ঢাকার চেহারা বদলাবে নগর কৃষি ও বনায়নে

এই নগরে এখন ছাদে অনেকেই ফলদ গাছ রোপণ করেন। এটি ব্যাপক আকারে করা দরকার। ছবি: সংগৃহীত
এই নগরে এখন ছাদে অনেকেই ফলদ গাছ রোপণ করেন। এটি ব্যাপক আকারে করা দরকার। ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভরপুর প্রাচীন একটি শহর ঢাকা। ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকাকে বলা হয়ে থাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের নগরী। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ও অব্যবস্থাপনার জন্য এ শহর হারিয়েছে তার জৌলুশ।

১৩৪ বর্গ ইলের এ শহরে বাস করে ১ কোটি ৪১ লাখ মানুষ (আদমশুমারি অনুযায়ী)। বর্তমানে জনসংখ্যা আরও অনেক বেশি। ধারণা করা হয়, প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি বা বেশি। প্রতি বর্গমাইলে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাস। বলা চলে এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ জনসংখ্যা হবে ৩ কোটি ৫০ লাখ। কিন্তু বিশাল জনসংখ্যার নগরী ঢাকাকে নিয়ে নেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা। যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, গাছপালার অভাব ইত্যাদি শহরকে দিনে দিনে হুমকির মুখে ফেলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাল, নদী, ডোবা, বৃক্ষ নিধন করে ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, স্কুল–কলেজসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। কমে যাচ্ছে সবুজের পরিমাণ।

জাপানের কিয়োটো ও হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন গবেষক ঢাকা শহরের সবুজ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাঁদের মতে, ১৯৯৫ সালে ঢাকার সবুজ অঞ্চল ছিল ১২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮ শতাংশ এবং বর্তমানে ৬-৭ শতাংশের বেশি না (প্রথম আলো, ২০১৯)। ঢাকাতে যত পরিমাণে গাছ কাটা হয়, তার অল্প পরিমাণই রোপণ করা হয়। ৮০ দশকের পর থেকে বৃক্ষনিধন শুরু হয়েছে। ফলে ঢাকার চেহারাও বদলাতে শুরু হয়। গাছপালা আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। এ ছাড়া বৃষ্টিপাত ঘটাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। গাছের ডাল, বাকল, পাতা অনেকে ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করে। কিন্তু বৃক্ষনিধনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রীষ্মে ঢাকায় গড় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। এ ছাড়া অতি বা অনাবৃষ্টি, ঝড়, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে।

অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষনিধনের কারণে খরা ও বন্যার প্রকোপ দেখা দেয় এবং এটিকেই অন্যতম কারণ হিসাবে ধরা হয় পাঁচ হাজার বছর পূর্বের উন্নত সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের। ফলে বৃক্ষের প্রয়োজনীতা সহজেই অনুমেয়। বৃক্ষ ঢাকাকে ছায়াশীতল রাখতে সহায়তা করবে। স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরিতেও গাছপালার অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের চাহিদার পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১৬ কোটি ৫৭ (বিবিএস, ২০১৯) লাখ মানুষ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জনবহুল শহরের তালিকায় ১১তম স্থানে আছে।

ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গ্লোবাল সিটিস ইনস্টিটিউশনের পরিচালিত একটি সমীক্ষা দেখিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকা হবে বিশ্বর তৃতীয় জনবহুল শহর (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে বাস করে (বিবিএস, ২০১৯), যার সিংহভাগই ঢাকাতে। ঢাকার মানুষ সাধারণত চাকরি, ব্যবসা, দিনমজুর, পরিবহনশ্রমিক, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদনে তাদের প্রত্যক্ষ অবদান নেই বললেই চলে।

ঢাকা শহরের লাখো ভবনের ছাদে এমন গাছ রোপণ করা যেতেই পারে। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে ৭৮.৬ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে (বিবিএস, ২০১৯), যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এদিকে ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ফসল উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিতে হবে বিভিন্ন পদক্ষেপ। ঢাকা শহরের মানুষ কৃষিজাত পণ্যের জন্য সাধারণত গ্রামের ওপর নির্ভরশীল। একটি গবেষণায় দেখা গেছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে ১০০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে (কৃষিতথ্য সার্ভিস)। তাই নগরের জনসাধারণের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে নগর কৃষির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা শহরে কয়েক লাখ ছাদ রয়েছে। যেখানে আম, আমড়া, জাম, লিচু, লেবু, কমলা, শসা ইত্যাদি চাষ করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নগর কৃষির মাধ্যমে তাদের শহরগুলোতে খাদ্যের জোগান দেয়। ঢাকা শহরের আশপাশে যেমন সাভার, কেরানীগঞ্জ, উত্তর খান, দক্ষিণ খান, টঙ্গী, ধামরাই, আশুলিয়া ইত্যাদি স্থানে পরিকল্পিতভাবে কৃষি ফসল উৎপাদন, ডেইরি ফার্ম, হাঁস-মুরগি পালন, গরু–ছাগলের ফার্ম, মৎস্য চাষ করে নগরের মানুষের খাদ্যশস্য, মসলা, সবজি, মাংস, দুধ, মাছ ইত্যাদির চাহিদার অনেক অংশে মেটানো সম্ভব। এর মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে। আবার সতেজ খবারও পাবে নগরবাসী। পরিবহন, বিপণনেও কোনো সমস্যা দেখা দেবে না। আমাদের ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ঢাকা হবে সবুজের শহর। প্রতিবছর গাছ লাগানো কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং অকারণে বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে হবে। রাস্তার পাশে, খোলা মাঠে, বাড়ির আশপাশে পর্যাপ্ত বৃক্ষ রোপণ করতে হবে।

দিন দিন শহরের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে ২৫ শতাংশ বনায়ন নিশ্চত করেই আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। নগর কৃষি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে গবেষণা করে সহায়তা করতে পারে। সরকারকে উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও তৈরি হবে। এ ছাড়া যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রতিটি কাজ করতে হবে পরিকল্পিতভাবে। ফলে একদিকে ঢাকা যেমন হবে সবুজে ঘেরা, অন্যদিকে এ শহর নিজেই নিজের খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে, যা এই শহরের চেহারাই বদলে দেবে। বসযোগ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত শহরের তালিকায় স্থান করে নেবে ঢাকা শহর।

লেখক: শিক্ষক