
বাগেরহাটের হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘির প্রাণ, মিঠাপানির প্রজাতির (মার্শ ক্রোকোডাইল) স্ত্রী কুমির ‘ধলা পাহাড়’ মারা গেছে। ধলা পাহাড়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারের দিঘিতে প্রায় সাত শ বছর ধরে টিকে থাকা মিঠাপানির প্রজাতির কুমির বসতির অবসান ঘটল।
এলাকাবাসী ও মাজারের খাদেমদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে দিঘিতে পানি নিতে আসা লোকেরা
মৃত কুমিরটিকে ভেসে থাকতে দেখেন। খাদেমরা খবর জানার পর স্থানীয় ষাট গম্বুজ ইউপি চেয়ারম্যান ও বাগেরহাট সদর থানার পুলিশে খবর দেন। দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নয় ফুট লম্বা ও প্রায় ১০ মণ ওজনের কুমিরটিকে টেনে পাড়ে তোলা হয়।
ধলা পাহাড়ের দেহাবশেষ দিঘির উত্তর পাড়ে কুমিরের কবরস্থান বলে পরিচিত স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, ধলা পাহাড়ের বয়স হয়েছিল প্রায় ১০০ বছর। কুমিরটির মৃত্যুর সঠিক কারণ এখরো জানা যায়নি। এর আগে দিঘিতে একশ্রেিণর অবৈধ মাছ শিকািরর পাতা জালে আটকে বেশ কয়েকটি কুমিরের মৃত্যু ঘটেছে। তাই অনেকের ধারণা, এ কুমিরটিও মাছ ধরার জালে জড়িয়ে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যেতে পারে।
জেলা প্রািণসম্পদ কর্মকর্তা সুখেন্দু শেখর গাইন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্য তার শরীরের বিভিন্ন নমুনা ঢাকায় পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পেলে সুনির্দিষ্টভাবে মৃত্যুর কারণ বলা যাবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, খাদ্যে বিষক্রিয়া অথবা অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের কারণে শরীরে চর্বি জমে প্যান স্ট্যাটিস রোগে কুমিরটির মৃত্যু হতে পারে।’
সর্বশেষ কালা পাহাড়ের মৃত্যু হয় প্রায় চার বছর আগে।
‘ঠাকুর দিঘি’ নামে পরিচিত মাজারের এ দিঘিতে এখন ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা মিঠাপানির প্রজাতির দুটি কুমির রয়েছে।
কুমির বিশারদ ও পূর্ব সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী প্রজননকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবদুর রব বলেন, ধলা পাহাড়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সম্ভবত বাংলাদেশের নিজস্ব বন্য প্রাণী হিসেবে উন্মুক্ত জলাশয়ে বিচরণ করা মিঠাপানির প্রজাতির শেষ কুমিরটি চলে গেল।
গতকাল বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে কুমিরের কাঁচা চামড়াটি প্রক্রিয়াকরণের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রক্রিয়াকরণের পর চামড়াটি শুকিয়ে ষাট গম্বুজ জাদুঘরে দর্শনার্থীদের প্রদর্শনের জন্য রাখা হবে।
ইতিহাস অনুযায়ী, হজরত খান জাহান (রহ.) িখ্রষ্টীয় ১৪০১ সালে এ অঞ্চলে আসেন। এ সময় তিনি ঠাকুর দিঘি নামে পরিচিত এই দিঘিটি সংস্কার করে সেখানে মিঠাপানির প্রজাতির এক জোড়া কুমির পোষেন। তিনি তাদের নাম দেন কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়। তিনি নিজ হাতে কুমির দুটিকে কাছে ডেকে খাবার খাওয়াতেন। ১৪৫৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মাজারের খাদেম ও ভক্তরা কুমির দুটির যত্ন অব্যাহত রাখেন। বংশানুক্রমে এসব পুরুষ কুমিরকে কালা পাহাড় এবং স্ত্রী কুমিরকে ধলা পাহাড় নামে ডাকা হয়।
ধলা পাহাড়ের মৃত্যুতে মাজারের অনেক খাদেম ও স্থানীয় লোকজন মুষড়ে পড়েছেন। দিঘির উত্তর পাড়ের বাসিন্দা বীণা বেগম মৃত কুমির দেখতে এসে কেঁদে ফেলে বলেন, ‘কুমিরটা প্রতিবছর আমাদের বাড়ির কাছেই দিঘির পাড়ে ডিম পাড়ত। আমাদের সঙ্গে ওর সুন্দর বোঝাপড়া ছিল।’