ঢাকার রেস্তোরাঁয় ঝাল ও ঝোলে শুঁটকি

রাজধানীর অনেক বাংলা খাবারের রেস্তোরাঁতেই এখন শুঁটকির নানা পদ থাকে। ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীর অনেক বাংলা খাবারের রেস্তোরাঁতেই এখন শুঁটকির নানা পদ থাকে। ছবি: প্রথম আলো

মাছেভাতে বাঙালি। কাজেই মাছ ছাড়া আমাদের চলে না। একসময় গ্রামবাংলায় যখন মাছের প্রাচুর্য ছিল, নদী-খাল-বিল আর হাওর-বাঁওড়ে ব্যাপক মাছ ধরা পড়লেই শুঁটকি করা হতো। সে প্রচলন এখনো আছে। নগরজীবনও এ ঐতিহ্য থেকে পিছিয়ে নেই। শুঁটকির ব্যঞ্জন খেয়ে হাত শুঁকতে শুঁকতে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা
সাহেব-বাবু এ শহরে কম নেই।
ভর্তা, ভুনা, চচ্চড়ি, পাতায় মুড়িয়ে পুড়িয়ে, সবজি দিয়ে—কতভাবেই না খাওয়া হয় শুঁটকি মাছ। শুঁটকির এমন ভক্তও আছেন, পড়শির ঘরে শুঁটকি হলে সুঘ্রাণে টিকতে না পেরে ঘুরের কাউকে একটুখানি আনতে পাঠিয়ে দেন। আর দহরম-মহরম যদি সে রকম হয়, তখন নিজেই বাটি নিয়ে হাজির হতে সমস্যা নেই। তবে বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। এমন মানুষও আছেন, শুঁটকির ঘ্রাণে অনেক তফাতে হাঁটেন। এরপরও শুঁটকির ভক্ত কিন্তু কম নেই। তাঁদের জন্যই রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় রাখা হচ্ছে কয়েক পদের শুঁটকির ব্যঞ্জন। আর তা মুখরোচক বলে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুসারে, জৈব অনুঘটক ও অণুজীবের কর্মকাণ্ড ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনার জন্য সনাতন পদ্ধতিতে রোদে রেখে মাছ শুকানো হয়। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ও নিচু এলাকায় যেখানে আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা ও পরিবহন অবকাঠামোর অভাব রয়েছে, সেখানেই মূলত মাছ শুকানো হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সুন্দরবনের দুবলারচর, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, রাঙ্গাবালি, সোনাদিয়া দ্বীপ, মহেশখালী, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জের ইব্রাহিমপুর, জামালগঞ্জের যশোমন্তপুর, চলনবিল ইত্যাদি। তবে বাণিজ্যিকভাবে এখন অনেক অঞ্চলে শুঁটকি তৈরি হয়। বিদেশেও এখন রপ্তানি হচ্ছে।

রাজধানীর অনেক বাংলা খাবারের রেস্তোরাঁতেই এখন শুঁটকির নানা পদ থাকে। ছবি: প্রথম আলো

লইট্যা, পুঁটি, ছুরি, চাপিলা, কাচকি, রুপচাঁদা ও চিংড়ির শুঁটকি খুব বেশি প্রচলিত। রেস্তোরাঁগুলোতে লইট্যা, কাঁচকি, ও চিংড়ির শুঁটকির চাহিদা বেশি। ধানমন্ডির শংকরে ‘আঞ্চলিক খানা’ নামের একটি দেশীয় রেস্তোরাঁয় কয়েক পদের শুঁটকির খাবার পাওয়া যায়। কুমড়ো পাতায় মুড়িয়ে চ্যাপা শুঁটকি ভর্তা। যাঁরা ঝাল খেতে না পারেন, তাঁদের নাকের জল-চোখের জল এক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। দাম ১০ টাকা। এ ছাড়া কাচকি শুঁটকির চ্যাপা ভর্তা, শিমের বিচি দিয়ে ছুরি শুঁটকির দাম পড়বে ৩০ টাকা করে।
এ রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মো. সবুজ বলেন, ‘ঢাকায় সবাই বাসায় শুঁটকি রান্না করে খেতে চায় না। কিন্তু খাবারটি অনেকেরই প্রিয়। সেই চিন্তা থেকেই শুঁটকির নানান পদ রাখা।’ তিনি আরও বলেন, খেতে আসা সবাই শুঁটকির কোনো না কোনো পদ নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া তাঁদের চিংড়ির বড়া ও লোনা ইলিশ অনেকের পছন্দ।
ফরমাশ দিলে ‘চাটগাঁইয়া শুঁটকি’ রান্না করে দেবে গুলশানের ‘চিটাগাং এক্সপ্রেস’। বারিধারায়ও আছে ওদের রেস্তোরাঁ। লইট্যা শুঁটকি দিয়ে করা এই ভর্তার পদটি বেশ ঝাল হয়। দাম পড়বে ৫০ টাকা। এ ছাড়া নীরব হোটেলের কাচকি শুঁটকির ভুনাও বেশ জনপ্রিয়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন বাণিজ্যিকভাবে শুঁটকি তৈরি হয়। ছবিটি সম্প্রতি কক্সবাজারের শুঁটকিপল্লী থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

কাঁঠালের বিচি দিয়ে শুঁটকি খেতে অনেকেই পছন্দ করেন। মৌসুমটাও কাঁঠালের। গোল আলুর পাশাপাশি মিষ্টি আলু, বেগুন বা শাক দিয়েও শুঁটকি অনেকের পছন্দ। বিদেশি খাবারের পাশাপাশি দেশীয় খাবারের রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে। আর হরেক পদের ভর্তার সঙ্গে শুঁটকি সেখানে অবধারিতভাবেই থাকবে। তবে শুঁটকির পদগুলো ভালোই ঝাল হয়। বাইরে খেতে চাইলে ঝাল খাওয়ার সাহসটাও থাকতে হবে।