সিলেট

চিঠি পড়ে না ডাকবাক্সে!

সিলেটের মিরাবাজার এলাকার একটি ডাকবাক্স। অরক্ষিত এই ডাকবাক্সের তালা থাকার কথা থাকলেও তা নেই। গত শনিবার তোলা ছবি l প্রথম আলো
সিলেটের মিরাবাজার এলাকার একটি ডাকবাক্স। অরক্ষিত এই ডাকবাক্সের তালা থাকার কথা থাকলেও তা নেই। গত শনিবার তোলা ছবি l প্রথম আলো

‘আজ তোমার চিঠি যদি না পেলাম হায়, নাকি ভেবে নেব ডাকপিয়নের অসুখ হয়েছে’—জনপ্রিয় ব্যান্ডদল ফিডব্যাকের বিখ্যাত এই গানের কথার মতো এখন আর কেউ হয়তো প্রিয়মানুষের চিঠির অপেক্ষায় থাকে না। চিঠি পাঠিয়ে উত্তরের আশায় ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকার দিনও বুঝি অনেক আগেই ফুরিয়েছে। সিলেট শহরের ডাকবাক্সগুলোর (লেটারবক্স) দিকে তাকালে এ ‘সত্য’ আরও বেশি বোঝা যাবে।
ডাক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট শহরের ৫৬টি ডাকবাক্সে প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি চিঠি জমা পড়ে। এর বাইরে প্রধান ডাকঘরে স্থাপিত আরও একটি ডাকবাক্সে প্রায় ১৫০টি চিঠি জমা হয়। ডাক বিভাগের পিয়নরা প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ সাধারণ ও রেজিস্ট্রি চিঠি (দ্রুত বিলি করা হয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে) বিলি করে থাকেন বলে জানিয়েছেন।
একাধিক ডাকপিয়ন জানান, কয়েক বছর ধরেই আগের মতো আর চিঠি আসে না। এ কারণে তাঁদের ব্যস্ততাও অনেকটা কমে গেছে। এক যুগ আগেও প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার চিঠি বিলি হতো।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় যে ৫৬টি ডাকবাক্স রয়েছে এর ১৯টি ঝুলন্ত ডাকবাক্স (রাস্তার পাশে কোনো পিলারের সঙ্গে লাগানো)। এসব ডাকবাক্সের কোনোটা মরচে পড়ে ফুটো হয়ে গেছে। কোনোটায় দীর্ঘদিন ধরে তালা নেই। আবার কোনোটা ভেঙে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ডাকবাক্সের এমন দুরবস্থার পাশাপাশি এগুলো নিয়মিত খোলাও হয় না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।
ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকা ফিডব্যাকের ‘চিঠি’ গানের প্রসঙ্গে ব্যান্ডটির দলনেতা ফোয়াদ নাসের বাবু প্রথম আলোকে বলেন, গানটি ৮৭ সালের। এর গীতিকার ও শিল্পী ছিলেন মাকসুদুল হক। ওই সময় ভালোবাসার কথা জানাতে মানুষ চিঠি বা টেলিফোনকেই বেছে নিত। মনের কথা জানিয়ে লেখা চিঠির উত্তরে কী আসে তা জানতে ডাকপিয়নের অপেক্ষায় বসে থাকা ছাড়া তেমন কোনো উপায়ও ছিল না। তিনি বলেন, ‘এখন দিন পাল্টেছে। চিঠির কদর কমেছে। ডাকপিয়নও বেকার হয়ে গেছেন।’
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ‘রানার’-এ কবি লিখেছেন ‘কত চিঠি লেখে লোকে—/ কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখ ও শোকে।’ স্মৃতি, প্রেম-আবেগ, সুখ-দুঃখ এখনো আছে মানুষের। তবে অন্যকে তা জানানোর ভাষা ও মাধ্যম বদলে দিয়েছে প্রযুক্তি। চাইলেই মহূর্তে মুঠোফোনে কথা বলা যায় কাছে-দূরে, বিদেশ-বিভুঁইয়ে থাকা স্বজনের সঙ্গে। মুঠোফোন ও ইন্টারনেটে স্কাইপির বদৌলতে ভিডিও কলের মাধ্যমে চাইলেই যে কারও সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি সরাসরি তাঁর ছবি দেখার সুযোগও এখন হাতের নাগালে। চিঠির জায়গা দখল করেছে এসএমএস, ফেসবুক, টুইটার, ই-মেইলসহ আরও অনেক প্রযুক্তি কী...।
‘রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,/ দস্যুর ভয় তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে’—কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতার রানারেরও (আগে এক এলাকার চিঠি অন্য এলাকার ডাকঘরে যে পৌঁছে দিত) বুঝি এখন আর অবসর ফুরোয় না।
চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নিয়াজ আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট, ফেসবুক, সেলফোনের মাধ্যমে মানুষ দ্রুত একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছে। জীবনমান প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগের বিষয়টিতে নির্ভরশীলতা কমে যাচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ডাক বিভাগও এখন বদলাচ্ছে। ডাক বিভাগের মাধ্যমেও এখন দ্রুত যেকোনো স্থানে সহজেই টাকা পাঠানো যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নগরের সোনালী ব্যাংকের সম্মুখভাগ, নয়াসড়ক, হাউজিং এস্টেট, কাজিরবাজার, দক্ষিণ সুরমাসহ অন্তত ৩০টি এলাকার ডাকবাক্সগুলো নিয়মিত খোলা হয় না।
এ বিষয়ে সিলেট প্রধান ডাকঘরের সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল কাম পোস্টমাস্টার মো. শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, যেসব ডাকবাক্স ভাঙাচোরা ও তালাবিহীন অবস্থায় রয়েছে, সেগুলো দ্রুত মেরামত করা হবে। এ ছাড়া সঠিক সময়ে যেন লেটারবক্সগুলো খোলা হয়—সে ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মীরাবাজার এলাকার ডাকবাক্সটি প্রতিদিন সকাল পৌনে ১০টা এবং বিকেল চারটা ২৫ মিনিটে খোলার কথা থাকলেও গত সোমবার নির্ধারিত সময়ে সেখানে গিয়ে কোনো পিয়নের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। শিবগঞ্জ এলাকার ডাকবাক্সটি সকাল ১০টা পাঁচ মিনিট এবং বিকেল চারটা ৪৫ মিনিটে খোলার কথা থাকলেও মঙ্গলবার তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিন্তু ওই দুই সময়ে তা খোলা হয়নি।
জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী আলতাফ মিয়া বলেন, এই এলাকায় ডাকবাক্সটি দেড় বছর ধরে তালাবিহীন অবস্থায় রয়েছে। তাই কেউ এখানে চিঠি ফেলে না। এতে কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পািনর লাভ হচ্ছে। তিনি বলেন, ভাঙাচোরা ডাকবাক্সগুলো মেরামত না করে সম্প্রতি রং করা হয়েছে।