বিজয়ের মাস

নিয়াজির আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত

একাত্তরের ডিসেম্বরে যুদ্ধনাট্যের কুশীলবেরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। রূপ পেতে থাকে ইতিহাসের এক চমকপ্রদ কালখণ্ড। বিজয়ের আগে আগে ঘটে যাওয়া কিছু খণ্ডচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা হলো

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ উদ্ঘাটন করতে দেশটির সরকার একটি কমিশন গঠন করে, যা হামুদুর রহমান কমিশন নামে পরিচিত। হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনে যুক্ত কিছু বার্তা থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কী রকম সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করেছে।
১৫ ডিসেম্বর। এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ এখন সময়ের ব্যাপার। তারা আত্মসমর্পণ করবে, যুদ্ধবিরতি করবে, নাকি আলোচনা চালিয়ে যাবে —তা নিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডারদের মধ্যে কিছুদিন ধরেই বার্তা আদান-প্রদান চলছিল। বার্তার ধরন দেখে বোঝা যায়, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্রমেই আত্মসমর্পণের দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত কে, কখন, কীভাবে নেবে, তা কেউ স্পষ্ট করে বলছিল না।
১৫ ডিসেম্বর সেনাপ্রধান পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে গভীর রাতে বার্তা পাঠান, ‘সেনাপ্রধানের কাছ থেকে কমান্ডারের জন্য। আপনার ১৫২২৩০ ডিসেম্বরের জি-১৩১০-এর বরাতে। আমি প্রেসিডেন্টকে লেখা আপনার বার্তা দেখেছি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মাধ্যমগুলোর সাহায্যে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে আপনার বার্তার জবাবে জেনারেল মানেকশর বক্তব্যও শুনেছি। আপনার সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া আমার সুপারিশ হলো ভারতীয় চিফ অব স্টাফের শর্তাবলির মধ্যে যা কিছু আপনার চাহিদা পূরণ করে তা মেনে নিন। এটি পুরোপুরি স্থানীয় সামরিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক ফলাফলে তা প্রভাব রাখবে না, তার সিদ্ধান্ত হবে আলাদাভাবে। গৃহীত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের কোনো সিদ্ধান্তের পরিপন্থী হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।’
এতে প্রেসিডেন্টের যে বার্তার উল্লেখ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট সেটি পাঠিয়েছিলেন ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে। তাতে বলা হয়েছে, ‘প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে গভর্নর ও জেনারেল নিয়াজির জন্য। গভর্নরের অতি জরুরি বার্তার বরাতে। আপনারা মাত্রাতিরিক্ত প্রতিকূল অবস্থায় বীরোচিত যুদ্ধ করেছেন। জাতি আপনাদের জন্য গর্বিত এবং বিশ্ব বিমুগ্ধ। সমস্যা সমাধানের জন্য মানবীয়ভাবে যা কিছু সম্ভব তার সব চেষ্টা আমি করেছি। আপনারা এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছেন, যেখানে মানুষের পক্ষে আর কোনো প্রতিরোধ সম্ভব নয় এবং তাতে অভীষ্ট লক্ষ্যও অর্জিত সম্ভব হবে না। আপনার এখনকার করণীয় যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া এবং পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে যাওয়া সশস্ত্র সৈনিক ও অনুগতদের জীবন রক্ষা করা। ভারতকে পূর্ব পাকিস্তানে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যদের মধ্যে যারা দুষ্কৃতকারীদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমি ইতিমধ্যে জাতিসংঘে আবেদন করেছি।’
প্রেসিডেন্টের এই বার্তায় নিয়াজি বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন, প্রেসিডেন্টই বা কী চাইছেন—তা বুঝতে না পেরে নিয়াজি সেনাপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সেদিন বিকেলে চিফ অব জেনারেল স্টাফের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রেসিডেন্টের কাছেই বার্তার ব্যাখ্যা চাইতে বলেন। সন্ধ্যায় নিয়াজি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্টের বার্তা অনুযায়ী কাজ করতে বলেন। নিয়াজি বিমানবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে কথা বললে তিনিও প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুসরণ করতে বলেন।
নিয়াজি দাবি করেন, প্রেসিডেন্টের বার্তা ও অন্যদের আলোচনায় তিনি নিশ্চিত হন যে তাঁকে যুদ্ধবিরতির জন্য বলা হচ্ছে। নিয়াজি আমেরিকার কনসাল জেনারেলের মাধ্যমে ১৫ ডিসেম্বর সকালে জেনারেল মানেকশর কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠান। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টকেও তিনি এ বার্তা পাঠান, ‘জি-১৩০৫। গোপনীয়। কমান্ড থেকে প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে। আপনার সংকেত জি-০০১৩ ১৪ ডিসেম্বর। আমি আমেরিকার কনসাল জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে নিচের লিখিত বার্তাটি দিয়েছি।
‘উদ্ধৃতি শুরু। (এক) ঢাকার মতো বড় বড় শহরে আরও সংঘর্ষ এড়াতে আমি আপনাকে নিচের শর্তাধীনে একটি অস্ত্রবিরতি আয়োজনের অনুরোধ করছি। আলফা। উভয় বাহিনীর কমান্ডারদের মধ্যে মতৈক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে। ব্রাভো। সব ধরনের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান। চার্লি। ১৯৪৭ সালের পর থেকে যারা পূর্ব পাকিস্তানে বসতি করেছিল তাদের সবার নিরাপত্তা বিধান।
‘দুই। এসব শর্তে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী অবিলম্বে সমস্ত সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। তিন। পরবর্তীকালে আমি বর্তমান সমস্যার স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে চলব। চার। জোন বি-র (পূর্ব পাকিস্তান) সামরিক আইন প্রশাসক এবং পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার হিসেবে আমি আমার ওপর অর্পিত কর্তৃত্বের প্রাধিকারে এ অঞ্চলে অবস্থানরত সব পাকিস্তানি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব নিয়ে এ প্রস্তাবটি করলাম। উদ্ধৃতি শেষ।’
নিয়াজি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাননি। তার বদলে পান এ লেখার শুরুতে উদ্ধৃত সেনাপ্রধানের বার্তা। প্রেসিডেন্টের ‘প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া’ আর সেনাপ্রধানের ‘সুপারিশ’—এই দুই নির্দেশনাকে নিয়াজি আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত অনুমোদন বিবেচনা করে পরদিন ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি শুরু করেন।
মুহাম্মদ লুৎ ফুল হক