বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহল যে দেশে অবস্থিত, বসবাসকারী নাগরিকেরা সেই দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে, ছিটমহলটি যে দেশে অবস্থিত, বসবাসকারীরা সেই দেশেরই নাগরিক হতে চাইবেন। তবে, কেউ চাইলে তাঁদের পূর্ববর্তী দেশের নাগরিক হওয়ারও সুযোগ থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুসমর্থনের যে প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে, তাতে এ কথা বলা হয়েছে। ভারতের দুই স্তরবিশিষ্ট পার্লামেন্ট রাজ্যসভা ও লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি সম্প্রতি অনুমোদন পেয়েছে।
বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলে বসবাসকারীদের নাগরিকত্ব নির্ধারণে নাগরিকদের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। বাংলাদেশের ছিটমহলে বসবাসকারী কোনো ভারতীয় নাগরিক ইচ্ছা করলে সেখানেই থাকতে পারবেন। তবে তাঁকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিতে হবে। আবার ভারতের ছিটমহলে বসবাসকারী কোনো বাংলাদেশি সেখানেই থাকতে চাইলে তাঁকেও ভারতের নাগরিকত্ব নিতে হবে।
কে, কটি ছিটমহল পাবে: বাংলাদেশ মোট ১১১টি ছিটমহল পাবে। এই ছিটমহলগুলোতে মোট জমির পরিমাণ ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর এবং জনসংখ্যা ৩৭ হাজার ৩৮৬।
অন্যদিকে ভারত পাবে ৫১টি ছিটমহল। এই ছিটমহলগুলোতে জমির পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর এবং জনসংখ্যা ১৪ হাজার ৯০ জন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশ ১০ হাজার ৫০ দশমিক ৬১ একর জমি বেশি পাবে ভারতের কাছ থেকে।
সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় ১৯৭৪ সালের স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন হয়। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে চুক্তিটি অনুমোদন হলেও এত বছর ভারতের লোকসভায় তা অনুমোদন হয়নি। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই প্রটোকলে সই করেন। ভারতের লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন না হওয়ায় প্রটোকলটি এত দিন কার্যকর হয়নি। সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় চুক্তিটি অনুমোদন হওয়ায় গতকাল বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় প্রটোকলটি অনুমোদন হয়।
অপদখলীয় জমি সম্পর্কে: মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুই দেশের দখলে থাকা অপদখলীয় জমি সম্পর্কে বলেন, ভারতের দখলে ছিল বাংলাদেশের ২ হাজার ২৬৭ দশমিক ৮৮ একর জমি, আর বাংলাদেশের দখলে ছিল ভারতের ২ হাজার ৭৭৭ দশমিক ১৪ একর জমি। বাংলাদেশের দখলে থাকা ৫০৯ দশমিক ২৬ একর জমি ফেরত দিতে হবে। চুক্তি অনুমোদনের পর এই জমি বিনিময় করতে হবে।
সীমান্ত চিহ্নিত হবে: মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বেশির ভাগ জায়গা চিহ্নিত থাকলেও সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকা চিহ্নিত করা ছিল না। পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার ও ফেনীর কিছু এলাকায় এই সীমানা নিয়ে জটিলতা ছিল। প্রটোকল অনুযায়ী এই সীমানা চিহ্নিত হবে।
প্রটোকলের অধীনে আঙ্গরপোতা-দহগ্রামে বসবাসকারীরা ভারতের তিনবিঘা করিডর দিয়ে এখন সব সময় চলাচল করতে পারবে। এটা প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকবে। এই করিডর বাংলাদেশকে স্থায়ী ইজারা দেবে ভারত। এ ছাড়া প্রটোকলের আওতায় ৩৫টি গুচ্ছ ম্যাপ চূড়ান্ত হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, দুই দেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন চূড়ান্ত হয়েছে, এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়টির আরও অগ্রগতি হবে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রিসভার গতকালের বৈঠকে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সাপেক্ষে প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগ (সর্বাধিনায়কতা) আইন, ২০১৫ এবং প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগ (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে ইংরেজি ভাষায় সামরিক অধ্যাদেশ হিসেবে এ দুটি আইন জারি হয়। এ জন্য হাইকোর্টের নির্দেশ এবং মন্ত্রিসভার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত মোতাবেক আইন দুটি বাংলা ভাষায় রূপান্তরের জন্য সংশোধনীর প্রয়োজন হয়।