দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা যাচ্ছে খুবই কম

>দুটি ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলা চলমান নেই
অন্য দুটিতে মামলা আছে ৪৫টি

প্রতিষ্ঠার প্রথম দশকে ঢাকার চারটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে গড়ে প্রতিবছর ৭৩টি করে মামলা পাঠানো হয়েছে। গত সাত বছরে এ হার ১০টিতে নেমে এসেছে। চারটি ট্রাইব্যুনালের তিনটিতে গত দুই বছর কোনো মামলাই যায়নি।

ঢাকার এই চার ট্রাইব্যুনালের বিচারিক সাধারণ নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, গত বছর সাকল্যে মামলাই গেছে একটি। সেটা ১ নম্বর ট্রাইব্যুনালে। ২০১৮ সালেও শুধু এই ট্রাইব্যুনালে মামলা পাঠানো হয়েছে, সংখ্যায় পাঁচটি। ২ নম্বর ট্রাইব্যুনালে ২০১৫ সালের পর কোনো মামলা পাঠানো হয়নি।

ওপরের হিসাবটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে হওয়া মামলার। এযাবৎ অন্য আইনের ১ হাজার ৬৫৪টি মামলা এসব আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেগুলোর বিচার চলছে। তবে এ প্রতিবেদনে সেগুলোর হিসাব ধরা হয়নি।

ঢাকার দ্বিতীয় ও চতুর্থ ট্রাইব্যুনালের হাতে এখন দ্রুত বিচারের জন্য কোনো মামলা নেই। এই দুটি ট্রাইব্যুনালে থাকা ১২টি মামলার বিচার উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। অন্য দুটি ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে মাত্র ৪৫টি মামলার। আর ১৫টি মামলার বিচার উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।

চাঞ্চল্যকর হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য ও মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধের মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০২ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন পাস হয়। সে বছরই ঢাকার প্রথম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করে।

দুই দশকের মধ্যেই ঢাকার চার ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারের জন্য মামলা যাওয়া থমকে গেছে। এ সম্পর্কে সরকারের মধ্যে সচেতনতাও কম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেছেন, দুটি ট্রাইব্যুনালে মামলা কম থাকার তথ্য তাঁর জানা নেই। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন।

কিন্তু মামলা পাঠানো কমেছে কেন? ঢাকা মহানগরের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষ মামলা চিহ্নিত করে দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা মনিটরিং কমিটি রয়েছে। তিনি নিজে তার সদস্য। তবে গত এক বছরে ওই কমিটির সভা হয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না। একই কথা বললেন ঢাকা জেলার পিপি খোন্দকার আবদুল মান্নান।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে ট্রাইব্যুনালে মামলা পাঠানোর সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত লোকজন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় দুই স্তরে কমিটি আছে।

জেলা পর্যায়ে আছে জেলা মনিটরিং কমিটি। মন্ত্রণালয়ে আছে সহিংস গুরুত্বপূর্ণ মামলা মনিটরিং কমিটি। জেলা কমিটির কাজ হলো, চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো চিহ্নিত করে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সহকারী সচিব (আইন–২) মো. মফিজুল ইসলাম ফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর জানামতে, জেলা প্রশাসন মামলা সুপারিশ করলে কমিটি তা পর্যালোচনা করে দেখে। কমিটি সিদ্ধান্ত নিলে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

মফিজুল ইসলাম বলেন, এক–দেড় বছর ধরে মন্ত্রণালয়ের কমিটির সভা হচ্ছিল না। তবে গত ২৭ জানুয়ারি একটি সভা হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত হবে।

এদিকে নিয়ম অনুযায়ী, জেলা মনিটরিং কমিটির মাসে দুবার বসার কথা। কিন্তু গত দেড় বছরে ঢাকার জেলা মনিটরিং কমিটির কোনো সভা হয়নি।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসুল প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের পক্ষে এক থেকে দেড় বছরে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক মামলার কোনো তালিকা পাঠানো হয়নি। সভা না হওয়ার কারণ সেটাই। পুলিশ তালিকা দিলেই সভা হবে।

আর জেলা মনিটরিং কমিটির সদস্য ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন সরদার আবার বললেন, অনেক দিন সভা হয় না। কমিটি চাইলে শিগগির তালিকা পাঠাবেন।

মামলা আসছে একেবারে কম

ঢাকার প্রথম ট্রাইব্যুনালটি কাজ শুরু করেছিল ২০০২ সালে। পরের বছর আরও তিনটি ট্রাইব্যুনাল যোগ হয়।

ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকার ২০০৩ সালে চারটি ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে ১৬০টি মামলা দ্রুত বিচারের জন্য পাঠায়। এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি মামলার বছর। দুই বছরের মাথায় সংখ্যাটি ১০০-এর নিচে নেমে যায়। ২০১২ সালে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০টি।

ট্রাইব্যুনাল চালু হওয়ার প্রথম ১১ বছরে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৭৩টি করে মামলা পাঠায় সরকার। ২০১২ সালের পর থেকে হারটি কমতে থাকে।

ট্রাইব্যুনালগুলোর নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে মামলা গিয়েছিল ১৬টি। ২০১৫ সালে একবার মামলা বেড়ে ২০টি হয়ে আবার কমতে থাকে। গত বছর মামলা পাঠানো গিয়ে ঠেকে একটিতে। এভাবে গত সাত বছরে প্রতিবছর গড়ে মামলা গেছে প্রায় ১০টি।

ঢাকার তিনটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি আবু আবদুল্লাহ ভূঁইয়া, মাহবুবুর রহমান এবং সৈয়দ শামসুল হক বাদল প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ট্রাইব্যুনালে মামলা না দিলে তাঁদের কিছু করার নেই। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, মামলা দেওয়ার ক্ষমতা কেবল সরকারের।

বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, গত ১৮ বছরে চারটি ট্রাইব্যুনালে সবচেয়ে বেশি মামলা গেছে হত্যার (৫৬ শতাংশ)। তারপরই গেছে অস্ত্র মামলা (৩০ শতাংশ)। এ ছাড়া মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, বিস্ফোরক আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা দ্রুত বিচারের জন্য পাঠিয়েছে সরকার।

ঢাকা ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও খুলনায় একটি করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। সেখানেও মামলা আসার হার কম।

মামলা স্থগিত আর বদলি

সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো চারটি ট্রাইব্যুনালের কাগজপত্র বলছে, ২৭টি মামলার বিচার উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে।

জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী খুন হন ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে মামলাটি ১৭ বছর ধরে ঝুলে রয়েছে।

২০০৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর কদমতলী এলাকায় হারুন অর রশীদ নামের এক ব্যক্তি খুন হন। পুলিশ পাঁচজনের নামে অভিযোগপত্র জমা দেয়। পরে সরকার মামলাটি ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠায়। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে মামলাটি ঝুলে রয়েছে।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, ১৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। নিবন্ধন খাতার তথ্য বলছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ১৩২টি মামলা অন্য আদালতে বদলি করা হয়েছে।

২ নম্বর ট্রাইব্যুনালের পিপি সৈয়দ শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ না হওয়ায় আইন অনুযায়ী মামলাগুলো আগের আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। পুলিশ আদালতে সাক্ষী হাজির না করলে তাঁদের কিছু করার থাকে না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক অবশ্য দায়ী করছেন পুলিশ ও পিপি মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সদিচ্ছার অভাবকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ফৌজদারি মামলা হলো রাষ্ট্র বনাম অভিযুক্ত বা আসামি। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষী, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতে হাজির করার দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রপক্ষের। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী আনতে না পারলে আদালত বিচার শেষ করতে পারবেন না।