এভারেস্ট জয়

তথ্য-প্রমাণ ছাড়া বিতর্ক তোলায় বিস্ময় ও উদ্বেগ মুসা ইব্রাহীমের

‘কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া একটি পক্ষ এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের ব্যাপারে শুধু সন্দেহ প্রকাশ করায়’ বিস্ময় ও উদ্বেগ জানিয়েছেন মুসা ইব্রাহীম।
গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে মুসা ইব্রাহীম বলেন, ‘আমার এভারেস্ট অভিযান ও চূড়া জয় নিয়ে যেসব তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তা আমি বহুবার দিয়েছি। আমি তা বারবার দিয়েই যাব, যতবার জাতি আমার কাছে চাইবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমি অভিযোগকারীদের উদ্দেশে বলছি, আপনাদের হাতে যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকে যে ২০১০ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের পতাকা এভারেস্টের চূড়ায় ওড়েনি, তাহলে সেই প্রমাণ জাতির সামনে প্রকাশ করুন। নইলে বাংলাদেশের এই অর্জন স্রেফ সন্দেহের বশে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো অধিকার কারও নেই।’
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট জয়ের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে খবর প্রচার করা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, এভারেস্ট বিজয়ের হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের (এনএমএ) প্রকাশ করা নেপাল পর্বত সাময়িকীতে বিভিন্ন দেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ীদের নাম থাকলেও মুসা ইব্রাহীমের নাম নেই।
বিবৃতিতে মুসা ইব্রাহীম বলেন, ‘নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশনা নেপাল পর্বত সাময়িকীতে এভারেস্টজয়ীদের নাম থাকা না-থাকা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং সেই তালিকায় মুসা ইব্রাহীমের নাম নেই, কাজেই তিনি এভারেস্ট জয় করেননি—এ ধরনের ব্যাখ্যা দিয়ে কয়েকজন পর্বতারোহী ও কয়েকটি গণমাধ্যম যে খবর প্রচার করেছে, তাতে আমি মুসা ইব্রাহীম, বাংলাদেশের হয়ে প্রথম এভারেস্টজয়ী, গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
বিবৃতিতে বলা হয়, নেপাল পর্বত প্রকাশনার ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে এভারেস্টজয়ী প্রথম নারী পর্বতারোহী জুনকো তাবেইয়ের নাম নেই। ১৯৭৫ সালে এভারেস্ট জয় করা জাপানের এই পর্বতারোহী ৩৮তম এভারেস্টজয়ী। ২০১০ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের পতাকা এভারেস্টের চূড়ায় উড়েছিল। সেদিন আমার সঙ্গেই মন্টেনিগ্রোর তিন পর্বতারোহী—ব্লেকা, স্ল্যাগি ও জোকো তাঁদের দেশ থেকে প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। নেপাল পর্বত প্রকাশনায় তাঁদেরও নাম নেই। বাংলাদেশের এম এ মুহিত ২০১১ সালের ২১ মে এভারেস্ট জয় করেছিলেন। নেপাল পর্বত স্মরণিকায় তাঁর নামের পাশে লেখা আছে ২০১২ সাল। এ ধরনের আরও কিছু গুরুতর ভুল ওই প্রকাশনাটিতে রয়েছে।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত মুসা ইব্রাহীম বিবৃতিতে বলেন, ‘এ বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ২ এপ্রিল আমার সংগঠন নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই স্মরণিকার প্রকাশক নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি আং শেরিং শেরপার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, চায়না-তিব্বতের দিক দিয়ে যাঁরা এভারেস্ট জয় করেছেন, তাঁদের নাম নেপালের তালিকায় রাখা হয় না।’ মুসা ইব্রাহীম চায়না-তিব্বতের দিক দিয়ে এভারেস্ট জয় করেছিলেন।
নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন ওই প্রকাশনাটি বের করেছিল গত বছর। বিবৃতিতে বলা হয়, তালিকায় মুসা ইব্রাহীমের নাম না থাকা প্রসঙ্গে নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের তখনকার সভাপতি জিম্বা জাংবু শেরপার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই প্রকাশনায় অসাবধানতাবশত কিছু ভুল হয়ে গেছে। তাঁরা খুব শিগগির তা সংশোধনের উদ্যোগ নেবেন।
মুসা ইব্রাহীম এভারেস্টজয়ীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয় এমন কয়েকটি সর্বজনস্বীকৃত আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটের ঠিকানা দিয়ে বিবৃতিতে বলেন, http://goo.gl/DOHI96 এই লিঙ্কে কোন দেশ থেকে কে কবে কখন এভারেস্ট জয় করেছেন, তা বিস্তারিত লেখা রয়েছে। www.8000ers.com-এই ওয়েবসাইটও পর্বতারোহীদের ছবির ভিত্তিতে এভারেস্টজয়ীদের তথ্য সংরক্ষণ করে।
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাহাড়-চূড়ার হাতছানি: কেওক্রাডাং থেকে এভারেস্ট —এই বইয়ে তিনি তাঁর পুরো অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানান মুসা ইব্রাহীম। সঙ্গে তিনি তাঁর নিজের ওয়েবসাইটের ঠিকানা www.musaibrahim.com.bd দিয়ে বলেন, সেখানে তাঁর এভারেস্টসহ অন্যান্য অভিযানের সব ছবি ও তথ্য রয়েছে।
বিবৃতিতে মুসা ইব্রাহীম বলেন, ‘আমার সঙ্গে যেসব বিদেশি অভিযাত্রী একই সময়ে এভারেস্ট জয় করেছেন, তাঁদের বিবৃতি এরই মধ্যে ফেসবুকসহ অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে। কয়েকটি টেলিভিশনেও তা প্রচারিত হয়েছে। সেখানে তাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁরা আমাকে এভারেস্ট চূড়ায় দেখেছেন।’
বিবৃতিতে মুসা ইব্রাহীম বলেন, ‘২০১০ সালের ২৩ মে এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশকে ৬৭তম এভারেস্টজয়ী দেশ হিসেবে পরিণত করার পর থেকেই কিছু মানুষ জাতীয় এই অর্জনকে খাটো করার চেষ্টা করে আসছেন। ২০১০ সালেই অনলাইনে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক তোলা হয়। যাঁরা সন্দেহ করছিলেন, তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর তাঁরা শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নেন, ‘মুসা ইব্রাহীম সত্যি সত্যি এভারেস্ট জয় করেছেন’।
মুসা ইব্রাহীম বলেন, ‘চার বছর পর আবারও একটি পক্ষ সন্দেহের আঙুল তুলেছে। এদের মধ্যে আমার পরে এভারেস্ট জয় করা তিনজন এভারেস্টজয়ী পর্যন্ত রয়েছেন, তাঁদের সাফল্যে আমি আন্তরিকভাবে আনন্দিত ও গর্বিত। আমি বিশ্বাস করি, তাঁরা সম্ভবত কারও প্ররোচনায় ঈর্ষাকাতর হয়ে এ সন্দেহমূলক বিবৃতি দিয়েছেন। আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করছি, তাঁরা শুধু সন্দেহই প্রকাশ করেছেন, কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করেননি। আমার পরে আরও যাঁরা এভারেস্ট জয় করেছেন, তাঁদের কিন্তু জাতি শ্রদ্ধার চোখেই দেখে। সামান্য কোনো প্রমাণ ছাড়া স্রেফ ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে এমন একটি অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে ভবিষ্যতে শুধু পর্বতারোহণ কেন, অন্য কোনো ক্ষেত্রেই কাউকে উৎসাহিত করা যাবে না।’
মুসা ইব্রাহীম বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে আবারও বলছি, পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং বাংলাদেশের মানুষের দোয়ায় ২০১০ সালের ২৩ মে রোববার বাংলাদেশ সময় ভোর পাঁচটা পাঁচ মিনিটে এভারেস্টচূড়ায় পৌঁছে পাঁচটা ১৬ মিনিটে আমি যখন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা সেই চূড়ায় উড়িয়েছি, তখন থেকেই বাংলাদেশ পৃথিবীর মাঝে ৬৭তম এভারেস্টজয়ী দেশ। এটাই আমাদের জন্য গর্বের। আমাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে এভারেস্টজয়ী দেশ হিসেবে পরিণত করার, সেই সফল অভিযানের প্রমাণ বারবার আমি উপস্থাপন করব দেশের কাছে, দেশের মানুষের কাছে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সবার কাছে আমার আহ্বান—প্রিয় বাংলাদেশকে বারবার যেন হেয় না করি। আমাদের প্রতিযোগিতা হোক বাংলাদেশের বেশি বেশি সাফল্যের জন্য, যাতে করে পৃথিবীর সামনে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।’