
ভাগ্য বদলাতে ঢাকার চায়ের দোকানদার নাজমুল হক গিয়েছিলেন ওমানে। কিন্তু সেখানে কোনো কাজ পাননি। এর মধ্যেই ৪৭ বছর বয়সী এই মানুষটি হঠাৎ একদিন মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে (ব্রেন স্ট্রোক) আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যান। সহায়-সম্বলহীন নাজমুলকে হাসপাতালে নিয়ে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে তোলেন প্রবাসীরা। সেই নাজমুল গতকাল সোমবার ঢাকায় পরিবারের কাছে ফিরেছেন। এ যেন নতুন জীবন ফিরে পাওয়া!
নাজমুলের শরীরের ডান পাশ এখনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে আছে। কথা বলতে পারছেন না। হুইলচেয়ারে করে গতকাল সকাল নয়টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এলে তিন সন্তান তাঁকে জড়িয়ে ধরে আপ্লুত হয়ে পড়ে। বিমানবন্দর থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে নেওয়া হয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, নাজমুলকে হাসপাতালে ভর্তি না রাখলেও চলবে। তবে তাঁকে নিয়মিত থেরাপি দিতে হবে।
তবে অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁকে ফেরত পেয়ে স্ত্রী-সন্তানেরা খুশি। কিন্তু কীভাবে চিকিৎসা চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাঁরা।
নাজমুলের স্ত্রী খালেদা আক্তার ঢাকার পল্লবীর দুয়ারিপাড়ায় বস্তির কক্ষে তিন সন্তান নিয়ে থাকেন। বড় মেয়ে নিপা ক্লাস নাইনে পড়ে। ছেলে মিজান পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। আর সবচেয়ে ছোটটি সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। খালেদা জানান, তাঁদের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। কিন্তু ঢাকার দুয়ারিপাড়ার ফুটপাতে নাজমুল একটি চায়ের দোকান চালাতেন। কিন্তু প্রায়ই ফুটপাত থেকে তুলে দেওয়া হতো। তখন সবার বুদ্ধিতে দুই লাখ টাকা খরচ করে এ বছরের মার্চের শেষে ওমানে চলে যান নাজমুল। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো কাজ পাননি। এর মধ্যেই জুলাই মাসে শুনতে পান, নাজমুল ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন।
ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসীরা জানান, গত ১ জুলাই মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন তিনি। এর পরেই কয়েকজন প্রবাসী তাঁকে বদর আল সামা হাসপাতালে নেন। কিন্তু নাজমুলের চিকিৎসা চালানোর মতো কোনো টাকা ছিল না। তাঁর স্বাস্থ্যবিমাও নেই। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ‘ওমান টেল’-এর প্রকৌশলী সানাউল্লাহ বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি তখন সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ওমান টাইমস পত্রিকার প্রতিবেদক রেজিমন খেতিমন একটি মানবিক প্রতিবেদন করেন। রেজিমন ঢাকায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি জানানো হয় ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাসকেও। ১৮ আগস্ট প্রথম আলোতে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয়।
সানাউল্লাহ জানান, নাজমুল ‘ফ্রি ভিসা’ নিয়ে ওমান এসেছিলেন। পরে শ্রমিক কার্ড সংগ্রহ করেন। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তিনি মাসে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করতে পারতেন। থাকতেন অন্য কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে গাদাগাদি করে। আসলে তাঁর কিছুই ছিল না। কিন্তু ওমান টাইমস-এর প্রতিবেদনের পরেই যথেষ্ট সাড়া মেলে।
ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) এ কে এম রবিউল ইসলাম গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালে তাঁর বিল এসেছিল আট লাখ টাকা। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মানবিক দিক বিবেচনা করে বিল কমিয়ে পাঁচ লাখ টাকা করে। ভারতের কাশ্মীরের এক ব্যক্তি বিলের বড় অংশ পরিশোধ করেন। বাকিটা আমরা জোগাড় করি। আসলে সবাই মিলে চাইলে আমরা যে কাউকে নতুন জীবন দিতে পারি, এ ঘটনা তারই প্রমাণ।’
খালেদা আক্তার বলেন, ‘স্বামীকে নিয়মিত থেরাপি দিতে হবে। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে বস্তিতে থাকি। কীভাবে এই টাকা আসবে, বুঝতে পারছি না।’ খালেদার আকুতি, ‘বিদেশের মতো দেশের মানুষজনও যদি আমাদের পাশে থাকত!’