেহ ভেদ করা গুলির আঘাতে মাঠ থেকে উঠছে ধুলা।

গুলি যখন থামল, দেখলাম—একমাত্র দাড়িওয়ালা লোকটা তখনো বেঁচে আছে। মনে হলো ওর দিকে সরাসরি কেউ গুলি চালায়নি। লোকটা আবার হাত জোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল। একজন সৈন্য তার বুকে লাথি মেরে মাটিতে শুইয়ে দেবার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটা তবু হাঁটু গেড়ে রইল। তখন তার ওপর চালাল গুলি। তার মৃতদেহ আর সবার সঙ্গে একাকার হয়ে গেল।

হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের কেউ কেউ পড়ে থাকা দেহগুলোর চারপাশে ঘুরে ঘুরে মনোযোগের সঙ্গে দেখল আর মাঝে মাঝে শেষবারের মতো গুলি করল মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য। কিছুক্ষণ পর সব সৈন্য চলে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ আর ফাঁকা, কেবল জগন্নাথ হলের মাঠের ওপর পড়ে আছে অসংখ্য লাশ।

সকাল তখন ১০টার বেশি হবে না। কারফিউ সত্ত্বেও আমরা আত্মীয়স্বজন ও পরিবার নিয়ে পালিয়ে এলাম পুরান ঢাকায়। আসার ঠিক পূর্বমুহূর্তে অর্থাৎ বেলা একটার দিকে একটা প্রকাণ্ড বুলডোজার দিয়ে মাটি খুঁড়তে দেখেছি। কিন্তু তারপর সেখানে কী হয়েছে বলতে পারব না। অনুমান করি, লাশগুলো পুঁতে ফেলার উদ্দেশ্যেই মাটি খোঁড়া হচ্ছে। স্বাধীনতালাভের পরে জেনেছি, আমার অনুমান ছিল সত্যি।

# ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, সম্পাদনা: রশীদ হায়দার, সাহিত্যপ্রকাশ

# ড. নূরুল উলা: সাবেক অধ্যাপক, বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব