'দেশ আমাকে এই দিনটির জন্যই তৈরি করেছে'

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ কে এম আকবর কবীর
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ কে এম আকবর কবীর

‘কখনো ভাবিনি করোনার মতো এমন ভয়াবহ এক মহামারির সময়ে সামনের লাইনে কাজ করার সুযোগ মিলবে। এটা একটা যুদ্ধ, একটা সুযোগ। এমন সুযোগ আমাদের জীবনে আর নাও আসতে পারে। দেশ আমাকে এই দিনের জন্যই তৈরি করেছে। ঝুঁকি আছে কিন্তু এটা ভেবে ভালোও লাগে যে এ দিনটিতে আমি সামনের সারিতে থেকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পেরেছি।’ কথাগুলো বলছিলেন বরিশালের শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ কে এম আকবর কবীর (৩৯)।

৯ এপ্রিল থেকে এ কে এম আকবর কবীর লড়াই করে চলেছেন করোনাভাইরাস শনাক্তের কাজে। এর মধ্যে এক দিনের জন্যও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ হয়নি। বরিশাল বিভাগের একমাত্র করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষাগারের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। গত শুক্রবার পর্যন্ত তাঁর বিভাগ ১ হাজার ৩২২টি নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন দিয়েছে। পুনরায় পরীক্ষা হয়েছে আরও ৫৪টি। এর মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ৭০ জনের। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা, রিডিং অ্যানালাইসিস, প্রতিবেদন তৈরি, দলের সদস্য টেকনোলজিস্টদের কাজের গতি বাড়াতে দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নানা কাজ করতে হচ্ছে তাঁকে।

আকবর কবীর বলেন, ‘এই যুদ্ধে সম্মতি দেওয়া-নেওয়ার সুযোগও ছিল না আমার। স্ত্রী, শিশু সন্তান এমনকি নিজের জীবনের কথা বিবেচনা করারও অবকাশও ছিল না। কলেজ অধ্যক্ষ একটা চিঠি ধরিয়ে বললেন, দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যস, এখানেই শেষ।’

অধ্যক্ষ অসীত ভূষণ দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আকবর কবীরের সাহসী ভূমিকায় আমরা মুগ্ধ। অন্য চিকিৎসকেরাও নিরলস কাজ করছেন। বিশ্রাম তো দূরে থাক, সাপ্তাহিক-সরকারি ছুটিও যেমন ভোগ করছেন না, তেমনি নির্দিষ্ট সময়সীমাও তাঁদের নেই। আকবর কবীর ও তাঁর দল এখন চেষ্টা করছেন কীভাবে আরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। তাঁর এই প্রচেষ্টা সত্যি অভাবনীয়।’

শুধু নমুনা পরীক্ষাই নয়, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে এই ল্যাব করার জন্য অবকাঠামোগত নকশা ও অন্যান্য কাজের তত্ত্বাবধানও করেন আকবর কবীর। গত ২৭ মার্চ গণপূর্ত বিভাগের একজন প্রকৌশলী মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানালেন, কলেজে একটি ল্যাব স্থাপন করা হবে। এ জন্য ৫০০ বর্গফুটের কক্ষ লাগবে। কিন্তু কিসের ল্যাব সেটা বলতে পারেননি প্রকৌশলী। অধ্যক্ষ অসীত ভূষণ দাস মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান এম টি জাহাঙ্গীর হোসেইন ও সহকারী অধ্যাপক আকবর কবীরকে ডাকলেন। আকবর কবীর ওই প্রকৌশলীর কাছে জানতে চাইলেন, ল্যাবের অবকাঠামোর জন্য যে নির্দেশনা (প্রটোকল) আছে তার নকশা আছে কি না। প্রকৌশলী তাঁদের জানালেন, ঢাকা থেকে তাঁকে শুধু ফোনে বলা হয়েছে ল্যাবের জন্য দ্রুত ৫০০ বর্গফুটের একটি কক্ষ প্রস্তুত করতে। এর বাইরে কিছু বলা হয়নি। তখন আকবর কবীর অধ্যক্ষকে বললেন, ‘যদি কোনো আপত্তি না থাকে, তবে আমি এই ল্যাবের কক্ষটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে চাই।’ অধ্যক্ষ সম্মতি দিলেন।

এরপর আকবর কবিরের তত্ত্বাবধানে কলেজের দ্বিতীয় তলায় ১০ দিন পরিশ্রমের পর ল্যাবের অবকাঠামো প্রস্তুত হয়। পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) মেশিনটি বরিশালে পৌঁছায়। অবকাঠামো প্রস্তুতের পর শুরু হয় মেশিন স্থাপনের কাজ। কিন্তু ল্যাবের দায়িত্ব কে নেবেন, এ নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। কারণ, এ ধরনের ল্যাবের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটি করেন মূলত ভাইরোলজিস্টরা। কিন্তু এই কলেজে ভাইরোলজি বিভাগ থাকলেও সেখানে পাঁচ বছরেও কোনো ভাইরোলজিস্ট পদায়িত হননি। ফলে বিভাগটি চালু হয়নি। ল্যাব পরিচালনার জন্য কলেজ অধ্যক্ষ ভাইরোলোজিস্ট ও দক্ষ টেকনিশিয়ান চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করেছেন, কিন্তু তাতেও সাড়া মেলেনি। 

এ জন্য মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষকদের এই ল্যাবের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেখানে মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজিস্ট আছেন দুজন। বিভাগটির প্রধান সহকারী অধ্যাপক এম টি জাহাঙ্গীর হোসেইন ও আকবর কবীর। জাহাঙ্গীর হোসাইনের চাকরির মেয়াদ প্রায় শেষ। বয়স আর নানা শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর জন্য এই দায়িত্ব নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য কলেজ অধ্যক্ষ অসীত ভূষণ দাস আকবর কবীরকে ডাকলেন এবং চিঠি হাতে ধরিয়ে বললেন, ‘তুমি দায়িত্ব নাও।’

আকবর কবীর বাসায় ফিরে চিঠিটা স্ত্রী নাদিয়া নুসরাতের হাতে দেন। চিঠি পড়ে ভয়ে স্ত্রীর মুখ শুকিয়ে যায়। আকবর কবীর স্ত্রীকে সাহস দিয়ে বললেন, ‘দেশের এই দুর্যোগের সময় আমি যদি হাত-পা গুটিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাই, এতে হয়তো আমি নিরাপদ থাকতে পারব। কিন্তু এর জন্য সারা জীবন অনুশোচনা করতে হবে।’

এরপর গত ৯ এপ্রিল সকাল থেকে বরিশার বিভাগের একমাত্র করোনাভাইরাস শনাক্তের ল্যাবের কাজটি করে যাচ্ছেন আকবর কবীর। কিন্তু কাজটি করতে হলে অন্তত দুজন চিকিৎসক প্রয়োজন। এরপর পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সফিকুল ইসলাম খানকে এই কলেজে প্রেষণে আনা হয়।
আকবর কবীর বলেন, ‘জাহাঙ্গীর হোসেইন ও সফিকুল ইসলাম খান দুজনই আমার সরাসরি শিক্ষক। তাঁরা দুজনই পঞ্চাশোর্ধ্ব। সরকারের প্রজ্ঞাপন আছে, উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস, পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী চিকিৎসকদের এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ না করার জন্য। তারপরও তাঁরা দুজনই আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা দিচ্ছেন।’

ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা না থাকার পরও কীভাবে সাহস করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আকবর কবীর বলেন, ‘আমি যে স্যারের অধীনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছি, তিনি আমাকে আণবিক জীববিজ্ঞান (মলিকুল্যার বায়োলজি) পাঠ্যসূচিতে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। পিসিআরের তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং কিছু ব্যবহারিক জ্ঞান সেখান থেকেই অর্জিত হয়। মূলত এটাই ছিল আমার এই কাজে নামার প্রধান শক্তি।’
তিনি বললেন, ‘দেশ আমাকে তৈরি করেছে এই কাজ এবং এই দিনটির জন্য। একজন যোদ্ধা যদি যুদ্ধের সময় কোনো কাজে না আসেন, তাহলে সেই যোদ্ধা দিয়ে দেশের কী লাভ? করোনাভাইরাস প্রতিরোধ এখন বিশ্বব্যাপী এক যুদ্ধ। আগামী ১০০ কিংবা ২০০ বছরে এই যুদ্ধ আর আমাদের মোকাবিলা নাও করতে হতে পারে।’

আকবর কবীর জানান, বরিশালের ল্যাবে যে মেশিন এবং জনবল, তাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯৪টি নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। তাঁরা সর্বোচ্চটাই করছেন। কিন্তু প্রতিদিন দেড় শয়ের বেশি নমুনা আসছে। এটা প্রতিদিনই বাড়ছে। কিন্তু এই ল্যাবে যেসব টেকনোলজিস্ট আছেন, তাঁরা এ কাজে অভিজ্ঞ নন, এ জন্য তাঁদের কাজের গতি কম। আকবর কবির এখন চেষ্টা করছেন তাঁদের কাজের গতি বাড়ানোর।
এটা হলে তাঁরা দুই পালায় আরও কয়েক ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করে আরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করতে সক্ষম হবেন। এখন তিনি সে চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আকবর কবীর বলেন, ‘এটা করতে পারলে মানুষ উপকৃত হবে। কারণ আমি বুঝি প্রতিদিন কত পরিবার গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন, তাঁর প্রিয় স্বজনের প্রতিবেদনের জন্য। এই অপেক্ষা আমাকে পীড়িত করে।’