প্রতিরোধের মার্চ

পাবনা শহরে প্রতিরোধযুদ্ধ

একাত্তরে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের নিজেদের কলমে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা দুঃসাহসী অভিযানের বর্ণনা। এসব লেখা নিয়ে প্রথমা প্রকাশন থেকে শিগগিরই বেরোবে মুক্তির লড়াই: মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধাদের কলমে একাত্তরের গৌরবময় যুদ্ধগাথা শিরোনামের বই। প্রকাশিতব্য এ বই থেকে কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরা হচ্ছে। আজ ছাপা হলো মো. জহুরুল ইসলামের পাবনায় প্রতিরোধযুদ্ধের কথা:

মো. জহুরুল ইসলামে
মো. জহুরুল ইসলামে

পাকিস্তান বাহিনী পাবনার সাধারণ মানুষের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ শুরু করলে আমরা দলবল নিয়ে ২৬ মার্চ সকালেই শহরের উপকণ্ঠে চর এলাকায় নবাব আলী মোল্লার বাড়িতে চলে যাই। পরদিন ২৭ মার্চ সকালের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা সেখানে এলেন। মো. রফিকুল ইসলাম (মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে বকুল, পাবনা জেলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর তৎকালীন প্রধান) বললেন, যেভাবেই হোক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে।
২৭ মার্চ পাবনার ডিসি মো. নূরুল কাদের খান রফিকুল ইসলামকে দেখা করার জন্য খবর পাঠান। তিনি শহরের পাশের চর এলাকায় এক বাড়িতে আত্মগোপন করেছেন। মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে আমরা চার-পাঁচজন গেলাম।

ডিসি সাহেব বললেন, আর্মিরা তাঁকে দেখা করতে বলেছিল, কিন্তু দেখা না করায় তাঁর বাড়ি ঘেরাও করেছিল। তিনি কোনো রকমে পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে এসেছেন। তিনি জানালেন, আর্মিরা পুলিশদের আত্মসমর্পণের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। কিছুক্ষণ আগে পুলিশ লাইন থেকে আরআই খবর পাঠিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশদের আর ধরে রাখা যাচ্ছে না, দ্রুত একটা কিছু করতে অনুরোধ করেছেন।
আমাদের বললেন, তোমরা যেভাবে পারো আর্মিদের প্রতিরোধ করো। হঠাৎ পুলিশ বাহিনী যদি পুলিশ লাইন ছেড়ে চলে যায় অথবা সারেন্ডার করে, তাহলে কাউকে ওরা বাঁচতে দেবে না। রফিকুল ভাই আমাদের প্রতিরোধের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের কথা তাঁকে বিস্তারিত জানালেন। তিনি আশান্বিত হলেন। সবার হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করালেন তিনি। সেদিন ছিল ২৮ মার্চ রোববার, তখন রাত প্রায় চারটা। হঠাৎ প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম। ডিসি সাহেব বললেন, মনে হচ্ছে আর্মিরা পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে, তোমরা তাড়াতাড়ি যাও একটা কিছু করো।

আমরা দ্রুত চলে এলাম। দেখি, গোলাগুলির শব্দ শুনে আমাদের যোদ্ধারা অনেকেই শহরের দিকে এগিয়ে গেছে। আমরাও দৌড়ে কাচারীপাড়ায় জামতলা বাঁধের কাছে এসে দেখি আর্মিরা পুলিশ লাইনে বৃষ্টির মতো গুলি করে যাচ্ছে। রফিকুল ভাই সবাইকে কাচারীপাড়া মাঠে একত্র করে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করলেন। প্রত্যেক গ্রুপ কীভাবে কোন দিক থেকে আর্মিদের ওপর আক্রমণ করবে তা সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন। যাঁদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, তাঁদের বলে দিলেন গ্রামের ভেতরে গিয়ে মানুষজনকে খবর দিতে। তাঁরা যেন ফালা, তির-ধনুক যে যা পারে তাই নিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। এরপর আমরা সবাই নিজেদের সুবিধামতো জায়গা থেকে আর্মিদের লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজন তির-ধনুক, লাঠি, ফালা, নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। এরপর আমরা কয়েকজন রফিকুল ভাইয়ের সঙ্গে জামতলা থেকে এগিয়ে এসে কোর্ট এলাকায় প্রবেশ করলাম। জজ কোর্টের পাশেই একটি আর্মির জিপ ছিল, জিপের কাছে দুজন আর্মি দাঁড়িয়ে পুলিশ লাইন লক্ষ্য করে গুলি করছে। আমরা পেছন থেকে তাদের ওপর গুলি শুরু করলাম। ওরা দৌড়ে সামনের দিকে চলে গেল। কোর্ট এলাকা থেকে আমরা চলে এলাম জজ সাহেবের বাড়ির পেছন দিকে।
সকাল আটটা হবে, এমন সময় দেখি আর্মির একটি জিপ পৌরসভা ও আমজাদ সাহেবের বাড়ির মাঝখানের রাস্তা দিয়ে মেইন রোডে ওঠার জন্য আসছে। ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির চালককে লক্ষ্য করে রফিকুল ভাই গুলি করেন। জিপটি বিকট শব্দে ব্রেক কষার চেষ্টা করে পাশের ড্রেনে উল্টে পড়ে গেল। আর্মিরা কোনো রকমে জিপ থেকে বের হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করল।
এরপর তুমুল গোলাগুলির মধ্যেই আমরা জজ সাহেবের বাড়ি পার হয়ে পৌরসভার সামনে দিয়ে কাচারী মসজিদের সামনের ড্রেন ও বিল্ডিংয়ের পাশে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর পেছন দিক থেকে গুলি শুরু করলাম। ওদিকে জামতলা বাঁধ এবং জজ কোর্টের মধ্য থেকে আমাদের অন্য যোদ্ধারা গুলি করছে। পেছন দিক থেকে আক্রমণ হয়েছে বুঝতে পেরে আর্মিরা ভয় পেয়ে গেল। হঠাৎ দেখি আর্মিদের চায়নিজ রাইফেলের গুলির আওয়াজ আর নেই।

রফিকুল ভাই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে উঠলেন। আমরা সবাই যে যেখানে ছিলাম স্লোগানের জবাব দিতে দিতে পুলিশ লাইনের দিকে ছুটে গেলাম। পুলিশ লাইনে ঢুকেই রিদ্দিক ও সাহাদৎ হোসেন সন্টু ম্যাগাজিন রুমের তালা গুলি করে ভেঙে দিলেন। সেখান থেকে আমরা ৩০৩ রাইফেল ও গুলি যে যার মতো নিয়ে নিলাম। পুলিশের আরআই দৌড়ে এসে রফিকুল ইসলামকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, আপনারা আর্মিদের ওপর আক্রমণ না করলে আমাদের ওরা বাঁচতে দিত না। এদিকে সকাল থেকেই পাবনার বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ বন্দুক, রাইফেল, তির-ধনুক, লাঠি, ফালা-সড়কি নিয়ে শহরে জমায়েত হতে শুরু করলেন। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে পাবনা শহর প্রকম্পিত হয়ে উঠল।
মো. জহুরুল ইসলাম (বিশু): জম্ম ৮ মার্চ ১৯৫১ পাবনায়। ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে স্নাতক ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে ব্যবসায়ী। পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি নিয়ে একটি বই লিখেছেন।