তীব্র গরমে বেশি ভুগছে শিশুরা

চট্টগ্রামের হাসপাতালে রোগী বেড়েছে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে রোগী ভর্তি বেড়েছে। গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলো
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে রোগী ভর্তি বেড়েছে। গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলো

নয় মাস বয়সী আরিয়ানের দিন কয়েক ধরে তীব্র জ্বর। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্টের সমস্যাও রয়েছে। প্রথম দু-তিন দিন বাসাতে রেখেই ছেলের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন মা সালেহা আক্তার। কিন্তু অসুখ বাড়তে থাকায় ছেলেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি। চিকিৎসকেরা বলছেন, অসহনীয় গরমে আরিয়ানের মতো অনেক শিশু তীব্র জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে নগরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পাশাপাশি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, তীব্র গরমের সঙ্গে বাতাসে ধুলা-বালু বেড়ে যাওয়া এবং নিরাপদ পানির অভাবে শিশু ও বয়স্ক লোকজন বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।

চট্টগ্রাম নগরের মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে গতকাল সোমবার রোগীর সংখ্যা ছিল ২৫৮। চিকিৎসকেরা বলেন, রোগীদের বেশির ভাগই নতুন ভর্তি হওয়া। গরমের কারণে ভাইরাসজনিত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এই বিভাগে রোগী ছিল দুই শর কম।

একই হাসপাতালের বহির্বিভাগে গতকাল রোগী ছিল তিন শতাধিক। সপ্তাহ খানেক আগেও এ সংখ্যা ছিল দুই শর মতো বলে জানালেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাফাহিমহাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গরমের কারণে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বেশির ভাগই জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী। অনেকের জ্বরের কারণে খিঁচুনিও দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া হামে আক্রান্ত রোগীও রয়েছেন।

মা-শিশু জেনারেল হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. আবু সৈয়দ চৌধুরী বলেন, গরমজনিত কারণে জ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ বেড়েছে। অভিভাবকদের এ সময়টাতে শিশুর বেশি করে যত্ন নেওয়া দরকার।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে শয্যা রয়েছে ১০৪টি। গতকাল রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৬৩। এর মধ্যে বেশির ভাগ জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী। গরমের কারণে ঘাম থেকে শিশুদের ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হচ্ছে বলে জানান চিকিৎসকেরা।

হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, গরমের কারণে শিশুদের মধ্যে ভাইরাস জ্বর ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে এখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রোগী আসছে।

চিকিৎসকদের মতে, গরমের কারণে জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। একই কারণে শ্বাসকষ্টজনিত নিউমোনিয়া কিংবা ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বাইরের পচা-বাসি খাবার ও দূষিত পানির কারণে শিশুদের ডায়রিয়া ও জন্ডিস হচ্ছে।

গরমের কারণে শিশুদের ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত তীব্র জ্বর হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাসনা মুহুরী। তিনি বলেন, তীব্র গরমে শিশুদের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। ব্যক্তিগত চেম্বারে এ ধরনের রোগী বেড়েছে।

শিশুদের জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হলে ওষুধ দোকানির কথায় কোনো ওষুধ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। শিশুদের বেশি করে নিরাপদ পানি পান করানো, নবজাতকদের ঘন ঘন বুকের দুধ দেওয়া এবং পচা-বাসি খাবার না খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত রোববার হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে ১০ মাস বয়সী ছেলেকে ভর্তি করান তার মা আসমা আক্তার। আসমা বলেন, দুই দিন ধরে জ্বর কমে না। ছেলে ছটফট শুরু করে। তাই হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।

উল্লেখ্য, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে তীব্র গরম পড়ছে। গতকাল সোমবার নগরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিনও তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

চিকিৎসকদের পরামর্শ 

গরমে শিশুদের পাতলা সুতোর কাপড় পরানো, রোদ থেকে বাঁচতে শিশুর পাশাপাশি বড়দেরও ছাতা ব্যবহার করা, মুখে মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। গরম থেকে বাঁচতে বেশি ঠান্ডা পানি পান না করতে বলেছেন তাঁরা। নামীদামি প্রতিষ্ঠানের পানীয় ছাড়া রাস্তাঘাটের পানীয় পরিহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। বেশি ঘামলে ওরস্যালাইন খাওয়া, ঘাম ও ময়লাযুক্ত হাতে কোনো কিছু মুখে না দেওয়া এবং পচা বাসি খাবার এড়িয়ে চলা এবং বড়-ছোট সবাইকে বেশি পরিমাণে নিরাপদ পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।