
জনগণের প্রতি শাসকদের জবাবদিহি সম্পূর্ণ উধাও হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সুশাসনের ক্ষেত্রে জবাবদিহির একটি জায়গা হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন করা। সেটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
‘সার্চিং ওয়েজ ফরওয়ার্ড ফর বাংলাদেশ ইন দ্য টাইম অব প্যানডেমিক: কোভিড-১৯ অ্যান্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল ওয়েবিনারে বদিউল আলম মজুমদার এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আজ বৃহস্পতিবার এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এতে সহযোগী ছিল জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এখন আমলাতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো শাসকদের চাহিদা পূরণ করছে। এখানে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। যদি শাসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে করোনার কারণে সৃষ্টি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো থেকেই যাবে। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সব ক্ষমতা ঊর্ধ্বতনের কাছে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। আমার চোখে, সুশাসনের সিস্টেম পুরো ভেঙে পড়েছে।’ সুজন সম্পাদক আরও বলেন, ‘ক্ষমতা এক ঊর্ধ্বতনের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে বিকেন্দ্রীকরণ ও হস্তান্তর না হলে সেখানে অসাংবিধানিক ও অশান্তিপূর্ণ শক্তি আসার আশঙ্কা ও ভয় আছে।’
সভায় ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে উন্নত দেশের তুলনায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল।
করোনাকালে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের সুশাসনও বিধ্বস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, গত বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থমকে যায়। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যা হলেও এটি অর্থনৈতিক সমস্যাও তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে দ্রুত সুশাসনগত সাড়া দিতে হয়, নয়তো আরেক দিকে দুর্নীতি হয়। ফলে যাদের সহযোগিতা করার দরকার, তা হয় না। করোনার প্রথম থেকে বাংলাদেশে দ্বিতীয়টিই হয়েছে।
করোনা মহামারিতে সুশাসন আরও জোরদার দরকার ছিল উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, সুশাসনে এখনো যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব আছে। এখানে দেখা গেছে, করোনার সময়ে সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তি ও কর্মদক্ষতা—এই ছয়টি পরিমাপে ভালো করেনি। যেমন জবাবদিহির ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দেওয়ার জন্য তৈরি বলা হয়েছিল। অথচ এগুলো প্রস্তুত ছিল না। তিনি বলেন, সমালোচনা নিয়ন্ত্রণ করতে এই মুহূর্তেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন করোনা–পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে দেশে সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত বছর করোনার সময়ে মার্চ থেকে নভেম্বরে এর আগের ৯ মাসের তুলনায় যৌন সহিংসতা, শিশুর প্রতি সহিংসতা কমেছে ৭ ও ২৪ শতাংশ কমেছে। তবে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও নারীদের আত্মহত্যা ১০ শতাংশ ও ২১ শতাংশ বেড়েছে। এ বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া দরকার ছিল, যা হয়নি।
নির্বাচনী ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যে জবাবদিহি নেই উল্লেখ করে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনে দেখা গেল, এত অনিয়ম, তবু কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। করোনার সময়ে অপর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে খোলামেলাভাবে দেখা পড়েছে। কেউ জানে না কী করতে হবে। করোনার শুরুতে দেখা গেল, ঢাকার চার থেকে পাঁচ হাসপাতালে আইসিইউ আছে, বাকিদের নেই। এই খাতের পুরোটাই দুর্নীতি। তিনি বলেন, একটা প্রজন্ম পাস নিয়ে বেড়ে উঠছে, উচ্চশিক্ষার কী হবে—এসব নিয়ে আলাপ নেই। করোনার সময়ে দুর্নীতি বেড়েছে। কীভাবে কমবে কেউ জানে না। কোনো বিরোধী দল বা বিরোধী কণ্ঠ নেই। অথচ কণ্ঠরোধের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে।
আলোচনা সঞ্চালনা করেন সিজিএস নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।