
গল্পগুলো আলাদা, তবে সবগুলোর মধ্যে একই রকমের কিছু অভিব্যক্তি, আবেগ–অনুভূতির প্রকাশ আছে। সেই সূত্রেই সাত আলোকচিত্রীর কাজ একত্র করে শুরু হলো প্রদর্শনী। আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘পাঠশালা’র ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘তীব্র’ নামের এ প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের আলোকচিত্রীদের অর্ধশতাধিক আলোকচিত্রসহ দুটি ভিডিও চিত্র রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে ১৬ শুক্রাবাদ পান্থপথের দৃক পাঠভবনে অষ্টম তলার গ্যালারিতে দুই সপ্তাহের এ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। চলবে আগামী ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। প্রদর্শনীর এ সাত আলোকচিত্রী হলেন ভারতের সৌম্য শংকর দাস, নেপালের সাগর ছেত্রি এবং বাংলাদেশের প্রণবেশ দাশ, সালমা আবেদিন, সাদমান শহীদ, শাহরিয়া শারমিন ও সরকার প্রতীক। তাঁরা সবাই পাঠশালার প্রাক্তন ছাত্র।
বিকেল চারটায় সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাঠশালা ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ও আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, ‘আমাদের সমাজবাস্তবতায় ফটোগ্রাফি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করা বা ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নেওয়া অনেক কঠিন। এখানে অভিভাবকেরা সাধারণত তাঁদের সন্তানদের চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা এমন কোনো পেশার জন্য প্রস্তুত হতে উৎসাহিত করেন।’ তিনি শিক্ষার্থীদের এ প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সমাজ ও দেশের উন্নতির জন্য অবদান রাখাতে নিজেকে শিক্ষিত করে তোলার প্রেরণা দেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রদর্শনীর কিউরেটর মুনেম ওয়াসিফ, ছবিমেলার কিউরেটর এ এস এম রেজাউর রহমান, অংশগ্রহণকারী আলোকচিত্রীদের মধ্যে শাহরিয়া শারমিন ও সরকার প্রতীক।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ প্রদর্শনী উপলক্ষে অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আলোকচিত্রীদের আলোচনা ও বই প্রদর্শনী।
আলোকচিত্রীরা সবাই একেকটি বিষয়কে বিভিন্ন দিক থেকে নানা মাত্রায় তুলে ধরেছেন। তাতে কেউ প্রাধান্য দিয়েছেন তথ্য ও ঘটনার বয়ানের প্রতি, কেউ কারিগরি ও নান্দনিক দিকের নিরীক্ষা করেছেন। তবে সবার কাজেই এক রকমের বেদনা, বিষাদ, ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জর সময়ের অভিব্যক্তির প্রকাশ পেয়েছে বিশেষভাবে। সেটিই সবগুলো কাজের এক অভিন্ন সুর।
সৌম্য শংকর বোসের কাজের শিরোনাম ‘যেখানে পাখিরা গায় না কখনো গান’। তিনি ১৯৭৯ সালে মরিচঝাঁপি দ্বীপে নিম্নবর্গের মানুষদের গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেছেন। পুলিশ ও রাজনৈতিক গুন্ডাদের গুলিতে সেখানে প্রায় তিন হাজার উদ্বাস্তু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ছবিতে আছে লাশ ভেসে যাচ্ছে নদীতে, বাড়িঘরে জ্বলছে আগুন। সব হারিয়ে আহাজারি করছেন নিপীড়িত মানুষ।
প্রণবেশ দাসের কাজ নিরীক্ষাধর্মী। ‘গ্রহণ’ নামের আলোকচিত্রের সিরিজে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবিতে ২০১৩ সালে শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের যে বিশাল সমাবেশ হয়েছিল এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিরা একের পর এক ব্লগারদের ওপর হামলা চালায়, সে বিষয়গুলো তুলে এনেছেন।
সালমা আবেদিনের কাজ অনেকটা ব্যক্তিগত আবেগানুভূতির। ‘বিষণ্ন রবিবার’ নামের তাঁর এ কাজের প্রেরণা হাঙ্গেরির সুরকার রেজসো সেরেস-এর ‘গ্লুমি সানডে’ গানটি। তিনি তাঁর কাব্যিক বোধ, নান্দনিকতার ভেতর দিয়ে একজন নারীর সংগ্রামকে তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছেন।
সাদমান শহীদের কাজের নাম ‘নির্দয়’। এতে তিনি দুই অসম বয়সী নর-নারীর সম্পর্কের গল্পের ভেতর দিয়ে তুলে এনেছেন নারীদের প্রতি তাঁর সঙ্গীর নিপীড়ন নির্যাতনের বিষয়টি।
শাহরিয়া শারমিনের কাজের নাম ‘নুর’। তাঁর ছোট ভাই ২০১৯ সালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েক সপ্তাহ কোমায় চলে গিয়েছিলেন। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণের সেই দিনগুলোতে তিনি দুই ভাইবোনের শৈশবের দিনগুলো স্মৃতির ভেতরে নিমজ্জিত হয়েছিলেন। সেই পুরোনো ছবি, গাছপালা, আশা–নিরাশার দ্বন্দ্ব এসব নিয়ে তাঁর এ সিরিজ ছবি।
‘দুঃখিত’ নামের ভিডিও চিত্রে সাগর ছেত্রি নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোর প্রতি জনসাধারণের আস্থাহীনতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিভিন্ন সময় নেপালে যেসব রাজনৈতিক চুক্তি হয়েছে, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনসাধারণের আশাহত হওয়ার দুঃখবোধকেই ধারণ করেছেন ছেত্রি তাঁর কাজে।
সরকার প্রতীক ‘অন্তঃশিরা’ নামে ভিডিও ছবি তৈরি করেছেন করোনার বৈশ্বিক মহামারিতে ওলটপালট হয়ে যাওয়া জীবনযাত্রাকে অবলম্বন করে। অকস্মাৎ চলে গেছে কত আপনজন, চেনা ছবি কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে। তবু এর মধ্যেই এ বদলে যাওয়া নতুন পৃথিবীতে অব্যাহত রয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা।